মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ গলায় শ্লেষ ঢেলে বলল, আপনার ভয় করছে না যে ভাইরাসের আক্রমণ হয়ে যাবে?
ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নাড়ল, বলল, না, করছে না।
মানুষটি অবাক হয়ে বলল, কেন করছে না?
নিশীতা এগিয়ে এসে বলল, কারণ, আমরা জানি আপনাদের ভাইরাসের সংক্রমণ হয় নি।
মানুষগুলো নিশীতার কথা শুনে চমকে উঠল, এক মুহূর্ত নীরব থেকে একসাথে সবাই কথা বলে উঠতেই ক্যাপ্টেন মারুফ হাত তুলে তাদের থামিয়ে দেয়। মধ্যবয়স্ক মানুষটি একটু এগিয়ে এসে বলল, যদি আমাদের ভাইরাসের সংক্রমণ না হয়ে থাকে তা হলে আমাদের এখানে আটক রেখেছেন কেন? আমাদের যেতে দিচ্ছেন না কেন?
আসলে ঠিক আমরা আটকে রাখি নি।
তা হলে কে আটকে রেখেছে?।
সেটা অনেক বড় একটা কাহিনী–কোনো এক সময়ে আপনারা সবাই এটা জানবেন। এখন আমাদের সময় খুব কম–আমরা যে জন্য এসেছি সেটা সেরে নিই।
রমিজ মাস্টার বলল, কী জন্য এসেছেন?
রিয়াজ বলল, আপনারা ঠিক কী দেখেছেন আমরা সেটা শুনতে এসেছি।
মানুষগুলো আবার একসাথে কথা বলতে শুরু করতেই রমিজ মাস্টার হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, একজন একজন করে বলেন।
মানুষগুলো মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, একজন একজন করে।
রিয়াজ বলল, হ্যাঁ, আসুন দাঁড়িয়ে না থেকে কোথাও বসা যাক।
কমবয়সী একজন বলল, পাশের ঘর থেকে রাহেলাবুকেও ডেকে আনব?
নিশীতা মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, উনাকেও ডেকে আনেন।
রিয়াজ জিজ্ঞেস করল, ইনি কি সেই ভদ্রমহিলা যার বাচ্চাকে নিয়ে গেছে?
হ্যাঁ। রমিজ মাস্টার জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে মাথা নেড়ে বলল, রাহেলার অবস্থা খুব খারাপ, মাথা মনে হয় খারাপ হয়ে যাবে।
কমবয়সী মানুষটি গিয়ে রাহেলাকে ডেকে আনল, তেইশ–চব্বিশ বছর বয়সের গ্রাম্য। মহিলা, চেহারার মাঝে এক সময়ে এক ধরনের কমনীয়তা ছিল কিন্তু এখন অনেকটা উন্মাদিনীর মতো। মাথায় রুক্ষ চুল, চোখ লাল, সমস্ত চোখেমুখে এক ধরনের ব্যাকুল। অস্থিরতা। ক্যাপ্টেন মারুফ, নিশীতা আর রিয়াজকে দেখে প্রায় হাহাকার করে বলল, আমার যাদুরে এনে দেন আপনারা। আল্লাহর কসম লাগে—আমার যাদুরে এনে দেন।
নিশীতা রাহেলার হাত ধরে বলল, আপনি একটু শান্ত হোন–আগে একটু শুনি কী হয়েছে। কিছু একটা যদি করতে হয় তা হলে আগে আমাদের জানতে হবে ঠিক কী হয়েছে।
রিয়াজ বলল, হ্যাঁ, আগে আমরা শুনি ঠিক কী হয়েছে। একজন একজন করে শুনি।
মানুষগুলো একজন একজন করে তাদের কথা বলতে শুরু করল। প্রথমে বলল আজহার মুন্সী। রাত্রিবেলা শহর থেকে ফিরে আসছিল, সড়কের কাছে বটগাছের নিচে তার রতন ব্যাপারির সাথে দেখা। রতন ব্যাপারির অনেক দিন থেকে আজহার মুন্সীর এক টুকরো জমির ওপর লোভ। জাল দলিল, কোর্ট–কাছারি করেও খুব সুবিধে করতে পারছে না বলে অন্যভাবে অগ্রসর হতে চাইছে। বটগাছের নিচে জমাট অন্ধকারে তাকে কয়েকজন চেপে ধরল। কিছু বোঝার আগেই তাকে নিচে ফেলে দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। আজহার মুন্সী আতঙ্কিত চোখে দেখে রতন ব্যাপারি ধারালো একটা চাকু নিয়ে এগিয়ে আসছে, ঠিক তখন হঠাৎ খুব একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল, আজহার মুন্সী অবাক হয়ে দেখল রতন ব্যাপারির কাছে একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণীটি মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নয়, অন্ধকারেও কোনো কারণে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, সম্ভবত তার শরীর থেকে এক ধরনের আলো বের হয়। প্রাণীটির চোখ দুটো ছিল তীব্র লাল, মনে হয় যেন দুটো বাতি জ্বলছে। মাথা থেকে অনেকগুলো গুড়ের মতো বের হয়ে আসছে। সেগুলো কিলবিল করে নড়ছে। প্রাণীটা সেই ঔড় দিয়ে রতন ব্যাপারিকে খপ করে চেপে ধরে ফেলল। আজহার মুন্সীকে যে মানুষগুলো মাটিতে চেপে ধরে রেখেছিল তারা ততক্ষণে পালিয়ে গেছে– বটগাছের নিচে এখন তারা দুজন। রতন ব্যাপারি তখন ভয়ে আতঙ্কে তার হাতের চাকু দিয়ে সেই ভয়াবহ প্রাণীটিকে আঘাত করতে থাকে।
গল্পের এই পর্যায়ে এসে আজহার মুন্সী থেমে যায়। রিয়াজ জিজ্ঞেস করল, তারপর কী হল?
আজহার মুন্সী স্বভাবতই খুব বিচলিত হয়ে আছে, খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, এই। জিনিসটা মনে হয় লোহার তৈরি। চাকু দিয়ে প্রত্যেকবার ঘা দিতেই ঠন করে শব্দ হয়। রতন ব্যাপারির শরীরেও মোষের মতো জোর, পাগলের মতো কুপিয়ে যাচ্ছে। কোপাতে কোপাতে মনে হল চাকু দিয়ে সেই লোহার শরীর কেটে ফেলল। গলার কাছাকাছি কেটেছে। কাটতেই সেদিক দিয়ে সাবানের ফেনার মতো সবুজ রঙের আঠালো জিনিস বের হতে শুরু করল। তখন হঠাৎ সেখানে ইঁদুরের মতো একটা প্রাণী লাফ দিয়ে বের হয়ে এসে রতন ব্যাপারিকে কামড় দিয়ে ধরল।
আজহার মুন্সী আবার থেমে গিয়ে জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। রিয়াজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আজহার মুন্সীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তারপর?
সেই ইঁদুরের মতো ছোট্ট জন্তুটা পাখির মতন শব্দ করতে করতে রতন ব্যাপারির শরীরের ভিতর ঢুকে গেল।
নিশীতা অবাক হয়ে বলল, শরীরের ভিতরে ঢুকে গেল?
হ্যাঁ।
তারপর?
রতন ব্যাপারি তখন ধড়াম করে মাটিতে পড়ে গিয়ে চিৎকার করছে। আর সেই প্রাণীটা তার শরীরের ভিতর কিলবিল করে নড়ছে। রতন ব্যাপারি গরুর মতো চিৎকার করতে করতে এক সময় নীরব হয়ে গেল।
তারপর?
আজহার মুন্সী একটা নিশ্বাস দিয়ে বলল, আমি তো ভেবেছি আমি শেষ। মাটিতে হাত বাধা হয়ে পড়ে আছি, আর সেই মূর্তিটা আমার কাছে এগিয়ে এসেছে। নিচু হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে, কেমন জানি একটা ওষুধের মতো গন্ধ শরীরে। আমি দেখতে পেলাম শরীরের ভিতরে কী যেন নড়ছে, মনে হয় সেই ইঁদুরের মতো প্রাণীগুলো।
