রিয়াজ আর নিশীতাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে তার দরজা বন্ধ করে দিয়ে মিলিটারি অফিসার তাদের দিকে ঘুরে তাকাল, বলল, আমি ক্যাপ্টেন মারুফ। এই পুরো এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার হাতে দেওয়া হয়েছে। কাজেই আশা করছি আপনারা কী করেছিলেন তার খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা আছে।
নিশীতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ আছে। আপনি যেটুকু চিন্তা করতে পারেন তার চাইতেও অনেক ভালো ব্যাখ্যা আছে। আপনি কতটুকু বিশ্বাস করতে প্রস্তুত রয়েছেন সেটি অন্য ব্যাপার।
মারুফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিশীতার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি।
আমি একজন সাংবাদিক। বড় বড় মানুষের সাংবাদিক সম্মেলনে মাঝে মাঝে আমাকে টেলিভিশনে দেখিয়ে ফেলে।
হ্যাঁ। ক্যাপ্টেন মারুফ মাথা নাড়ল, আপনাকে আমি টেলিভিশনে দেখেছি।
নিশীতা রিয়াজকে দেখিয়ে বলল, ইনি ড. রিয়াজ হাসান। আপনারা যে এলাকাটা কর্ডন করে আলাদা করে রেখেছেন সেখানে ড. হাসানের একটা কোড ব্যবহার করা হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ ভুরু কুঁচকে বলল, ড. হাসান কি ভাইরাসের বিশেষজ্ঞ? তার কোড কি ভাইরাস বিষয়ক?
না। নিশীতা মাথা নাড়ল, ড. হাসান ভাইরাস বিশেষজ্ঞ নয়। তার কোডটি হচ্ছে মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে সম্পর্কিত।
ক্যাপ্টেন মারুফ চমকে উঠল, বলল, আপনি কী বলছেন?
হ্যাঁ। আপনারা এই পুরো এলাকাটা কর্ডন করে রেখেছেন কারণ এখানে একটি মহাজাগতিক প্রাণী আশ্রয় নিয়েছে। এখানে কোনো ভাইরাস নেই।
ক্যাপ্টেন মারুফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিশীতার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনি আপনার কথা প্রমাণ করতে পারবেন?
পারব! আমাকে সময় দিলে আপনাকে সবকিছু প্রমাণ করে দিতে পারব। কিন্তু আমাদের হাতে সময় নেই আপনি যদি আমার কথা বিশ্বাস করেন পুরো কাজটুকু অনেক সহজ হয়ে যায়।
আপনারা কী করতে চাইছেন?
আমরা কোয়ারেন্টাইন করে রাখা মানুষগুলোর সাথে কথা বলতে চাই।
কেন?
কারণ তাদের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে সেটি একটি মিথ্যা কথা। তাদেরকে আলাদা করে রাখা হয়েছে কারণ তারা সেই মহাকাশের প্রাণীকে কিংবা প্রাণীর অবলম্বনকে দেখেছে।
ক্যাপ্টেন মারুফ চমকে উঠে নিশীতার দিকে তাকালেন, তার হঠাৎ রমিজ মাস্টারের কথা মনে পড়ে গেল। সত্যিই সেই মানুষটি একটি ভয়ঙ্কর মূর্তির কথা বলছিল, মানুষটিকে একবারও অপ্রকৃতিস্থ মনে হয় নি।
নিশীতা নিচু গলায় বলল, ক্যাপ্টেন মারুফ, আমাদের হাতে সময় খুব বেশি নেই। আপনি কি এই দেশ এবং এই পৃথিবীর বিরুদ্ধে একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে সাহায্য করবেন?
ক্যাপ্টেন মারুফ নিশীতার কথার উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াল, জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার, সেদিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ করে ভিতরে একটি বিচিত্র অনুভূতি অনুভব করতে থাকে। শার্টপ্যান্ট পরা এই বিচিত্র মেয়েটির কথাবার্তায় এক ধরনের দৃঢ়তা আছে, বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। মনে হচ্ছে মেয়েটি সত্যি কথাই বলছে। ভাইরাস সংক্রমণের পুরো ব্যাপারটির মাঝে সত্যি সত্যি বড় ধরনের গরমিল আছে, কিছুতেই হিসাব মেলানো যায় না– এটা সে নিজেই লক্ষ করেছে। কিন্তু সে একজন মিলিটারি অফিসার, মিলিটারি অফিসারদের তো নিয়ম মেনে চলতে হয়। কিছু একটা করার আগে তার অনুমতি নিতে হবে, কিন্তু সে জানে তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। এটি সত্যিই যদি একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকে তা হলে কিছুতেই তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না, বরং ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়ে গেছে জেনে তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তা হলে কি সে নিয়ম ভেঙে এই সাংবাদিক মেয়েটি এবং বিজ্ঞানী মানুষটিকে কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে নিয়ে যাবে? একজন মিলিটারি অফিসার হয়ে সে নিয়ম ভঙ্গ করবে?
ক্যাপ্টেন মারুফ একটা নিশ্বাস ফেলল। উনিশ শ একাত্তরে সেনাবাহিনী নিয়ম ভঙ্গ করে বিদ্রোহ করেছিল বলে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। যারা নিয়ম তৈরি করেছে তারা নিয়মটি খাঁটি করে তৈরি না করলে সেই নিয়ম না ভেঙে কী করবে? ক্যাপ্টেন মারুফ ঘুরে নিশীতা আর ড. রিয়াজের দিকে তাকাল, বলল, ঠিক আছে। চলুন, আপনাদের আমি কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে নিয়ে যাই।
নিশীতা এবং রিয়াজের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তারা উঠে দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন মারুফের কাছে এগিয়ে এল। নিশীতা ক্যাপ্টেন মারুফের হাত স্পর্শ করে বলল, ধন্যবাদ। আপনাকে। অনেক ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন মারুফ।
রিয়াজ বলল, তা হলে এক্ষুনি যাওয়া যাক। আমাদের হাতে কোনো সময় নেই।
তিনজন ক্যাম্প থেকে বের হয়ে একটা জিপে উঠে বসে। নিশীতা আর রিয়াজের ব্যাকপ্যাক দুটি পিছনে রাখা হয়েছে, জিপ স্টার্ট করার আগের মুহূর্তে দেখা গেল একজন জুনিয়র মিলিটারি অফিসার ছুটে আসছে। কাছে এসে স্যালুট করে বলল, স্যার, আপনার। কাছে একটা জরুরি ম্যাসেজ এসেছে।
কী আছে ম্যাসেজে?
অফিসার আড়চোখে নিশীতা এবং রিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, ম্যাসেজে বলা হয়েছে এখানে দুজন পলাতক মানুষ এসেছে। একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা। তাদেরকে যেভাবে সম্ভব এ্যারেস্ট করতে।
আর কিছু?
জি। বলা আছে, মানুষগুলো খুব ডেঞ্জারাস। প্রয়োজন হলে দেখামাত্র তাদের গুলি করা যেতে পারে।
বেশ। ক্যাপ্টেন মারুফ জিপ স্টার্ট করে বলল, ম্যাসেজ রিসিভ করে তাদের কনফার্মেশন করে দাও।
