শারমিন চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষণ সবকিছু দেখল। তারপর ইতস্তত করে বলল, কম্পিউটার দিয়ে কীভাবে কাজ করে, আমাকে একদিন দেখাবেন?
অবশ্যই দেখাব। কিন্তু তুমি নিজেই তো একটা কম্পিউটার, তুমি এই কম্পিউটার দেখে কী করবে?
শারমিন কোনো কথা না বলে একটু হাসার ভঙ্গি করল। রাফি বলল, আমি তোমাকে ইচ্ছে করলে এখনই দেখাতে পারি—বাচ্চাকাচ্চাদের যেভাবে দেখাই। তোমাকে বলতে পারি, এটা দিয়ে টাইপ করে, এটা দিয়ে ছবি আঁকে, এটা দিয়ে গেম খেলে—এ রকম। কিন্তু তুমি হচ্ছ একটা প্রডিজি। তুমি হচ্ছ সুপার ড়ুপার জিনিয়াস। তোমাকে তো এভাবে দেখালে হবে না, ঠিক করে দেখাতে হবে। তার জন্য তোমার একটু ইংরেজি শিখতে হবে। জানো ইংরেজি?
একটু একটু। বাংলা কম্পিউটার নাই?
একেবারে নাই বলা যাবে না, কিন্তু তোমার জন্য দরকার আসল খাঁটি কম্পিউটার। বই দিয়ে তুমি যে খেলা দেখিয়েছ, এখন কম্পিউটার দিয়ে না। জানি কী দেখাবে!
আমাকে কখন দেখাবেন?
আমার তো এখন একটা ক্লাস আছে। ক্লাসটা নিয়ে এসে তোমাকে দেখাই?
শারমিনের মুখে আনন্দের একটা ছাপ পড়ল। বলল, আমি ততক্ষণ এখানে বসে থাকি?
বসে থেকে কী করবে?
কিছু করব না। আমি কিছু ছোঁব না। শুধু তাকিয়ে থাকব।
রাফি হেসে ফেলল। বলল, শুধু তাকিয়ে থাকতে হবে না। তুমি একটু ছুঁতেও পারো। এই যে এটা হচ্ছে মাউস, এটা নাড়াচাড়া করে একটু টেপাটেপি করতে পারো।
কিছু নষ্ট হয়ে যাবে না তো?
সেটা নির্ভর করে তুমি কী টেপাটেপি করছ তার ওপর। হ্যাঁ, তুমি চাইলে আমার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারো।
তাহলে আমি কিছু ধরব না।
রাফি বলল, ভয় নেই। ধরো। টেপাটেপি করো। আমি দেখি, এক ঘণ্টায় তুমি এই কম্পিউটার থেকে কী বের করতে পারো।
শারমিনের মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে উঠল। বলল, আপনি রাগ হবেন না তো?।
না, রাগ হব না। আমার সবকিছু ব্যাকআপ থাকে, আমি মাঝেমধ্যে মানুষকেও বিশ্বাস করি, কিন্তু কম্পিউটারকে বিশ্বাস করি না।
এক ঘণ্টা পর রাফি এসে দেখে, শারমিন আরএসএ সাইটে ঢুকে একশ ডিজিটের একটা কম্পোজিট সংখ্যাকে দুটি উৎপাদকে ভাগ করে বসে আছে। রাফিকে দেখে লাজুক মুখে হেসে বলল, এখানে ইংরেজিতে কী লিখেছে, বুঝতে পারছি না।
রাফি পড়ে বলল, এই সাইট থেকে তোমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, তুমি যে কম্পোজিট সংখ্যাকে ফ্যাক্টরাইজ করেছ সেটা যদি দশ বছর আগে করতে তাহলে তুমি এক হাজার ডলার পুরস্কার পেতে!
শারমিন অবাক হয়ে বলল, এ-ক-হা-জা-র ডলার?
রাফির অবাক হওয়ার ক্ষমতাও নেই, সে নিঃশ্বাস আটকে বলল, এক হাজার না দশ হাজার ডলার সেটা নিয়ে আমার এতটুকু কৌতূহল নেই। আমি জানতে চাই তুমি এক ঘণ্টার মধ্যে কেমন করে ব্রাউজিং করে একেবারে তোমার উপযুক্ত একটা সাইটে ঢুকেছ—
ঢুকতে পারিনি।
পেরেছ। ঢুকে ফ্যাক্টরাইজ করেছ।
আমি অন্য একটা জায়গায় ঢুকতে চেয়েছিলাম। ঢুকতে দেয়নি, বলে পাসওয়ার্ড লাগবে। আমি যদি আন্দাজ করে পাসওয়ার্ড দিই তাহলে ঢুকতে
আন্দাজ করে পাসওয়ার্ড দেওয়া যায় না। পাসওয়ার্ড জানতে হয়।
কিন্তু–শারমিনকে একটু বিভ্রান্ত দেখায়, আমি কয়েক জায়গায় আন্দাজে পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে গেছি!
রাফি চোখ কপালে তুলে বলল, কী বললে? কী বললে তুমি? আন্দাজে পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে গেছ?
শারমিন ভয়ে ভয়ে বলল, কেন স্যার? এটা করা কি ভুল?
টেকনিক্যালি ইয়েস। অন্যের পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে যাওয়া বেআইনি কাজ। রিয়েলিস্টিক্যালি এটা অসম্ভব। তুমি কেমন করে করলে?
শারমিন শুকনো মুখে বলল, এখন কি কোনো বিপদ হবে?
সেটা নির্ভর করছে তুমি কোন কোন সাইটে ঢুকে কী কী করেছ তার ওপর।
আমি কিছু করিনি। শুধু ঢুকেছি আর বের হয়েছি। হবে কোনো বিপদ?
রাফি হেসে বলল, না, কোনো বিপদ হবে না। আর যদি হয় সেটা তোমার হবে না। সেটা হবে আমার!
আমি স্যার বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছি–
শারমিন, তোমার ব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের এখন একটু সাবধান হওয়ার ব্যাপার আছে। তুমি আসলে এখনো টের পাওনি তুমি কী। যদি বাইরের মানুষ খবর পায় তাহলে তোমাকে নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। কাজেই এখন আমরা খুব সতর্ক হয়ে যাব। তুমি কাউকে কিছু বলবে না।
শারমিন ভয়ে ভয়ে বলল, বলব না।
প্রথমে আমার একটু আন্দাজ করতে হবে তোমার আসল ক্ষমতা কতটুকু। পারব কি না জানি না, কিন্তু চেষ্টা করব।
শারমিন কোনো কথা না বলে ভীত চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল। রাফি বলল, রামানুজন নামে একজন খুব বড় ম্যাথমেটিশিয়ান ছিলেন, তার কোনো ফর্মাল এড়ুকেশান ছিল না। হার্ডি নামে আরেকজন বড় ম্যাথমেটিশিয়ানের সঙ্গে যখন রামানুজনের দেখা হলো, তখন হার্ডি খুব বিপদে পড়েছিলেন।
কী বিপদ?
তাকে কতটুকু কী শেখাবেন সেটা নিয়ে বিপদ। কোনো কিছু জোর করে শেখাতে গিয়ে যদি রামানুজনের স্বাভাবিক প্রতিভার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, সেই বিপদ। তোমাকে নিয়ে আমারও সেই একই অবস্থা—তোমাকে কতটুকু শেখাব? কী শেখাব?
শারমিন নিচু গলায় বলল, আমাকে কিছু শেখাতে হবে না, শুধু আমার জন্য প্রত্যেক দিন কয়েকটা বই দেবেন।
হ্যাঁ। বই তো দেবই। কিন্তু তোমার ক্ষমতাটা একটু তো ব্যবহারও করতে হবে। রাফি চিন্তিতভাবে তার গাল ঘষতে ঘষতে বলল, তবে আজকে তুমি কম্পিউটারে যে খেলা দেখিয়েছ, তাতে মনে হচ্ছে তোমার ক্ষমতাটা পুরোপুরি বোঝা আমার সাধ্যে নেই।
