তারপর?
আজহার মুন্সী বলল, তখন আবার সেটা দাঁড়িয়ে গেল, তারপর ঘুরে চলে গেল।
রিয়াজ জিজ্ঞেস করল, আপনি তখন কী করলেন?
আমি অনেক কষ্ট করে হাতের বাঁধন খুলে উঠে দাঁড়িয়েছি। রতন ব্যাপারির অবস্থা দেখার জন্য তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। দেখি তার শরীরটা কাঁপছে।
কাঁপছে?
হ্যাঁ। আমার তখন ভয় লেগে গেল।
কী করলেন তখন?
ভাবলাম উঠে দৌড় দেই। ঠিক তখন রতন ব্যাপারির চোখ খুলে গেল। আপনি বিশ্বাস করবেন না চোখ দুটো টর্চ লাইটের মতো জ্বলছে। আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম ঠাস্ শব্দ করে মাথার কাছে একটা ফুটো হয়ে সেদিক দিয়ে সাপের মতো কী একটা জিনিস বের হয়ে এল।
আজহার মুন্সী কয়েক মুহূর্তের জন্য থামল; তারপর একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি তখন আমার জান নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।
রতন ব্যাপারির কী হল?
একবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম সে টলতে টলতে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে। আগের মূর্তিটা যেদিকে গিয়েছে সেদিকে। সেও দানব হয়ে গেছে।
রিয়াজ একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, এই প্রসেসটার একটা নাম আছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ জানতে চাইল, কোন প্রসেসটার?
মহাজাগতিক প্রাণী এসে যখন লোকাল প্রাণীর শরীরকে ব্যবহার করে।
কী নাম?
এলিয়েন হোষ্টিং। এলিয়েন হোষ্টিং খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এর অর্থ এই প্রাণী ইচ্ছে করলে পুরো পৃথিবী দখল করে ফেলতে পারবে।
নিশীতা হাতের ঘড়ি দেখে বলল, ড. হাসান, আমাদের হাতে কিন্তু সময় নেই।
হ্যাঁ, আমরা অন্যদের কথাও শুনে নিই। এর মাঝেই কিন্তু একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।
নিশীতা জিজ্ঞেস করল, কী প্যাটার্ন?
প্রথম কেসটা তুমি যেটা বলেছিলে সেখানে এলিয়েন হোস্টিং করেছিল একজন টেররিস্টকে। এখানেও এলিয়েন হোষ্টিং করেছে একজন মার্ডারারকে, অন্ততপক্ষে যে মার্ডার করতে চাইছিল সেই মানুষকে!
রমিজ মাস্টার গলা উঁচু করে বলল, আমি যেটা দেখেছি সেটাও এ রকম কেস। সেখানেও আমাকে মানুষটা মার্ডার করতে চাইছিল।
উপস্থিত অন্য মানুষগুলো হঠাৎ সবাই একসাথে কথা বলার চেষ্টা করল, সবারই বলার মতো এই ধরনের গল্প রয়েছে। রিয়াজ হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল, বলল, একজন একজন করে শোনা যাক।
এর পরের ঘটনাটি বর্ণনা করল তিনজন মিলে। তাদের নাম হান্নান, ইদরিস আর সোলায়মান। সম্পর্কে এরা ফুপাতো এবং মামাতো ভাই, বাজারে মালা ফ্যাশন নামে তাদের একটা কাপড়ের দোকান আছে। এলাকার বখে যাওয়া চাঁদাবাজ সবুজ আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা মালা ফ্যাশনে এসে মোটামুটি নিয়মিতভাবে চাদাবাজি করে। এদের অত্যাচারে ছোট–বড় সব ব্যবসায়ী একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। শেষে আর কোনো উপায় না দেখে সবাই মিলে একত্র হয়ে একদিন তাদের ধরে পুলিশে দিয়ে দিল। আসল সমস্যার শুরু হল তখন পুলিশ টাকাপয়সা খেয়ে তাদের ছেড়ে দিল। সবুজ আর সাঙ্গপাঙ্গরা মিলে তখন ঠিক করল এর প্রতিশোধ নেবে। হান্নান, ইদরিস আর সোলায়মানদের খুন করে ফেলবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এক রাতে তারা যখন বাড়ি ফিরে আসছে, জলার কাছাকাছি একটা নির্জন জায়গায় সবুজ তার দলবল নিয়ে তাদের ধরে ফেলল। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে কিল ঘুসি লাথি মেরে তাদেরকে জলার ধারে নিয়ে এসে দাঁড় করায়। সবুজ তার রিভলবার বের করে গুলি করার জন্য, ঠিক তখন একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল, হঠাৎ করে সবুজের দলবলের সবাই কিছু একটা দেখে চিৎকার করে পালিয়ে যেতে শুরু করল। হান্নান, ইদরিস আর সোলায়মান পিছন দিকে তাকিয়ে দেখে জলার ভিতর থেকে কিম্ভুতকিমাকার একটা মূর্তি উঠে আসছে। এটা দেখতে অনেকটা মানুষের মতো কিন্তু পুরোপুরি মানুষ নয়, মাথা থেকে অনেকগুলো শুড়ের মতো কিছু ঝুলছে। চোখ দুটো থেকে লাল আলো বের হয়ে আসছে। একটা হাতের ভিতর নানা রকম যন্ত্রপাতি, দেখে মনে হয় একই সাথে মানুষ, যন্ত্র এবং পশু।
এই মূর্তিটাকে দেখে সবুজ সেটাকে গুলি করতে করে কিন্তু তার কিছুই হয় না, মূর্তিটা এক পা এক পা করে এগুতে থাকে। শেষ মুহূর্তে সবুজও ভয় পেয়ে যায়। সে ছুটে পালিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মূর্তিটার হাতের ভিতর থেকে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো কিছু একটা বের হল, সবুজ তাতে আটকা পড়ে যায়। সেই মূর্তিটা তখন সবুজের কাছে এগিয়ে যায়, তখন হঠাৎ তার শরীরের ভিতর থেকে ছোট ছোট সরীসৃপের মতো প্রাণী বের হয়ে আসে, সেগুলো কিলবিল করে সবুজের শরীরের ভিতরে ঢুকে যায়। সবুজ বিকট স্বরে চিৎকার করতে থাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কী হয়েছে দেখার জন্য। তিনজনের কারোই আর সাহস হয় না, কোনোমতে তারা তাদের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে।
রিয়াজ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, আপনারা বলছেন আপনারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছেন–কিন্তু কথাটি কি সত্যি? সেই মূর্তিটা তো ইচ্ছে করলে আপনাদেরও হাই ভোল্টেজ শক দিয়ে ধরে ফেলতে পারত। পারত না?
পারত। মানুষ তিনজন মাথা নেড়ে বলল, ইচ্ছা করলেই পারত। কিন্তু সেটা করে নি।
আমরা আগেও এই প্যাটার্ন দেখেছি। এই মূর্তি বা এলিয়েন বা মহাজাগতিক প্রাণীটা শুধুমাত্র মার্ডারার বা ক্রিমিনালদের শরীরে আশ্রয় নিচ্ছে সাধারণ মানুষদের ছেড়ে দিচ্ছে। তাদের কোনো ক্ষতি করছে না।
না, মিথ্যা কথা। রাহেলা চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠল, আমার যাদু কি অপরাধ করেছে? সাত দিনের একটা মাসুম বাচ্চাকে তা হলে কেন নিয়ে গেল?
