ঈশিতা পরদিন হাজেরার সাথে দেখা করতে গেল। বস্তির ভেতরে ঢোকার আগেই সে অনুমান করে সেখানে কিছু একটা হয়েছে। হাজেরার ঘরের কাছাকাছি এসে বুঝতে, পারল যেটা হয়েছে সেটা হাজেরাকে নিয়ে। তার ঘরের সামনে পুলিশ এবং অনেক মানুষের ভিড়। পুলিশ মানুষগুলোকে সরিয়ে রেখেছে এবং কয়েকজন ধরাধরি করে হাজেরার মৃতদেহটি বের করে আনছে। গত রাতে সে বিষ খেয়ে মারা গেছে।
ঈশিতা কোনো কৌতূহল দেখাল না, কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে তার ভেতরটা আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে আছে। তাকে কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু সে জানে, হাজেরা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ঈশিতা এটিও জানে, হতদরিদ্র হাজেরার ঘর থেকে খোয়া যাওয়ার মতো। মূল্যবান কিছু নেই, কিন্তু তার পরও সেখান থেকে অন্তত একটি জিনিস নিশ্চয়ই খোয়া গেছে। সেটা হচ্ছে হাজেরার ছেলে মকবুলের একটি ফটো।
বেশির ভাগ মানুষই লক্ষ করেনি, পরদিন বেশ কয়েকটি খবরের কাগজে হাজেরার মৃত্যু সংবাদ ছাপা হয়েছিল। তার মাদকাসক্ত ছেলে মকবুলের দৌরাত্ম্যে নিরুপায় হয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। মকবুল বাড়ি থেকে পালিয়েছে অনেক দিন, সে কথাটিও খবরে লেখা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সে অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। কোথাও লেখা নেই, মকবুলের বয়স মাত্র বারো। কোথাও লেখা নেই, সে ছিল হাসিখুশি শিশু, মায়ের আদরের ধন।
দেশের প্রায় সব মানুষই লক্ষ করেছিল, সে রকম আরও একটি খবর সেদিন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল। আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য নতুন একটি এলগরিদম এনডেভার প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে দেখেছে। তাদের নিউরাল কম্পিউটারে সেই এলগরিদম একটি মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। এনডেভার খুব গর্ব করে বলেছে যে বাংলাদেশের মানুষ শুনে খুব আনন্দ পাবে যে এই মাইলফলকটি স্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশে, এই নিউরাল কম্পিউটারটিও তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এনডেভার বাংলাদেশের জনগণ, তাদের মেধাবী জনগোষ্ঠী এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
ঈশিতা খবরের কাগজের দুটি খবরের দিকেই দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তার ভেতর একটা অসহ্য ক্রোধ পাক খেয়ে উঠছে। অসহায় ক্রোধ, তাই সেটি ছিল ভয়ংকর।
মানুষটা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ঈশিতার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি কী করব?
আপনি আপনার টিমের সঙ্গে আমাকে নিয়ে যাবেন।
মানুষটা কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, আ-আমি, আমার টিমের সঙ্গে আপনাকে নিয়ে যাব?।
হ্যাঁ।
মানুষটা বলল, আমি আপনাকে চিনি না, জানি না, আপনি আমাদের এমপ্লয়ি না, অথচ আপনাকে আমি টিমের সঙ্গে নিয়ে যাব?
হ্যাঁ। আমি সেটাই অনুরোধ করছি। ঈশিতা জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আমার অনুরোধ রাখা, না-রাখা আপনার ইচ্ছা।
মানুষটা কিছুক্ষণ ঈশিতার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনার
অনুরোধটা যে বেআইনি, আপনি সেটা জানেন?
জানি।
আপনি কি কখনো কাউকে ছিনতাই করতে বলেছেন? চুরি, ডাকাতি কিংবা মার্ডার করতে?
না, বলিনি।
কিন্তু আমাকে একটা বড় ধরনের অপরাধ করতে বলেছেন? এর কারণে আমার চাকরি চলে যেতে পারে। আমার কোম্পানির লাল বাতি জ্বলতে পারে কিংবা— মানুষটি তার বাক্য শেষ না করেই থেমে গেল।
ঈশিতা বলল, কিংবা—
আমি যদি পুলিশ-র্যাবকে খবর দিই, আপনি বড় ধরনের আইনি ঝামেলায় পড়ে যেতে পারেন।
ঈশিতা হাসির ভঙ্গি করল। বলল, আপনি খবর দেবেন না। মানুষটি
অবাক হয়ে বলল, আমি খবর দেব না?
না। আপনি যদি সবকিছু শোনেন, তাহলে আপনি কখনোই পুলিশ আর র্যাবকে খবর দেবেন না।
মানুষটা বলল, শুনি আপনার সবকিছু।
ঈশিতা তার পকেট থেকে মকবুলের ছবিটি বের করে মানুষটির হাতে দিয়ে বলল, এই ছেলেটাকে দেখে আপনার কী মনে হয়?
মানুষটা ছবিটি দেখে বলল, একটা ছেলে। গরিব ঘরের ছেলে। বয়স নয়-দশ বছর।
কারেক্ট। তবে ছেলেটার বয়স বারো। টিঅ্যান্ডটি বস্তিতে ভাইরাস অ্যাটাকে যারা অসুস্থ হয়েছিল, তার মধ্যে এই ছেলেটাও ছিল। এনডেভারের অ্যাম্বুলেন্স তাকে নিয়ে গেছে। কিন্তু–
কিন্তু?
ছেলেটা উধাও হয়ে গেছে। তার মা হাজেরা বেগম সেটা নিয়ে হইচই করেছিল। তার ফল হয়েছে এইটা— ঈশিতা এবার হাজেরার মৃত্যুসংবাদ ছাপা হওয়া খবরের কাগজের কাটিংটা দিল।
মানুষটা খবরের কাগজটা পড়ে মুখ তুলে বলল, আত্মহত্যা করেছে?
না। মহিলাটাকে মেরে ফেলেছে।
আপনি কেমন করে জানেন?
আমি জানি। সন্তানকে নিয়ে ব্যাকুল কোনো মা আত্মহত্যা করে না। তা ছাড়া আমি সেখানে দুজন মানুষকে দেখেছি, যারা অবলীলায় মানুষ খুন করতে পারে বলে নিজে আমাকে জানিয়েছে।
মানুষটাকে এবার কেমন জানি বিভ্রান্ত দেখায়। মাথা নেড়ে বলল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
পারার কথা নয়। আমি অনেক দিন থেকে লেগে আছি, তাই এখন একটু একটু বুঝতে শুরু করেছি। ঈশিতা মুখ শক্ত করে বলল, মকবুল নামের ছেলেটা এনডেভারের ভেতরেই আছে বলে আমার ধারণা। সেখানে কেউ ঢুকতে পারে না, আপনারা ছাড়া। আ আমরা শুধু অক্সিজেন সাপ্লাইটা দেখি। আমাদের কোম্পানির দায়িত্ব অক্সিজেন সাপ্লাই ঠিক রাখা, আর কিছু না।
সেটাই দরকার। অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের শেষে থাকে একজন মানুষ। আমি শুধু জানতে চাই, সেই মানুষগুলোর মধ্যে মকবুল নামের ছেলেটা আছে কি না। আর কিছু না।
