মানুষটা নিঃশব্দে মকবুলের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশিতা বলল, ঠিক আছে, আপনি যদি আমাকে আপনাদের টিমের সঙ্গে নিতে না চান, তাহলে অন্তত আমাকে এটুকু সাহায্য করেন। আপনি ভেতর থেকে এটুকু খবর এনে দেন যে মকবুল ভেতরেই আছে। বেঁচে আছে।
মানুষটা কোনো কথা না বলে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশিতা তার পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে মানুষটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই যে এটা আমার কার্ড। আমার ফোন নম্বর, ই-মেইল, ওয়েবসাইট সব দেওয়া আছে। যদি আপনি কিছু জানতে পারেন আর যদি আমাকে জানাতে চান, তাহলে জানাতে পারেন।
ঈশিতা উঠে দাঁড়িয়ে যখন চলে যেতে শুরু করেছে, তখন মানুষটি বলল, আমি শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না।
কোন ব্যাপার?
আপনার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এটা অসম্ভব বিপজ্জনক একটা ব্যাপার। খবর চেপে রাখার জন্য মানুষ মানুষকে মেরে ফেলে। অথচ আপনি আমার কাছে এসে সবকিছু বলে দিলেন। কোনো রাখঢাক নেই। আপনি আমাকে বিশ্বাস করে বসে আছেন?
ঈশিতা মাথা নাড়ল, বলল, জি, করেছি।
কেন? এত বড় একটা ব্যাপার নিয়ে আমাকে বিশ্বাস করলেন কেন?
আমি সাংবাদিক মানুষ। আমার কাজই হচ্ছে খোঁজখবর নেওয়া। আমি খোঁজখবর নিয়ে এসেছিলাম। আপনার বাবা ষাটের দশকে বামপন্থী রাজনীতি করতেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আপনি মাজু বাঙালি ছদ্মনামে কবিতা লেখেন। কবিতাগুলো এখনো একটু কাঁচা কিন্তু বিষয়বস্তু খাটি। দেশের জন্য ভালোবাসা, দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসা। আমি জানি, আপনি আর যাই করেন, কখনো দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করবেন না।
মানুষটা ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আর আমি কেমন করে বুঝতে পারব, আপনি আসলে কারও সঙ্গে বেইমানি করছেন না?
আমার চোখের দিকে তাকাবেন, তাহলেই বুঝবেন। মানুষকে কোথাও কোথাও অন্য মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়।
ঈশিতা চলে যেতে যেতে আবার থামল। বলল, মকবুলের ছবিটা আপনার কাছেই থাকুক। কিন্তু এ ছবিটা আপনার কাছে আছে, সেটা জানাজানি হলে আপনার বিপদ হতে পারে।
মাজু বাঙালি ছদ্মনামে কবিতা লেখে যে মানুষটি, সে কোনো কথা না বলে একদৃষ্টে মকবুলের ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
দুদিন পর ঈশিতা একটা টেলিফোন পেল, ভারী গলায় একজন জানতে চাইল, ঈশিতা?
কথা বলছি।
আমি মাজহার। গলার স্বরটা পরিচিত, কিন্তু ঈশিতা ঠিক চিনতে পারল না। তখন মানুষটি তার পরিচয় আরেকটু বিস্তৃত করল। বলল, আপনি আমাকে মাজু বাঙালি হিসেবে জানেন। কবি মাজু বাঙালি। কবি অংশটা দুর্বল, বাঙালি অংশটা শক্ত।
ঈশিতা উত্তেজিত গলায় বলল, আপনি! কি আশ্চর্য! কোনো খবর আছে?
আছে। ছেলেটা বেঁচে আছে।
বেঁচে আছে?
হ্যাঁ। তবে এই বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। যন্ত্রপাতি দিয়ে বেঁচে থাকা।
আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?
হ্যাঁ। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
ঈশিতা বলল, ব্যাস। এর বেশি টেলিফোনে বলার দরকার নেই। আমার টেলিফোন ট্যাপ করছে বলে মনে হয়। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করে শুনে নেব।
ঠিক আছে।
ঈশিতা টেলিফোন লাইন কেটে দিল।
০৬. রাফি তার ক্লাস লেকচার ঠিক করছে
রাফি তার ক্লাস লেকচার ঠিক করছে, তখন সে শুনল চিকন গলায় একজন বলল, আসতে পারি, স্যার?
রাফি মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, শারমিন অনেকগুলো বই বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রাফি বলল, এসো শারমিন।
শারমিন ভেতরে এসে বইগুলো টেবিলে রেখে বলল, আপনার বইগুলো।
সব পড়া শেষ?
শারমিন মাথা নাড়ল, বলল, জি।
শারমিন পড়া শেখার পর রাফি তাকে বই সাপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটির পড়ার জন্য সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। রাফি তাল সামলাতে পারছে না। লাইব্রেরিতে অনেক বই, কিন্তু মেয়েটির বয়স কম, তাই সব বই দিতে পারছে না। রাফি বইগুলো ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বলল, ভেরি গুড শারমিন। আমি এর আগে কাউকে এত তাড়াতাড়ি বই পড়তে দেখিনি।
শারমিন হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। রাফি বলল, তুমি সত্যি সত্যি পড়ছ, নাকি আমাকে বোকা বানাচ্ছ?
সত্যি সত্যি পড়ছি।
ভেরি গুড।
আমাকে তো কেউ পড়তে শেখায়নি, তাই নিজের মতো করে পড়ি।
সেজন্য মনে হয়, তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।
নিজের মতো করে? সেটা কী রকম?
একটা একটা শব্দ না পড়ে একসঙ্গে পুরো পৃষ্ঠা।
একসঙ্গে পুরো পৃষ্ঠা?
শারমিন মাথা নাড়ল। রাফি অবাক হয়ে বলল, কী বলছ তুমি? সেটা কীভাবে সম্ভব?
শারমিন লাজুক মুখে বলল, আমি পারি।
দেখি। রাফি একটা বই শারমিনের হাতে তুলে দিয়ে বলল, পড়ো দেখি।
শারমিন বইটা হাতে নিয়ে একটার পর একটা পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে। রাফি বলল, পড়ো।
পড়ছি তো।
পড়ছ?
হ্যাঁ।
তুমি যে কয় পৃষ্ঠা উল্টেছ, সেই কয় পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেছ?
হ্যাঁ।
রাফি বইটা হাতে নিয়ে বলল, বলো দেখি, কী লেখা আছে প্রথম পৃষ্ঠায়।
শারমিন পুরো পৃষ্ঠাটা অবিকল বলে গেল, দাড়ি-কমাসহ। রাফি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে শারমিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমাকে নিয়ে কী করব জানি না শারমিন!
আমাকে নিয়ে কিছু করতে হবে না। খালি আমাকে প্রতিদিন পড়ার জন্য কয়েকটা করে বই দিবেন।
দিব, নিশ্চয়ই দিব।
শারমিন কথা বলতে বলতে চোখের কোণা দিয়ে রাফির টেবিলে রাখা কম্পিউটার মনিটরটা দেখছিল, শেষ পর্যন্ত সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেলল, স্যার, আপনার টেবিলের এইটা কি কম্পিউটার?
হ্যাঁ। এইটা কম্পিউটার। রাফি মনিটরটা দেখিয়ে বলল, এইটা হচ্ছে মনিটর। এখানে দেখা যায়। আসল কম্পিউটারটা নিচে। আর এইটা হচ্ছে কী-বোর্ড আর মাউস।
