রাফির হঠাৎ মনে পড়ল, সে ঈশিতার সঙ্গে আপনি করে কথা বলত। কখন কীভাবে সেটা তুমি হয়ে গেছে, জানে না। ঈশিতাও সেটা লক্ষ করেছে বলে মনে হলো না। সেও খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, চিন্তা কোরো না রাফি। আমি সাবধানে থাকব।
০৫. ঈশিতা সাবধানে থাকল না
ঈশিতা অবশ্যি মোটেই সাবধানে থাকল না। সে পরদিন তার ক্যামেরা নিয়ে টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে হাজির হলো। মুখে কাপড়ের একটা মাস্ক লাগিয়ে নিয়েছিল এবং আশা করতে লাগল, এনডেভারের লোকজন যেন তাকে না চেনে।
সেখানে আরও কয়েকজন সাংবাদিক ছিল, তারাও মুখে মাস্ক লাগিয়েছে। তারা লাগিয়েছে অন্য কারণে, ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে। বড় একটা টেলিভিশন ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে একজন গজগজ করতে করতে ঈশিতাকে বলল, ক্যামেরাম্যানের চাকরির খেতা পুড়ি।
ঈশিতা বলল, কেন, কী হয়েছে?
কোনো দিন টেলিভিশনে আমাদের চেহারা দেখায়? দেখায় না।
কেন দেখাবে? দেখানোর কথা না, আর দেখাবে না জেনেই তো চাকরিটা নিয়েছেন।
সেটা সত্যি। কিন্তু তাই বলে জীবনের সিকিউরিটি দেবে না? অজায়গা কুজায়গায় পাঠিয়ে দেয়, একশবার বলে দেয়, তোমার জান গেলে যাক, ক্যামেরার যেন ক্ষতি না হয়।
ঈশিতা কিছু না বলে একটু হাসল, মুখের মাঝে মাস্ক লাগানো, তাই সেই হাসিটা ক্যামেরাম্যান অবশ্যি দেখতে পেল না। ক্যামেরাম্যান বলল, এখানে প্লেগ নাকি এইডস-কী সমাচার কিছু জানি না। পাঠিয়ে দিল, ফুটেজ নিতে হবে। এখন যদি মারা যাই?
ঈশিতা বলল, ভয় নাই, মারা যাবেন না। এটা পানিবাহিত, আপনার মুখের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। কিছু খাবেন না। বাসায় গিয়ে সাবান দিয়ে গোসল করে নেবেন।
ব্যাটা জীবাণু জানে তো যে সে পানিবাহিত? তার শুধু মুখ দিয়ে যাওয়ার কথা? যদি মাইন্ড চেঞ্জ করে বাতাসবাহিত হয়ে নাক দিয়ে ঢুকে যায়?
ঈশিতা আবার একটু হাসল, কিন্তু ক্যামেরাম্যান হাসিটা দেখতে পাবে না বলে মুখে বলল, না, এই ভাইরাস মাইন্ড চেঞ্জ করবে না। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।
কথা বলতে বলতে ঈশিতা একটু দূরে তাকিয়ে ছিল। বস্তির ছোট রাস্তাটার কাছাকাছি অনেক অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাম্বুলেন্সের ওপর লালবাতি জ্বলছে ও নিভছে। লালবাতি জ্বলা আর নেভার কথাটা কে প্রথম চিন্তা করে বের করেছিল কে জানে, কিন্তু এই জ্বলা ও নেভা বাতিগুলো নিঃসন্দেহে পুরো এলাকায় একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ঈশিতা দূর থেকে লক্ষ করে, ধবধবে সাদা পোশাক পরা মানুষজন স্ট্রেচারে করে নানা বয়সী মানুষকে আনছে। আত্মীয়স্বজন তাদের ঘিরে থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ তাদের কাছে আসতে দিচ্ছে না। অ্যাম্বুলেন্সগুলো বিশেষভাবে তৈরি। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা স্ট্রেচার সেখানে ঢোকানো যায়। স্ট্রেচারগুলো ঢোকানোর পর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। একটা একটা অ্যাম্বুলেন্স যখন ছেড়ে দিতে শুরু করেছে, তখন হঠাৎ করে খানিকটা উত্তেজনা দেখা গেল। মনে হলো, উত্তপ্ত গলায় কথা-কাটাকাটি হচ্ছে একজন মহিলার কাতর গলার স্বর আর্তনাদের মতো শোনা যেতে থাকে। সাদা কাপড় পরা মানুষগুলোকে বস্তির মানুষেরা ঘিরে ফেলেছে এবং তার ভেতর থেকে একজন মহিলার কান্না শোনা যেতে থাকে।
ক্যামেরাম্যান তার ক্যামেরা নিয়ে সেদিকেই ছুটে যায়। ঈশিতা দেখল, কয়েকজন মানুষ তাকে থামানোর চেষ্টা করছে। ভিড় একটু বেড়ে যাওয়ার পর ঈশিতাও মানুষজনের সঙ্গে মিশে গিয়ে কাছাকাছি এগিয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্সের কাছাকাছি একজন মাঝবয়সী মহিলা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে চিঙ্কার করছে এবং কয়েকজন তাকে থামানোর চেষ্টা করছে। মহিলাটি কী বলছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। ঈশিতা তাই তার পাশের মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ভাই?
হাজেরার ছেলেরে খুঁজে পাচ্ছে না।
হাজেরা? ঈশিতা জিজ্ঞেস করল, এই মহিলা হচ্ছেন হাজেরা?
হ।
কেন খুঁজে পাচ্ছে না?
গত পরশু অ্যাম্বুলেন্সে করে নিছিল। এখন কুনোখানে নাই।
তাই নাকি?
হ। হাজেরা তো তাই বইলছে।
বিষয়টা শোনার পর ঘটনাটা বোঝা ঈশিতার জন্য সহজ হলো। সে দেখল, হাজেরা নামের মহিলাটা প্রায় বাঘের মতো সাদা পোশাক পরা মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর চিৎকার করে বলছে, কই? আমার ছেলে কই? তুমরা পরশু দিন নিয়া গেছ।
সাদা পোশাক পরা মাঝবয়সী একজন মানুষ বলল, আমরা কেমন করে বলব তোমার ছেলে কোথায়?
পরশু দিন এই অ্যাম্বুলেন্সে করে নিছ।
নিয়ে থাকলে হাসপাতালে আছে।
নাই। আমি গিয়ে দেখেছি। অন্যরা আছে, কিন্তু আমার ছেলে নাই।
তাহলে অন্য কোথাও আছে।
আমি সব জায়গা খুঁজছি। মেডিকেল গেছি, কোথাও নাই।
না থাকলে আমরা কী করব?
তোমরা নিয়েছ, কোথায় নিয়েছ বলো। হাজেরা নামের মহিলাটা চিৎকার করে উঠল, কোথায় নিয়েছ? কোথায়?
ঠিক এ রকম সময় কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে এল। তারা রাইফেলের বাঁট দিয়ে ধাক্কা মেরে সবাইকে সরিয়ে দেয়, চিৎকার করে বলে, সরে যাও। সবাই সরে যাও। অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে যেতে দাও।
সাদা পোশাক পরা মানুষগুলো ঝটপট অ্যাম্বুলেন্সে উঠে পড়ে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাইরেন বাজাতে বাজাতে সেগুলো চলতে শুরু করে। হাজেরা অ্যাম্বুলেন্সের পেছন পেছন ছুটে যেতে চেষ্টা করল। দুজন পুলিশ তাকে থামাল।
হাজেরা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মতো চিৎকার করতে থাকে। তখন একজন পুলিশ প্রচণ্ড জোরে তাকে ধমক দেয়, পেয়েছটা কী? মাতলামির জায়গা পাও না? সরকারি কাজে ডিস্টার্ব করো?
