কিন্তু স্যার
আমি আসছি।
তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ক্যাপ্টেন মারুফ এক্সেলেটরে চাপ দিয়ে জিপটিকে বের করে নিয়ে গেল।
জিপটি রাস্তায় ওঠার পর নিশীতা বলল, শুনেছেন, আমাদেরকে দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ সামনে তাকিয়ে থেকে বলল, তাই সাথে একটা লাইট আর্মস নিয়ে নিয়েছি।
নিশীতা শব্দ করে হেসে বলল, এখন আপনাকে কেউ আর কিছু বলতে পারবে না।
.
প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা বিল্ডিঙের সামনে ক্যাপ্টেন মারুফ জিপটি থামিয়ে সেখান থেকে নেমে পড়ল। বড় একটি লোহার গেটের সামনে দুজন সশস্ত্র মিলিটারি দাঁড়িয়ে ছিল, ক্যাপ্টেন মারুফকে দেখে তারা এগিয়ে এল, নিচু গলায় কিছু কথাবার্তা হল এবং তারা। গেট খুলে দিল। ভিতরে একটা ছোট ঘরে একটা টেবিলের ওপর পা তুলে একজন মানুষ বসে আছে, ক্যাপ্টেন মারুফ এবং তার সাথে নিশীতা আর রিয়াজকে দেখে সে ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এল, ক্যাপ্টেন মারুফকে জিজ্ঞেস করল, এরা কারা?
একজন হচ্ছে সাংবাদিক, অন্যজন সায়েন্টিস্ট।
মানুষটি আঁতকে উঠে বলল, সাংবাদিক? এখানে সাংবাদিক আনা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নাড়লে, বললেন, হ্যাঁ সে জন্যই এসেছেন।
মানুষটি অবাক হয়ে ক্যাপ্টেন মারুফের দিকে তাকাল, বলল, কী বলছেন আপনি?
কেন পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সেটা বোঝা দরকার। এরা এসেছেন কোয়ারেন্টাইন করা মানুষদের দেখতে।
দেখতে? তারা মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত।
এখন পর্যন্ত তাদের কত জন মারা গিয়েছেন?
লোকটি এবারে থতমত খেয়ে বলল, ইয়ে এখনো কেউ মারা যায় নি কিন্তু একজন মহিলা পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গিয়েছে।
এবারে নিশীতা প্রশ্ন করল, মহিলা কী করছে যে জন্য আপনার মনে হচ্ছে তিনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন?
দেয়ালে মাথা ঠুকছে, চিৎকার করছে।
কেন?
শুধু বলছে আমার ছেলে আমার ছেলে!
কী হয়েছে তার ছেলের?
ভাইরাসের আক্রমণের কারণে তার ধারণা হয়েছে কেউ একজন তার ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে।
আপনি কেমন করে জানেন সত্যি সত্যি তার ছেলেকে কেউ নিয়ে যায় নি?
মানুষটি এবারে কেমন যেন হতচকিত হয়ে গেল। নিশীতা তীব্র স্বরে বলল, আপনি পুরুষ মানুষ বলে জানেন না মা আর তার সন্তানের সম্পর্কটা কী রকম। একটা মায়ের ছোট্ট বাচ্চাকে কেউ নিয়ে নিলে তার উন্মাদ হয়ে যাবার কথা। সেটাই স্বাভাবিক। না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।
মানুষটি এবার যুক্তিতর্ক আলোচনা থেকে সরে এল। অনাবশ্যক কঠিন গলায় বলল, আপনাদের এখানে আসার কথা নয়, আপনার সাথে আমার কথা বলারও কথা নয়।
ক্যাপ্টেন মারুফ একটু এগিয়ে এসে বলল, কিন্তু আমার মনে হয় এখন একটু কথা বলা দরকার। কোথাও কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে কি না খোঁজখবর নেওয়া এমন কিছু অপরাধ নয়।
মানুষটি নিচু হয়ে তার ড্রয়ারের ভিতরে কিছু একটা খুঁজতে থাকে, জিনিসটা খুঁজে নিয়ে সে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল তখন ক্যাপ্টেন মারুফ দেখতে পেল সেটা একটা রিভলবার, মানুষটি প্রায় চিৎকার করে বলল, হাত তুলে দাঁড়ান তিনজন, তা না হলে আমি গুলি করব, আমার ওপর অর্ডার আছে।
নিশীতা কিংবা রিয়াজ কখনোই এ রকম পরিবেশে পড়ে নি, কী করবে কিছু বুঝতে পারছিল না, কিন্তু ক্যাপ্টেন মারুফকে একটুও বিচলিত হতে দেখা গেল না, শব্দ করে হেসে বলল, তাই নাকি? অর্ডার আছে?
মানুষটি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই হঠাৎ করে কিছু একটা ঘটে গেল, নিশীতা আবছাভাবে দেখল ক্যাপ্টেন মারুফের শরীর শূন্যে উঠে গেছে, চোখের পলকে সারা শরীর ঘুরে আবার নিচে নেমে এসেছে কিন্তু সেই মুহূর্তে তার পায়ের এক লাথিতে হাতের রিভলবার ছিটকে গিয়ে পড়েছে দেয়ালে। মানুষটি নিজের হাত ধরে কাতর শব্দ করে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ক্যাপ্টেন মারুফ হেঁটে গিয়ে মানুষটির শার্টের কলার ধরে ফিসফিস করে বলল, একটা শব্দ করলে খুন করে ফেলব।
আমার হাত!
সম্ভবত ফ্রাকচার হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই, অর্থোপেডিক সার্জন সেট করে দেবে।
মানুষটি বিস্ফারিত চোখে ক্যাপ্টেন মারুফের দিকে তাকিয়ে রইল। ক্যাপ্টেন মারুফ বলল, টাই কোয়ান্ডো কারাটের মতোই তবে পা অনেক বেশি ব্যবহার করতে হয়। থার্ড ডিগ্রি ব্ল্যাক বেল্ট। সময় পাই নি দেখে ফোর্থ ডিগ্রি কমপ্লিট করতে পারি নি!
ক্যাপ্টেন মারুফ বেশ দক্ষ হাতে মানুষটিকে বেঁধে ফেলল। টেবিল থেকে চওড়া ব্ল্যাক টেপ নিয়ে মুখে লাগানোর সময় নিশীতা বলল, আমি লাগাতে পারি?
ক্যাপ্টেন মারুফ একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি?
হ্যাঁ। আমি শুধু সিনেমায় দেখেছি এগুলো লাগায়, আসলেও যে লাগানো হয় জানতাম না। আমি দেখি কেমন করে লাগানো হয়!
ক্যাপ্টেন মারুফ টেপটা নিশীতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই। চেঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা।
মানুষটি একটা কিছু বলতে চাইছিল তার আগেই নিশীতা তার মুখে ডাক্ট টেপটা লাগিয়ে দিয়ে এক ধরনের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, তার মানে আসলেই এটা কাজ করে।
হ্যাঁ করে। এখন চলুন ভিতরে যাওয়া যাক। ঘরের চাবিটা নিয়ে নিই।
মানুষটার ডেস্কের উপরে একটা চাবির গোছা পাওয়া গেল, সেটা হাতে নিয়ে তিনজন ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
সরু একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে একটা কলাপসিবল গেট পাওয়া গেল। সেটা ভোলার পর একটা বড় কাঠের দরজা, সেটা খোলার পর দেখা গেল হাসপাতালের মতো একটা লম্বা রুম, দু পাশে সারি সারি বিছানা। বিছানায় কেউ শুয়ে নেই, দরজা থেকে কয়েক হাতে দূরে সবাই কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে, সবার চোখে এক ধরনের তীব্র দৃষ্টি। মানুষগুলো কোনো কথা না বলে ক্যাপ্টেন মারুফ, নিশীতা এবং রিয়াজের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ক্যাপ্টেন মারুফ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সবার দিকে একনজর তাকিয়ে বলল, আমরা একটা বিশেষ কাজে আপনাদের সাথে দেখা করতে এসেছি।
