নিশীতা বলল, বেশ।
দুজনে তাদের ব্যাকপ্যাক নামিয়ে বড় বড় কয়েকটা নিশ্বাস নিল।
তারা প্রায় মাইলখানেক ঘুরে এই জায়গায় পৌঁছেছে। পুরো এলাকাটা কাটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, উপরে হাইভোল্টেজ বিদ্যুতের লাইন এবং নিচে কয়েক জায়গায় লেজার আলোর নিরাপত্তা। কেউ যেন কাছাকাছি আসতে না পারে সেজন্য একটু পরে পরে মিলিটারি আউটপোষ্ট বসানো হয়েছে। রিয়াজ আর নিশীতা দুটো পোস্টের মাঝামাঝি এই জায়গাটা বেছে নিয়েছে।
জায়গাটাতে বেশ কিছু ঝোপঝাড় আছে, পিছনের রাস্তা দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ যখন মিলিটারি জিপ বা ট্রাক যায় তখন এই ঝোপগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা যায়।
রিয়াজ ব্যাগ থেকে একটা গগলস বের করে নিশীতার হাতে দিয়ে বলল, এটা ইনফ্রা রেড গগলস। তুমি চোখে লাগিয়ে পাহারা দাও। অন্ধকারেও দেখতে পারবে।
আপনি কী করবেন?
প্রথমে লেজার নিরাপত্তাটুকু অকেজো করতে হবে, না হয় ভিতরে ঢুকতে পারব না।
নিশীতা গগলসটি চোখে পরতেই তার সামনে চারদিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশের অন্ধকার জগৎটি তার কাছে হঠাৎ করে অতিপ্রাকৃত মনে হতে থাকে।
রিয়াজ তার ব্যাগ থেকে ছোট দুটি লেজার ডায়োড বের করল। কাঁটাতারের পাশাপাশি এই লেজার রশ্মি রাখা আছে, কোনোভাবে রশ্মিটি বাধাপ্রাপ্ত হলেই সরুত চলে যাবে। লেজার রশিটুকু বোঝার জন্য একটু পরপর ফটো ডায়োড রাখা আছে। রিয়াজ তার লেজার ডায়োডটি অন করে ফটো ডায়োডটির উপরে ফেলে নিরাপত্তা রশ্মিটি ঢেকে ফেলল। রিয়াজ নিশ্বাস বন্ধ করে শোনার চেষ্টা করে দূরে কোথাও এলার্ম বেজে উঠল কি না, কিন্তু সেরকম কিছু শোনা গেল না। রিয়াজ একইভাবে দ্বিতীয় লেজারটি অকেজো করে দিয়ে নিশীতাকে ডাকল, নিশীতা।
কী হল?
লেজার দুটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।
চমৎকার।
কাঁটাতার কাটার জন্য বড় ডায়াগোনাল কাটারটি বের কর।
নিশীতা ব্যাকপ্যাক থেকে বড় একটা ডায়াগোনাল কাটার বের করে আনে। রিয়াজ সেটা দিয়ে খুব সহজে কাঁটাতারগুলো কেটে একজন মানুষ যাবার মতো একটা ফুটো করে ফেলল। যন্ত্রপাতিগুলো ব্যাকপ্যাকের মাঝে ঢুকিয়ে রিয়াজ বলল, এস নিশীতা।
নিশীতা ভারী ব্যাকপ্যাকটা টেনে কাছে নিয়ে এল, চোখ থেকে ইনফ্রারেড গগলসটা খুলে রিয়াজকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, এই যে, আপনার অন্ধকারে দেখার গগলস।
তুমি আর পরবে না?
না, চোখে দিলে মনে হয় ভূতের দেশে চলে এসেছি।
কিন্তু খুব কাজের জিনিস।
হ্যাঁ, পৃথিবীতে কত ইঁদুর আর চিকা রয়েছে এটা চোখে না দিলে কেউ জানতে পারবে না।
রিয়াজ হাসল, বলল, হ্যাঁ ঠিকই বলেছ।
নিশীতা চুলগুলো পিছনে নিয়ে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে শক্ত করে বেঁধে মাথায় একটি বেসবল ক্যাপ পরে বলল, চলুন ভিতরে যাওয়া যাক।
চল। রিয়াজ এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, তোমার কি ভয় করছে?
নিশীতা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ করছে। না করাটা বোকামি হবে। তাই না?
হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। কিন্তু এ ছাড়া কিছু করার নেই। সারা পৃথিবীতে শুধু আমিই একমাত্র মানুষ যে এই মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে কথা বলার ভাষা জানি। কাজেই আমাকে যেতেই হবে। রিয়াজ তার ব্যাকপ্যাকটি সাবধানে কাছে টেনে নিয়ে বলল, এখন যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক থাকলে হয়—টানাহ্যাঁচড়া তো কম হল না।
নিশীতা কোনো কথা বলল না, গভীর রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে তারকাটা এবং লেজার নিয়ন্ত্রণ ভেদ করে একটি সংরক্ষিত জায়গায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ঢুকে যাওয়ার একটি উত্তেজনা আছে। ভিতরে একটি মহাজাগতিক প্রাণীর ঘাঁটিতে তাদের জন্য কী ধরনের ভয়ঙ্কর বিস্ময় অপেক্ষা করছে কে জানে।
রিয়াজ জিজ্ঞেস করল, তুমি আগে ঢুকবে, না আমি? আপনিই ঢোকেন।
রিয়াজ নিচু হয়ে ভিতরে ঢোকার জন্য প্রস্তুত হল, ঠিক তখন নিশীতা গলায় একটা শীতল স্পর্শ অনুভব করে, সাথে সাথে কেউ অনুচ্চ স্বরে কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, আমার মনে হয় আপনাদের কারোই ভিতরে ঢোকার প্রয়োজন নেই।
নিশীতা পাথরের মতো জমে গেল। রিয়াজ খুব ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যায় না কিন্তু তবু তারা বুঝতে পারল তাদেরকে ঘিরে কয়েকজন মানুষ। দাঁড়িয়ে আছে, তাদের হতে উদ্যত অস্ত্র। সেফটি ক্যাচ টানার শব্দ শুনতে পেল তারা, মানুষগুলো সশস্ত্র, গুলি করতে প্রস্তুত। অনুচ্চ গলার স্বরে আবার কেউ একজন বলল, দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়ান। সন্দেহজনক মানুষদের গুলি করার জন্য আমাদের কাছে স্পষ্ট নির্দেশ আছে।
নিশীতা এবং রিয়াজ দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াল, এখনো তারা নিজেদের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কাউকে নির্দেশ দিয়ে বলল, ব্যাগ দুটি তুলে নাও।
একজন এসে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ব্যাগ দুটো তুলতে চেষ্টা করতেই রিয়াজ বাধা দিয়ে বলল, সাবধান–প্লিজ সাবধান।
কেন?
এর মাঝে অসম্ভব ডেলিকেট কিছু ইনস্ট্রুমেন্ট আছে।
কী ইনস্ট্রুমেন্ট?
বলতে পারেন এই দেশ থাকবে না ধ্বংস হয়ে যাবে–এমনকি এই পৃথিবী থাকবে না। ধ্বংস হয়ে যাবে সেটা এর ওপর নির্ভর করছে।
মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ব্যাগ দুটি খুব সাবধানে নাও। দেখো যেন ঝাঁকুনি না লাগে।
রিয়াজ নিচু গলায় বলল, ধন্যবাদ। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
একটা মিলিটারি জিপে করে ক্যাম্পে নিয়ে আসা পর্যন্ত কেউ আর কোনো কথা বলল না। নিশীতা দেখল তাদেরকে যে ধরে নিয়ে যাচ্ছে সে একজন কমবয়সী মিলিটারি অফিসার। সাথে আরো কয়জন সেনাবাহিনীর সদস্য। প্রায় মাইল দুয়েক গিয়ে জিপটি একটি কলেজ ভবনের সামনে থামল, এটাকে সাময়িক মিলিটারি ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে।
