উপস্থিত সবাই মাথা নাড়ল, বলল, এটা সত্যি কথা।
প্রায় সবার বেলাই এটা সত্যি যে তারা দেখেছে কোনো একটা খুনি বা সন্ত্রাসী ঠিক যখন বড় কোনো অপরাধ করতে যাচ্ছে ঠিক তখন তাকে আক্রমণ করছে, শুধু একটি ব্যতিক্রম, সেটি হচ্ছে রাহেলার শিশুর ব্যাপারটি। ঠিক কী ঘটেছে সেটা জানার জন্য নিশীতা এবং রিয়াজকে খুব কষ্ট করতে হল। রাহেলা ঠিক করে কথাই বলতে পারছিল না–একটু পরে পরে ডুকরে কেঁদে উঠছিল। অনেক চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত তার মুখ থেকে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেল, সেটি এ রকম :
সন্ধেবেলা রাহেলা তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। বাচ্চার বয়স মাত্র সাত দিন কোলের মাঝে আঁকুপাকু করে কাঁদছে এবং রাহেলার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এই ছোট শিশুটা গত নয় মাস তার শরীরের ভিতরে বিন্দু বিন্দু করে বড় হয়ে উঠেছে। এই শিশুটির জন্মের পর তার দৈনন্দিন প্রতিটি মুহূর্ত এখন এই শিশুটিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এত ছোট একজন মানুষ কীভাবে একজনের জীবনের সবটুকু পরিবর্তিত করে ফেলতে পারে সেই বিষয়টি নিয়ে রাহেলা যখন মনে মনে খুব অবাক হয়ে যাচ্ছিল তখন সে উঠানের পাশে হাস্নাহেনা গাছের কাছে সরসর করে পাতার শব্দ শুনতে পেল–তাদের পোষা কুকুর ভেবে ঘুরে তাকাতেই রাহেলার সমস্ত শরীর আতঙ্কে জমে গেল। হাস্নাহেনা গাছের নিচে মানুষের আকৃতির একটা জীব দাঁড়িয়ে আছে। জীবটির শরীর ধাতব, চোখ দুটো অংগারের মতো লাল হয়ে জ্বলছে।
রাহেলা তার বাচ্চাটিকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে পিছন দিকে ছুটে যেতে গিয়ে আবিষ্কার করল ঠিক তার পিছনেও এ রকম একটা জীব দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের আকৃতির এই জীবটির মাথা থেকে কিলবিল করে সাপের মতো কিছু একটা নড়ছে।
রাহেলা তখন তার ডানে বামে তাকাল এবং দেখল সেখানেও ঠিক একই রকম কয়েকটা জীব দাঁড়িয়ে আছে। জীবগুলো তখন খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাকে গোল হয়ে ঘিরে ফেলতে লাগল। রাহেলাকে কেউ বলে দেয় নি কিন্তু সে বুঝতে পারল এই জীবগুলো তার বাচ্চাকে কেড়ে নিতে আসছে। সে তখন তার বাচ্চাটাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলল, –না–না–কেউ আমার কাছে আসবে না, খবরদার।
কিন্তু জীবগুলো ভ্রূক্ষেপ করল না, খুব ধীরে ধীরে তাদের হাতগুলো উপরে তুলে এগিয়ে আসতে লাগল। রাহেলা তখন বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ছুটে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর জীবগুলো তাদের শুড় দিয়ে তাকে ধরে ফেলল। রাহেলা বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরে প্রাণপণ চেষ্টা করল ছুটে যেতে কিন্তু প্রাণীগুলোর শরীর লোহার মতো শক্ত আর বরফের মতো শীতল। তাকে নিচে ফেলে তার বুক থেকে বাচ্চাটাকে কেড়ে নিল। রাহেলা আঁচড়ে–কামড়ে প্রাণীটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল কিন্তু প্রাণীগুলো তাকে ঝটকা মেরে নিচে ফেলে দিয়ে হেঁটে চলে গেল। রাহেলা উন্মাদিনীর মতো পিছনে পিছনে ছুটে যেতে চাইছিল কিন্তু তার চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে এসে তাকে ধরে রেখেছিল বলে সে যেতে পারে নি। পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে সে অচেতন হয়ে গিয়েছিল।
কথা বলা শেষ করে রাহেলা আবার দুই হাতে মুখ ঢেকে আকুল হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করল। নিশীতা রাহেলাকে শক্ত করে ধরে রাখে, ঠিক কী ভাষায় তাকে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে। পারে না।
রিয়াজ গম্ভীর মুখে হেঁটে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। একটু পরে ক্যাপ্টেন মারুফ আর নিশীতা তার পাশে এসে দাঁড়াল। রিয়াজ ঘুরে ক্যাপ্টেন মারুফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ক্যাপ্টেন মারুফ, আপনার কি এখনো এই ব্যাপারটি নিয়ে কোনো সন্দেহ আছে?
ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নাড়ল, বলল, না, নেই।
তা হলে কি আপনার কাছে আমি আরো একটু সাহায্য পেতে পারি?
কী সাহায্য?
আমাকে কি আপনার জিপে করে আপনি এই মহাজাগতিক প্রাণীর আস্তানায় নিয়ে যাবেন?
নিশ্চয়ই নিয়ে যাব। আপনি জানেন সেটি কোথায়?
রিয়াজ মাথা নাড়ল, বলল, না জানি না।
তা হলে?
নিশীতার কাছে একটি সেলুলার টেলিফোন আছে
ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু এখানে নেটওয়ার্কে সিগন্যাল নেই, সেলুলার ফোন কাজ করবে না।
রিয়াজ হাসার ভঙ্গি করে বলল, সেটা নিয়ে ভাববেন না। নিশীতার সেলুলার ফোনের ব্যাটারির চার্জ অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে, তার পরেও সেখানে সময়মতো ফোন আসছে। কোথায় যেতে হবে আমাদের বলে দিচ্ছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ অবাক হয়ে বলল, কে বলে দিচ্ছে?
এপসিলন।
এপসিলন? সেটা কে?
নিশীতা বলল, ড, হাসানের একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম।
কম্পিউটার প্রোগ্রাম?
রিয়াজ ইতস্তত করে বলল, কোনো একটি প্রাণী আমার এই প্রোগ্রামটি ব্যবহার করে আমাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না—
আমরাও ঠিক বুঝতে পারছি না শুধু একটি জিনিস জানি–আমরা একেবারে একা নই।
চমৎকার। চলুন তা হলে যাই
চলুন।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় রাহেলা পাগলের মতো ছুটে এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?
রিয়াজ একটু ইতস্তত করে বলল, আমরা যাচ্ছি ঐ প্রাণীগুলোর আস্তানায়।
রাহেলা চোখ বড় বড় করে বলল, আমি যাব আপনাদের সাথে।
ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নেড়ে বলল, আপনি কেমন করে যাবেন?
নিশীতা বলল, আমরা এখনো জানি না কেমন করে যাব। সেখানে কী হবে আমাদের কোনো ধারণা নেই।
