বেশ! আজকে পরীক্ষা হয়ে যাবে। নামো।
তুমি?
আমি হলোগ্রাফিক ভিডিওটা চালিয়ে দিয়ে আসি।
জিগি ভেতরে গিয়ে কিছু যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করে কয়েকটা সুইচ টিপে দিতেই ঘরের ভেতরে একটা হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি ভেসে এল–সেখানে দেখা যাচ্ছে ভয়ংকর কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে জিগি দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরপর দরজার দিকে তাক করে গুলি করে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। জিগি নিজের হলোগ্রাফিক ছবিটার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে আমার কাছে ফিরে এসে বলল, নিরাপত্তার লোকজন যখন দেখবে আমাকে পাওয়া গেছে খানিকটা নিশ্চিন্ত হবে। এত সব অস্ত্র দেখে সহজে ঢুকবে না– ততক্ষণে আমরা হাওয়া হয়ে যাব।
ছোট খোপটার ভেতরে ঢুকে জিগি উপরের অংশটুকু ঢেকে দিল, এই দিক দিয়ে যে বের হয়ে এসেছি সেটা আর কেউ বুঝতে পারবে না।
জিগির পিছু পিছু আমি সরু একটা টানেলের মতো স্থায়গা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে থাকি। খানিক দূর যাওয়ার পর একটা বড় শ্যাফট পাওয়া গেল। নানা আকারের অসংখ্য তার বহু নিচে নেমে গেছে। জিগি মোটা একটা তার ধরে ঝুলে ঝুলে নিচে নামতে নামতে বলল, সাবধান ত্রাতুল। লাল রঙের তারগুলো ধরো না–ভেতরে ইনফ্রারেড আলো যাচ্ছে, কয়েক মেগাওয়াট–কোনোমতে ভেঙে গেলে মুহূর্তের মাঝে ভাজা কাবাব হয়ে যাবে।
আমি লাল রঙের তারগুলো স্পর্শ না করে সাবধানে কালো রঙের মোটা একটা তার ধরে ঝুলতে ঝুলতে নিচে নামতে শুরু করলাম–হাত ফসকে গেলে প্রায় দুই কিলোমিটার নিচে পড়ে থেঁতলে যাব– পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জানতেও পারবে না! মাথা থেকে জোর করে সেই চিন্তা দূর করে দিলাম–যা হয় হবে, কোনো কিছুতেই আর পায়রায়া করি না এই ধরনের একটা ভাব নিজের ভেতরে নিয়ে এসে সরসর করে একটা সরীসৃপের মতো জিগির সাথে সাথে নিচে নামতে থাকি। জিগির মুখে দুশ্চিন্তার কোনো চিহ্ন নেই, তাকে দেখে মনে হয় এই ধরনের কাজ সে আগে অনেকবার করেছে এবং এই মুহূর্তে সে ব্যাপারটা খানিকটা উপভোগ করতে শুরু করেছে।
শ্যাফটের নিচে পৌঁছে জিগি দরজার দিকে এগিয়ে গেল, পকেট থেকে একটা চাবি বের করে দরজার তালাটা খুলে প্রথমে এলার্ম সিস্টেমটা অচল করে দিল, তারপর দরজাটা একটু ফাঁক করে প্রথমে নিজের মাথাটা একটু বের করে বাইরে পুরোপুরি নিরাপদ নিশ্চিত হওয়ার পর সে সাবধানে বের হয়ে আমাকেও বেরিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। আমি বের হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আগেও এদিক দিয়ে বের হয়েছ!
অবিশ্যি। এসব ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যায় নাকি? শিখে রাখো আমার কাছ থেকে কোনো জায়গায় থাকতে চাইলে প্রথমেই পালিয়ে যাবার রাস্তাটি ঠিক করে রাখবে।
আমি কোনো কথা বললাম না। দুজনে রাস্তার পাশ দিয়ে সাবধানে হেঁটে যেতে থাকি। দ্বিতীয় এপার্টমেন্ট বিন্ডিংটার পাশে আসার পর হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম, কিছুক্ষণ টানা গুলির শব্দ হল এবং অনেক উপর থেকে কিছু আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হয়ে আসতে দেখা গেল। জিগি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে বলল, বেকুবগুলো আমার হলোগ্রাফিক মূর্তিটাকে গুলি করছে। হা–হা–হা–
আমি পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করে একটু শিউরে উঠি–এর মাঝে হাসার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাই না।
০৭. নিরানন্দ দালান
জিগিকে নিয়ে আমি আমার এপার্টমেন্টে যেতে চাইলাম কিন্তু সে রাজি হল না। যে জায়গা থেকে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে রাখা নেই সেখানে জিগি যায় না। বাধ্য হয়ে আমাকে তার সাথে নতুন এক জায়গায় যেতে হল। জায়গাটি বেআইনি–এখানে কখনো নিরাপত্তাকর্মীরা আসে না। সে কারণে পুরো এলাকাটির মাঝে এক ধরনের থমথমে নিরানন্দ ভাব, এখানকার মানুষজন বেপরোয়া এবং নিষ্ঠুর। বেশিরভাগই মাদকাসক্ত না হয়। ট্রান্সক্রেনিয়াল স্টিমুলেটর ব্যবহারকারী। আমরা আকাশের কাছাকাছি একটা ছোট ঘরে রাত কাটাবার আয়োজন করলাম। রাতের খাবার খেয়ে জিগি কোথায় কোথায় যেন যোগাযোগ করল, বিচিত্র রকমের মানুষেরা এসে তাকে কিছু যন্ত্রপাতিও দিয়ে গেল, সেগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে সে একটা নিউরাল কম্পিউটার দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে থাকে। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, তুমি নিউরাল কম্পিউটার তৈরি করছ?
জটিল একটা যন্ত্রের মাঝখানে আঙুল দিয়ে কিছু অবলাল রশ্মি আটকে দিয়ে বলল, হুম।
কিন্তু
কিন্তু কী?
এটা তো দেখছি ইন্টারফেস। মূল প্রসেসর আর মেমোরি কোথায়?
জিগি দাঁত বের করে হেসে আমার মাথায় আঙুল দিয়ে দুইবার টোকা দিল। আমি অবাক হয়ে বললাম, মস্তিষ্ক? মানুষের মস্তিষ্ক?
জিগি মাথা নাড়ল, বলল, নিখুঁতভাবে বলতে চাইলে বলা যেতে পারে তোমার মস্তিষ্ক! আমার বহুদিনের শখ ছিল একটা নিউরাল কম্পিউটারের, কিন্তু কে তার মস্তিষ্ক আমাকে ব্যবহার করতে দেবে? আর দিলেও আমি ইন্টারফেস করব কেমন করে? এখন একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম।
আমি আতঙ্কিত হয়ে জিগির দিকে তাকালাম, তুমি আমার মস্তিষ্ক ব্যবহার করবে?
তা না হলে কার? ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেস আমি কেমন করে পাব? অকাট্য যুক্তি কিন্তু শুনে আমি আতঙ্কে শিউরে উঠি। মাথা নেড়ে বললাম, না–না। মস্তিষ্ক নিয়ে কোনো ছেলেখেলা না।
জিগি মুখ শক্ত করে বলল, ছেলেখেলা? তোমার ধারণা আমি ছেলেখেলা করি?
