নিশীতা চারদিকে তাকাল, এই ঘরে কোনো আসবাবপত্র নেই। শুধুমাত্র মেঝেতে একটা কম্বল বিছিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানে নিশীতাকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। কম্বলটার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ নিশীতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, কম্বলটা উপর থেকে আটকে দিতে পারলে আপনি এটা ধরে উঠতে পারবেন না?
রিয়াজ দুর্বলভাবে হাসল, বলল, কখনো কম্বল ধরে কোথাও উঠি নি।
নিশীতা চোখ বড় বড় করে বলল, মাঝে মাঝে কয়েক জায়গায় ফুটো করে দেওয়া যাক, তা হলে ফুটোয় হাত ঢুকিয়ে ধরতে পারবেন। আর একবার উপরে উঠতে পারলে আমিও আপনাকে টেনে তুলব।
তুমি?
হ্যাঁ আমাকে আপনি যত দুর্বল ভাবছেন, আমি তত দুর্বল নই!
শুনে খুশি হলাম– রিয়াজ দুর্বলভাবে হেসে বলল, আর আমাকে তুমি যত শক্তিশালী ভাবছ আমি তত শক্তিশালী নই!
সেটা দেখা যাবে। যখন প্রাণ বাঁচাতে হয় তখন নাকি শরীরে অসুরের শক্তি এসে যায়।
কম্বলের মাঝে কয়েকটা ফুটো করার জন্য কোথাও ধারালো কিছু পাওয়া গেল না। হাতে কম্বল পেঁচিয়ে আঘাত করে তখন জানালার কাচ ভেঙে সেখান থেকে একটা ধারালো কাচ বের করে আনা হল। সেটা দিয়ে খুঁচিয়ে কম্বলে কয়েকটা ফুটো করা হল। চাকুর মতো একটা কাচের টুকরোকে নিশীতা তার ব্যাগে রেখে দিল–ভবিষ্যতে কী প্রয়োজন হতে পারে কে জানে!
রিয়াজ ঘরের দেয়াল ধরে হাঁটু গেড়ে বসল। নিশীতা রিয়াজের ঘাড়ে উঠে দাঁড়াল। রিয়াজ তখন সাবধানে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। নিশীতা দেয়াল ধরে নিজের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে, রিয়াজ পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর নিশীতা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমার ওজন কি খুব বেশি?
রিয়াজ বলল, না বেশি নয়। তবে তোমাকে দেখতে যেরকম হালকাঁপাতলা দেখায় ঘাড়ের উপর দাঁড়ানোর পর সেরকম মনে হচ্ছে না।
রিয়াজ সামনে অগ্রসর হতে থাকে, নিশীতা সিলিং ধরে ভারসাম্য বজায় রেখে বলল, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যদি এই গাড়া থেকে বের হতে পারি তা হলে ডায়েটিং করে ওজন পাঁচ কেজি কমিয়ে ফেলব।
তার প্রয়োজন নেই নিশীতা। এখান থেকে যদি বের হতে পারি তা হলে তোমাকে ঘাড়ে নিয়ে আমাকে আর হাঁটাহাঁটি করতে হবে না।
তা ঠিক। নিশীতা সিলিংটা হাত দিয়ে উপরে ঠেলে আলাদা করে ভিতরে মাথা ঢুকিয়ে দেখল, এপসিলন ঠিকই বলেছে, একটা বড় ডাক্ট সিলিঙের উপর দিয়ে চলে গেছে। নিশীতা রিয়াজকে বলল, এখন আপনাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমি উপরে উঠছি।
গুডলাক নিশীতা।
সিলিঙে উঠতে যত কষ্ট হবে মনে হয়েছিল নিশীতা তার থেকে অনেক সহজে উঠে গেল। রিয়াজ নিচে থেকে তার পা ধরে উপরে ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করায় ব্যাপারটি বেশ সহজ হয়ে গেল। নিশীতা সিলিঙে লোহার বিমগুলোতে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, ভাগ্যিস আমি শাড়ি পরে আসি নি।
শাড়ি পরে এলে কী হত?
শাড়ি পরলে সিলিং বেয়ে ওঠা হয়তো এত সহজ হত না
কিন্তু মেয়েদের জন্য শাড়ি থেকে সুন্দর কোনো পোশাক নেই।
যদি কখনো এই গাড্ডা থেকে বের হতে পারি তা হলে আমি একদিন শাড়ি পরে আপনার সাথে দেখা করতে আসব। আপনার কাছে প্রমাণ করিয়ে যাব যে আমি শাড়িও পরতে পারি।
চমৎকার! রিয়াজ বলল, তখন আমার কি বিশেষ কিছু করতে হবে?
না। আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার কারণে আপনার জীবনে যেসব ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটতে শুরু করেছে সেদিন আপনার কাছ থেকে সে জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে পারি।
নিশীতা উপর থেকে কম্বলটা একটা লোহার বীমের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দিল। রিয়াজ কম্বলটা ধরে উপরে ওঠার চেষ্টা করতে করতে বলল, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা কি তুমি চাইবে না আমি চাইব? বিষফোড়া ফ্রেন্ড লিস্টার তো তোমার বন্ধু নয়–আমার বন্ধু।
নিশীতা নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে রিয়াজকে ধরে ফেলে উপরে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগল, দুজনে প্রায় জড়াজড়ি করে কোনোমতে ঊপরে এসে হাজির হল। নিশীতা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল, রিয়াজ একটু অবাক হয়ে বলল, কী হল? হাসছ কেন?
ফ্রেন্ড লিস্টার এখন আমাদের দেখলে খুব খুশি হত। ব্যাটা ধড়িবাজ কত কষ্ট করে কম্পিউটার দিয়ে আমাদের দুজনের ছবি তৈরি করেছে। এখন আমরা নিজেরাই একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে টানাটানি করছি! শুধু দরকার একজন ক্যামেরাম্যান?
রিয়াজ হাসিতে যোগ দিয়ে বলল, না নিশীতা। তুমি একটা ব্যাপার মিস করে গিয়েছ। সে কম্পিউটার দিয়ে ছবিতে যে জিনিসটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে সেটা হচ্ছে রোমান্স। আর একটু আগে তুমি যেভাবে আমার শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে তুলে এনেছ তার মাঝে আর যাই থাকুক, কোনো রোমান্স নেই!
বোঝা যাচ্ছে আপনি হিন্দি সিনেমা দেখেন না।
কেন?
দেখলে বুঝতেন রোমান্স আজকাল কত জায়গায় গিয়েছে। সেই আগের যুগের মিষ্টি গলায় গান গাওয়ার রোমান্স আর নেই। এখন খুন জখম মারপিট ছাড়া রোমান্স হয় না।
দুজনে মিলে প্লাইউডের সিলিং প্যানেলটা জায়গামতো বসিয়ে দিতেই ভিতরে অন্ধকার হয়ে এল। এখন এই ডাক্টের ভিতর দিয়ে গুঁড়ি মেরে তাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রথম নিশীতা এবং তার পিছু পিছু রিয়াজ এগিয়ে যেতে থাকে। সোজা বেশ খানিকদূর এগিয়ে গিয়ে নিশীতা একটা সিলিং প্যানেল তুলে ভিতরে উঁকি দিল। নিচে একটা বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল ঘিরে বেশ কয়েকজন আমেরিকান বসে আছে। টেবিলের উপর একটা বড় ম্যাপ, ম্যাপের উপরে নানা জায়গায় ছোট ছোট ফ্ল্যাগ লাগানো। সিলিং প্যানেলটা সাবধানে আগের জায়গায় বসিয়ে তারা গুঁড়ি মেরে নিঃশব্দে আরো সাবধানে এগিয়ে যেতে থাকে। খুব কাছেই কোনো একটা জায়গা থেকে একটা বড় ফ্যানের শব্দ আসছে–সম্ভবত এই বিল্ডিঙের কোনো একটি এক্সহস্ট ফ্যান। এর কাছাকাছি পৌঁছানোর সাথে সাথে টেলিফোনটি বেজে উঠল। নিশীতা টেলিফোনটি কানে ধরতেই এপসিলনের কথা শুনতে পেল, নিশীতা?
