নিশীতা খুব খুশি হয়ে বলল, যাক বাবা, যা ভয় পেয়েছিলাম!
রাহেলা এই দীর্ঘ সময় একটি কথাও বলে নি, এই প্রথমবার সে শান্ত গলায় বলল, আল্লাহ মেহেরবান।
ক্যাপ্টেন মারুফ চলে আসার পর চারজনের ছোট দলটি আবার অগ্রসর হতে থাকে। কোন দিকে যেতে হবে সেটি রিয়াজ বলে দিতে থাকে। সে একটা ছোট যন্ত্র তার বুকে ঝুলিয়ে নেয় সেখান থেকে একটা হেডফোন বের হয়ে আসছে। দূরে কোথাও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির কিছু তরঙ্গ থেকে সে তার গন্তব্যস্থান বের করে নিতে পারছে। তারা হেঁটে হেঁটে একটার পর একটা গ্রাম পার হয়ে যেতে থাকে। গ্রামের পর গ্রাম থেকে সব মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে–এলাকাগুলো একেবারে প্রেতপুরীর মতো নির্জন। কোথাও কোনো জীবন্ত প্রাণীর চিহ্ন পর্যন্ত নেই, মনে হচ্ছে ঝিঁঝি পোকা পর্যন্ত ডাকতে ভুলে গেছে। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে চারজন পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে, তাদের মনে হতে থাকে তারা বুঝি কোনো অশরীরী জগতে চলে এসেছে।
রিয়াজের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা উঁচু জায়গায় উঠে এল। জায়গাটা বড় বড় গাছ দিয়ে আড়াল করা। সেই জংগলের মতো জায়গাটা থেকে বের হতেই তাদের হৃৎস্পন্দন হঠাৎ করে থেমে যায়। তাদের সামনে হঠাৎ করে যে দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল নিজের চোখে না দেখলে তারা কখনো সেটা বিশ্বাস করত না।
সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঠের বিশ ফুট উঁচুতে একেবারে নিঃশব্দে একটি মহাকাশযান দাঁড়িয়ে আছে। মহাকাশযানটির সাথে পৃথিবীর কোনো কিছুর মিল নেই। মহাকাশযানটি থেকে কোনো আলো বের হচ্ছে না তবু সেটি দেখা যাচ্ছে, খুব ভালো করে দেখলে মনে হয় এটি বুঝি বিশাল কোনো জীবন্ত প্রাণী; এর সমস্ত শরীরে বিচিত্র এক ধরনের টিউব জালের মতো ছড়িয়ে আছে। সেই স্বচ্ছ টিউব দিয়ে খুব ধীরে ধীরে কিছু গোলাকার জিনিস নড়ছে। মনে হয় পুরো জিনিসটি এক ধরনের আঠালো জিনিসে ডুবে আছে, খুব কান পেতে থাকলে ভিতর থেকে এক ধরনের ভেতা শব্দ শোনা যায়।
মহাকাশযানটির ঠিক নিচে নীল এক ধরনের অশরীরী আলো, সেখানে বিচিত্র কিছু মূর্তি। এই মূর্তিগুলো নিশ্চয়ই এক সময় মানুষ ছিল, মহাজাগতিক প্রাণী এসে তাদের শরীরকে দখল করে নিয়ে ব্যবহার করছে। মানুষগুলো মৃত কিন্তু তাদের দেহ নড়ছে– ব্যাপারটি চিন্তা করলেই সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মানুষগুলোর সবার শরীরই এক রকম। মাথার অংশটি বিচিত্রভাবে ফুলে উঠেছে। সেখান থেকে শুঁড়ের মতো কিলবিলে অংশ বের হয়ে এসেছে, খুব আস্তে আস্তে সেগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ছে। মানুষগুলোর দেহ একইসাথে যান্ত্রিক এবং জৈবিক। প্রায় পঞ্চাশটি এই ধরনের প্রাণী মহাকাশযানের নিচে খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে। হঠাৎ করে তাকালে মনে হয় সেখানে বুঝি কোনো এক ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান হচ্ছে, এই বিচিত্র প্রাণীগুলোর হাত পা শরীর ড়গুলোর নড়াচড়ার মাঝে এক ধরনের অশরীরী ছন্দ রয়েছে। মনে হচ্ছে তারা বুঝি কোনো প্রেতলোকে চলে এসেছে এবং সেই প্রেতলোকের অশরীরীরা মৃত্যুর অপর পাশে থেকে তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পুরো দৃশ্যটি এত অবাস্তব এবং এত অস্বাভাবিক যে তারা চারজন একেবারে পাথরের মতো জমে গেল। দীর্ঘ সময় কেউ কোনো কথা বলতে পারে না–হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সবার আগে সংবিৎ ফিরে পায় রাহেলা, সে চাপা এবং উত্তেজিত গলায় বলে, যাদু! আমার যাদুমণি।
নিশীতা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কোথায়?
ঐ তো। মাঝখানে।
নিশীতা ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেল সত্যিই একেবারে মাঝখানে একটা ছোট পিলারের উপর একটি ছোট শিশু। এত দূর থেকে ভালো করে দেখা যায় না। কিন্তু তবু মনে হয় তার চারপাশের ভয়াবহ ঘূর্তিগুলোর অশরীরী কার্যকলাপের মাঝে শিশুটি নির্বিকারভাবে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে।
রিয়াজ তার পিঠ থেকে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে বলল, আমরা এখান থেকেই কাজ শুরু করি।
ক্যাপ্টেন মারুফ জিজ্ঞেস করল, কী কাজ?
এই মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে যোগাযোগ।
ক্যাপ্টেন মারুফ চমকে উঠে বলল, আপনি পারবেন?
ফ্রেড লিস্টার যদি পারে তা হলে আমি কেন পারব না? সেই বদমাইশ তো আমার কোডিং ব্যবহার করেই যোগাযোগ করছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ চারদিকে তাকিয়ে বলল, কোথায় ফ্রেন্ড লিস্টার?
রিয়াজ তার নাইটভিশন গগলসটি ক্যাপ্টেন মারুফকে দিয়ে বলল, এটা দিয়ে দেখেন, মোটামুটিভাবে ইলেভেন ও ক্লক পজিশন। দু শ মিটার দূরে।
ক্যাপ্টেন মারুফ গগলস চোখে দিয়েই দেখতে পেল অন্যপাশে ফ্রেন্ড লিস্টার এবং আরো কয়েকজন মানুষ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে। সেখানে এক ধরনের ব্যস্ততা। যন্ত্রপাতির মাঝে উবু হয়ে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে তারা কিছু একটা লক্ষ করছে। মানুষগুলোকে দেখে ক্যাপ্টেন মারুফ নিজের ভিতরে এক ধরনের বিজাতীয় ক্রোধ অনুভব করে, দাঁতে দাঁত ঘষে সে বলল, ধড়িবাজ বদমাইশের দল। আমি যদি তোদের মুণ্ডু ছিঁড়ে না নিই!
রিয়াজ হেসে বলল, মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেলার অনেক সময় পাওয়া যাবে, আপাতত আমাকে একটু সাহায্য করুন। এই এ্যান্টেনাটা উঁচু কোনো জায়গায় বসিয়ে দিন।
ক্যাপ্টেন মারুফ গগলসটা খুলে রিয়াজকে সাহায্য করতে করে। কিছুক্ষণের মাঝেই বড় একটা গাছের পিছনে কিছু ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে তাদের যন্ত্রপাতি দাঁড়া হতে থাকে। একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার ছোট আর. এফ. জেনারেটর আর তার কন্ট্রোল সার্কিটের সাথে জুড়ে দেওয়া হল। এ্যান্টেনা থেকে কো–এক্সিয়াল তার এনে কন্ট্রোল সার্কিটের সাথে জুড়ে দেওয়ামাত্রই এমপ্লিফায়ারের সাথে লাগানো দুটি স্পিকার থেকে মানুষের এক ধরনের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল। নিশীতা চমকে উঠে বলল, কে কথা বলছে?
