হাজেরা আকুল হয়ে কেঁদে বলল, আমার ছেলে–
তোমার ছেলে? তোমার ছেলের খোঁজ রাখবে তুমি।
আমার ছেলেকে—
মাস্তানি গুন্ডামি করে তোমার ছেলে কী করেছে, সেই খোঁজ রাখতে পারো না।
মাস্তানি গুন্ডামি করে নাই–
খবরদার। আর একটা কথা বলেছ কি সরাসরি চুয়ান্ন ধারায় বুক করে দেব। পুলিশদের একজন তখন উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, কী হচ্ছে? তামাশা দেখছ? যাও, সবাই যাও। নিজের নিজের কাজে যাও।
মানুষগুলো তখন সরে যেতে থাকে।
ঈশিতা একটু দূরে সরে গিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকে। যখন মানুষগুলো সরে ভিড়টা হালকা হয়ে আসে, তখন সে নিঃশব্দে হাজেরার কাছে গিয়ে বলল, এই যে শুনেন।
হাজেরা ঘুরে তাকাল, চোখের দৃষ্টি শূন্য। ঈশিতা বলল, আমি একজন সাংবাদিক। আপনার কথা শুনেছি আমি। আমাকে কি একেবারে ঠিক করে বলতে পারবেন, কবে, কখন, কোন অ্যাম্বুলেন্সে আপনার ছেলেকে নিয়েছে? সঙ্গে আর কে ছিল? অ্যাম্বুলেন্সের মানুষগুলোর চেহারা কী রকম?
হাজেরা কিছুক্ষণ তীব্র দৃষ্টিতে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর অনেকটা হিংস্র গলায় বলল, পরশু দিন দুপুরবেলা। একটা না হয় দুইটা বাজে। অনেক অ্যাম্বুলেন্স এসেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে পিছনের অ্যাম্বুলেন্সে তুলেছে। একজন বিদেশি ছিল। সাদা চামড়া নীল চোখ।
আপনার ছেলের নাম কী?
মকবুল।
বয়স?
বারো।
আপনার কাছে মকবুলের ছবি আছে?
বাসায় আছে।
আমাকে একটু দেখাতে পারবেন?
আসেন আমার সাথে।
ঈশিতা হাজেরার সঙ্গে তার বাড়িতে গেল। ঘুপচি গলির পাশে গায়ে গায়ে লাগানো চালাঘর। তার একটার তালা খুলে হাজেরা ভেতরে ঢুকে একটু পর বের হয়ে আসে। স্টুডিওতে তোলা ছবি, দশ-বারো বছরের শুকনো একটা ছেলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে স্ক্রিনে আঁকা নদীগাছ-পাখি এবং একটি প্রাসাদের দৃশ্য। ঈশিতা বলল, আমি এটার একটা ছবি তুলে নিই?
হাজেরা মাথা নাড়ল। ঈশিতা তার ক্যামেরা দিয়ে মকবুলের ছবিটার একটা ছবি তুলে নেয়। ছবিটা হাজেরাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, আপনার ছেলে অসুস্থ হলো কেমন করে, জানেন?
না। জানি না।
গত এক সপ্তাহে আপনার ছেলে কি অস্বাভাবিক কিছু করেছে?
না। করে নাই।
কিছু খেয়েছে?
না, খায় নাই।
কোনো ওষুধ–
এনজিওর আপারা সব বাচ্চাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ভাইটামিন খেতে দিল—
ঈশিতা চমকে ওঠে। ভাইটামিন?
হ্যাঁ।
আছে সেই ভাইটামিন?
আছে।
দেখাবেন আমাকে?
কম। হাজেরা আবার ভেতরে ঢুকে একটা ভিটামিনের শিশি নিয়ে ফিরে আসে। ঈশিতা শিশিটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। বিদেশি দামি ভাইটামিন। ক্যামেরা বের করে সে ভাইটামিনের শিশিটার ছবি তুলে ফেরত দিয়ে বলল, এর ভেতর থেকে আমি একটা ভাইটামিনের ট্যাবলেট নিতে পারি?
নেন।
ঈশিতা শিশি খুলে একটা ভাইটামিনের ক্যাপসুল বের করে কাগজে মুড়ে পকেটে রেখে জিজ্ঞেস করল, এই ক্যাপসুল ছাড়া মকবুল আর কিছু খেয়েছে?
ছোট মানুষ, সব সময়ই তো এইটা সেইটা খায়। বাদাম, আমড়া, আচার—
অন্য কিছু? এনজিওর আপারা কি আর কিছু খেতে দিয়েছিল?
হাজেরা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, দিতে পারে। মনে নাই।
কোন এনজিও, জানেন?
না, জানি না।
ঈশিতা বলল, ঠিক আছে, তাহলে আমি আসি।
হাজেরা ভাঙা গলায় বলল, আমি কি মকবুলরে খুঁজে পামু?
পাবেন। নিশ্চয়ই পাবেন। আস্ত একজন মানুষ তো আর হারিয়ে যেতে পারে না। আমিও খোঁজ নেব। কোনো খোঁজ পেলে আমি আপনাকে জানাব।
আল্লাহ আপনার ভালো করুক।
ঈশিতা চলে যেতে যেতে আবার ফিরে এল। বলল, আর শোনেন।
জে।
মকবুলের ব্যাপারটা নিয়ে আপনি খুব বেশি মানুষকে কিছু বলবেন না।
কেন?
আমি জানি না। কিন্তু, কিন্তু—
কিন্তু কী?
আমার কেন জানি মনে হয়, এ বিষয়টা নিয়ে আপনি যত হইচই করবেন, আপনার ওপর তত বড় একটা বিপদ আসবে।
হাজেরা তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, আপনি কেন এ কথা বলছেন?
ঈশিতা বলল, আমি জানি না। ঠিক করে জানি না। কিন্তু— ঈশিতা তার বাক্যটা শেষ করতে পারল না।
ঈশিতা ঘুপচি গলি দিয়ে বের হতে হতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, গলির মুখে সাফারি কোট পরা কঠোর চেহারার দুজন মানুষ। এই মানুষগুলোকে সে আগে দেখেছে, এরাই তাদের অফিসে এসেছিল। এরা এখন কাউকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করছে। কী জিজ্ঞেস করছে ঈশিতা বুঝে গেল। এরা হাজেরার বাসাটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। ঈশিতা দ্রুত পাশের গলিতে ঢুকে যায়। মানুষ দুজন এখানে তাকে দেখতে পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে, তার আর হাজেরার দুজনেরই।
ঈশিতা বাকি দিনটুকু খোঁজখবর নিয়ে কাটাল। হাজেরার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে মকবুলকে এনডেভারের ভেতরেই নেওয়া হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সগুলো সারি বেঁধে এনডেভারে ঢুকেছে, কোনোটা অন্য কোথাও যায়নি। কাজেই মকবুল নিশ্চয়ই এনডেভারের ভেতরই আছে। অন্য সবার মেডিকেল রিপোর্ট দিয়েছে, মকবুলের রিপোর্ট নেই। শুধু যে রিপোর্ট নেই তা নয়, তার কোনো হদিসই নেই।
যাদের রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, তাদের তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ বিপদমুক্ত—কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে তাদের শরীরে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আছে, ভাইরাসের আক্রমণের পর প্রথম কয়েক দিন জ্বর, মাথাব্যথা এ রকম খানিকটা উপসর্গ দেখা গেছে। তারপর নিজে নিজেই সেরে উঠতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় ভাগের মস্তিষ্কে এক ধরনের প্রদাহ শুরু হয়েছে, সেটা কতটুকু গুরুতর হবে, কেউ জানে না। যারা আক্রান্ত হয়েছে, তারা অমানুষিক যন্ত্রণায় ছটফট করছে। শুধু তা-ই নয়, নানা ধরনের বিভ্রমে ভুগছে। তাদের বেশির ভাগকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়েছে। ভাইরাসের কোনো সহজ চিকিৎসা নেই বলে সবাই অপেক্ষা করছে—শরীর নিজে থেকে যদি সেরে ওঠে তার অপেক্ষায়। তৃতীয় ভাগের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহতারা সবাই গভীর কোমায়। এই গভীর কোমা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে কী পারবে না, কেউ জানে না।
