সমীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার তখন ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে, তবু সাহস করে বললাম, এটা ফালতু কথা না। এটা খুবই ডেঞ্জারাস কথা। লোকটা তখন রিভলবারের নল দিয়ে আমার মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে বলল, চোপ ব্যাটা মালাউন। আমি যদি বলি এটা ফালতু, তাহলে এটা ফালতু। বুঝেছিস?
আমার এই কম কথাগুলো বলতে বলতে সমীরের মুখ শক্ত হয়ে যায়। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তখন আমার মাথার মগজে রক্ত উঠে গেল। আমি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললাম, গেট আউট। গেট আউট আমার বাসা থেকে। লোক দুইটা তখন কেমন যেন হকচকিয়ে গেল, ওরা বুঝতে পারে নাই আমি এইভাবে রেগে উঠব। ওরা ভেবেছে আমাকে ভয় দেখালে আমি ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকব।
রাফি একটু ঝুঁকে বলল, তারপর কী হলো?
লোক দুইটা তখন উঠে দাঁড়াল, যেইটা একটু বয়স্ক সেইটা বলল, শোনো ছেলে। এই ভাইরাস নিয়ে যদি আর একটা কথা বলো তাহলে তোমার লাশ পড়ে যাবে। খোদার কসম।
তুমি কী বললে?
আমি বললাম, আমার যদি বলার ইচ্ছা করে তাহলে আমি একশবার বলব। তোমার যদি ক্ষমতা থাকে লাশ ফেলে দেওয়ার, লাশ ফেলে দিয়ে। আমি ভয় পাই না! যদিও বলেছি ভয় পাই না—কিন্তু আসলে ভয়ে আমার হার্টফেল করার অবস্থা! মনে হয় অনেক জোরে চিৎকার করেছি। পাশের ফ্ল্যাট থেকে তখন কবির ভাই এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছ কেন?
আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলাম, কবির ভাই ঢুকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? লোকটা ততক্ষণে রিভলবারটা লুকিয়ে ফেলেছে। সে বলল, কিছু হয় নাই। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কবির ভাই জানতে চইল, কী ব্যাপার। আমি কিছু বললাম না। কবির ভাই তখন আমাকে ঘাটাল না।
সমীর কিছুক্ষণ মুখ শক্ত করে রেখে বলল, সকালবেলা তোমার কাছে এলাম, আমার সেই ঈশিতা মেয়েটার সঙ্গে একটু পরামর্শ করা দরকার। তোমার সঙ্গেও বলি। কী করব বুঝতে পারছি না।
এরা কারা?
জানি না। রাতে বাসার সামনে বিশাল একটা গাড়িতে অনেকক্ষণ বসে থাকল। কোনো লুকোছাপা নেই, মনে হয় সরকারি লোক।
সরকারি লোক এ রকম করবে কেন? তোমাকে মালাউন ডাকবে কেন?
সমীর হাসার চেষ্টা করে বলল, আমাদের অনেকেই মালাউন ডাকে, তোমরা সেটা জানো না! যাই হোক, ঈশিতার নম্বরটা দাও, না হলে ফোন করে আমাকে লাগিয়ে দাও।
রাফি ঈশিতাকে ফোন করল, সেখানে একটা ইংরেজি গান রিংটোন। কিন্তু কেউ ফোন ধরল না। কিছুক্ষণের ভেতর একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল, ফোন ধরতেই ঈশিতার গলা শোনা গেল, রাফি?
হ্যাঁ। এখানে একটা ব্যাপার ঘটেছে।
জানি।
জানো?
হ্যাঁ। আমি আমার ফোনে ধরিনি। এটা ট্যাপ করছে। অন্য নম্বর থেকে ফোন করছি। সমীর কেমন আছে?
সমীরের কথাই বলছিলাম। কাল রাতে দুজন লোক—
জানি। ওরা অসম্ভব ডেঞ্জারাস, আমি ফোনে সবকিছু বলতে পারব না। সমীরকে বোলো সাবধানে থাকতে। আজকে ভাইরাসের ওপর ফললাআপ নিউজ থাকার কথা ছিল, আমরা ড্রপ করেছি। সমীরকে বোলো কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলতে।
সমীর এখানে আছে, তুমি কথা বলো।
সমীর কিছুক্ষণ ঈশিতার সঙ্গে কথা বলল। বেশির ভাগ সময় অবশ্যি কথা শুনল, হুঁ হাঁ করল, নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ফোনটা রাফির হাতে ফিরিয়ে দিল। রাফি ফোনটা কানে লাগিয়ে বলল, ঈশিতা।
হ্যাঁ। বলো।
এখন অন্য ঝামেলা শুরু হয়ে গেল, তাই বলার জন্য ঠিক সময় কি না বুঝতে পারছি না। মনে আছে, তুমি নিউরাল কম্পিউটার নিয়ে জানতে চাইছিলে?
হ্যাঁ।
আমি ফ্যান্টাস্টিক রিসোর্স পেয়েছি। তুমি বিশ্বাস করবে না। পৃথিবীর সেরা নিউরাল কম্পিউটার ফার্ম বাংলাদেশে অফিস খুলেছে। কোম্পানির নাম এনডেভার, টঙ্গীতে অফিস। ওয়েবসাইটটা চমৎকার ফ্রেন্ডলি। ওদের অফিসে গেলে—
ঈশিতা বলল, রাফি।
গলার স্বরে কিছু একটা ছিল। রাফি থতমত খেয়ে থেমে গেল। ঈশিতা ঠান্ডা গলায় বলল, আমি এনডেভারে গিয়েছিলাম। সে জন্যই নিউরাল কম্পিউটার সম্পর্কে জানতে চাইছি। যে দুজন লোক সমীরকে ভয় দেখিয়েছে, সেই দুজন আমাকেও ভয় দেখিয়েছে, আমি যেন এনডেভারের ওপর রিপোর্টিং না করি।
কেন?
জানি না। শুধু এটুকু জেনে রাখো, টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে যারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সবার চিকিৎসা করছে এনডেভার।
সত্যি? কেন?
আমারও সেই একই প্রশ্ন। কেন?
কোথায় চিকিৎসা হচ্ছে?
ওদের বিল্ডিংয়ে।
রাফি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ওদের বিল্ডিংয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে?
হ্যাঁ। সেখানে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেন?
জানি না। শুধু মনে হচ্ছে, এনডেভার আগে থেকে জানত, এখানে এফটি টুয়েন্টি সিক্সের ইনফেকশন হবে!
রাফি অবাক হয়ে বলল, কেমন করে জানত?
শুধু একভাবে সম্ভব।
কীভাবে?
যদি নিজেরাই সেই ভাইরাসটা ছড়িয়ে থাকে।
কী বলছ?
ঈশিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, রাফি তুমি আমাকে কথা দাও, আমি যে কথাগুলো বলেছি, তুমি সেগুলো কাউকে বলবে না।
রাফি বলল, বলব না।
আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করো।
টেলিফোনে গা ছোঁয়া যায় না।
জানি। তাতে কিছু আসে যায় না, প্রতিজ্ঞা করো।
করলাম।
যদি দেখো আমাকে মেরে ফেলেছে, তাহলে তুমি কোথা থেকে অগ্রসর হবে, সেটা জানিয়ে রাখলাম।
তোমাকে মেরে ফেলবে কেন?
বলিনি মেরে ফেলবে, বলেছি যদি মেরে ফেলে।
যদির কথাটি কেন আসছে?
জানি না, রাফি।
রাফি হঠাৎ করে একটা অশুভ আশঙ্কা অনুভব করে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সাবধানে থেকো ঈশিতা।
