রাহেলা মাথা নেড়ে কাতর গলায় বলল, না, আমি যাব। আমি আমার যাদুর কাছে যাব। আল্লাহর কসম লাগে আমাকে নিয়ে যান
ক্যাপ্টেন মারুফ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, রিয়াজ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ঠিক আছে রাহেলা, আপনি যদি আমাদের সাথে যেতে চান আসুন।
নিশীতা একটু অবাক হয়ে রিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু
কিন্তু কী?
রাহেলা সবকিছু নিয়ে এত অস্থির হয়ে আছে, তাকে এভাবে নেওয়া কি ঠিক হবে? রিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, আমার ধারণা এই পৃথিবীকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে তা হলে সেটি রাহেলাই পারবে। আর কেউ পারবে না।
১০. কাঁচা রাস্তা দিয়ে জিপটা এগিয়ে যাচ্ছে
কাঁচা রাস্তা দিয়ে জিপটা এগিয়ে যাচ্ছে, নিশীতার মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে বুঝি জিপটা উল্টে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যাবে। বাইরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার, জিপের হেডলাইটের। আলোতে অল্প কিছুদূর আলোকিত হয়ে তার চারপাশে অন্ধকার যেন আরো এক শ গুণ গাঢ় করে ফেলা হচ্ছে। তারা কোথায় যাচ্ছে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়–অনেক চেষ্টা করেও নিশীতার সেলুলার টেলিফোনে এপসিলনের কথা শোনা যায় নি, তাই আপাতত রাহেলার বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। মহাজাগতিক প্রাণীকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যকবার দেখা গেছে এই এলাকাতেই। কাছাকাছি একটা জলা জায়গা রয়েছে, রিয়াজের ধারণা তার আশপাশেই মহাজাগতিক প্রাণীটি তার আস্তানা তৈরি করেছে।
জিপের মাঝে চারজন নিঃশব্দে বসে আছে, সবার ভিতরেই একটি বিচিত্র অনুভূতি। কী হবে তার অনিশ্চয়তার সাথে সাথে এক ধরনের অস্বাভাবিক অশরীরী আতঙ্ক। শুধুমাত্র রাহেলার বুকের মাঝে কোনো আতঙ্ক নেই, তার বুক খালি করে শিশুটিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর থেকে তার সকল বোধশক্তি অসাড় হয়ে গেছে–তার বুকের মাঝে এখন শুধু এক ভয়াবহ শূন্যতা।
জিপটি উঁচু-নিচু সড়ক দিয়ে একটা ভাঙা মসজিদের পাশে এসে দাঁড়াল, এখন কোনদিক দিয়ে যেতে হবে ক্যাপ্টেন মারুফ সেটা যখন বের করার চেষ্টা করছে ঠিক তখন নিশীতার সেলুলার টেলিফোনটি বেজে উঠল নিশীতা দ্রুত কানে লাগাল, হ্যাঁলো।
নিশীতা?
হ্যাঁ।
এইমাত্র একটা হেলিকপ্টার আকাশে উঠেছে। তোমরা কী করছ ফ্রেন্ড লিস্টার তার খবর পেয়েছে। হেলিকপ্টারটা তোমাদের থামানোর চেষ্টা করবে।
কীভাবে থামানোর চেষ্টা করবে?
দুটো রিকয়েললেস রাইফেল আছে। মনে হয় গুলি করে তোমাদের জিপটা উড়িয়ে দেবে।
সর্বনাশ! আমরা তা হলে এখন কী করব?
সেটা তো জানি না।
নিশীতা আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই খুট করে লাইন কেটে গেল।
রাস্তার ওপর একটা বড় গর্তকে সাবধানে পাশ কাটিয়ে ক্যাপ্টেন মারুফ জিজ্ঞেস করল, কে ফোন করেছে? কী বলেছে?
এপসিলন বলেছে একটা হেলিকপ্টার আসছে আমাদের গুলি করতে।
নিশীতার কথা শেষ হবার আগেই ক্যাপ্টেন মারুফ জিপটাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, সবাই নেমে যান।
কোনো কথা না বলে সবাই নেমে পড়ে। জিপের পিছন থেকে নিশীতা আর রিয়াজের ব্যাকপ্যাক দুটো সাবধানে নামিয়ে নেওয়ার পর ক্যাপ্টেন মারুফ বলল, আপনারা রাস্তার ওপর থেকে সরে যান।
রিয়াজ জিজ্ঞেস করল, আপনি?
আমিও আসছি। জিপটাকে চালিয়ে রেখে নেমে পড়তে হবে যেন বুঝতে না পারে জিপে কেউ নেই। তা না হলে আমাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।
ঠিক আছে। সাবধানে থাকবেন।
ক্যাপ্টেন মারুফ জিপটা চালিয়ে সামনের দিকে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই অন্যরা দূরে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পেল। নিশীতা আর রিয়াজ তাদের ব্যাকপ্যাক দুটো ঘাড়ে তুলে নিয়ে দ্রুত রাস্তা থেকে নিচে নেমে দূরে ঝোঁপঝাড়ের দিকে সরে গেল।
কিছুক্ষণের মাঝেই মূর্তিমান ধ্বংসের মতো তাদের মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টারটি দূরে জিপের দিকে এগিয়ে যায়। নিশীতার বুক ধকধক করতে থাকে, গ্রামের কাঁচা সড়ক দিয়ে জিপটি তখনো হোঁচট খেতে খেতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, জিপ থেকে ক্যাপ্টেন মারুফ নেমে গেছে কি না কেউ বুঝতে পারছে না। দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারা দেখতে পেল হেলিকপ্টার থেকে একটা মিসাইল উড়ে গেল জিপের দিকে এবং কিছু বোঝার আগে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে পুরো জিপটি ছিন্নভিন্ন হয়ে দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল–তারা যদি সময়মতো জিপ থেকে নেমে না পড়ত তা হলে এতক্ষণে তাদের কী অবস্থা হত চিন্তা করে নিশীতা আতঙ্কে শিউরে ওঠে।
রিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে চাপা গলায় বলল, ক্যাপ্টেন মারুফ সময়মতো নামতে পেরেছে তো?
না নেমে থাকলে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে চিন্তাটুকু জোর করে মন থেকে দূর করে সরিয়ে দিয়ে নিশীতা বলল, নিশ্চয়ই পেরেছে।
তারা দেখতে পেল হেলিকপ্টারটি আবার ঘুরে জ্বলন্ত জিপের কাছে এগিয়ে এসে নিছ হয়ে সেটাকে ঘিরে উড়ে আবার উপরে উঠে দূরে চলে যেতে শুরু করেছে। বেশি দূর না গিয়েই সেটা সামনে কোথায় জানি নেমে পড়ল। রিয়াজ বাইনোকুলার দিয়ে দেখতে দেখতে বলল, আমার ধারণা হেলিকপ্টারটি যেখানে নেমেছে আমাদেরকেও সেখানে যেতে হবে।
হেলিকপ্টারে করে ফ্রেন্ড লিস্টার মহাজাগতিক প্রাণীটির আস্তানায় গিয়েছে?
ঠিক আস্তানা না হলেও আস্তানার খুব কাছাকাছি।
আমরা কি এখানে ক্যাপ্টেন মারুফের জন্য অপেক্ষা করব নাকি সামনে এগিয়ে যাব?
সামনে এগুতে থাকি। রিয়াজ ব্যাকপ্যাক থেকে তার নাইটভিশন গগলস বের করে দূরে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, ঐ তো ক্যাপ্টেন মারুফকে দেখতে পাচ্ছি–এই দিকেই আসছেন।
