সত্যি কথা বলতে কী আমার তাই ধারণা। কিন্তু তাই বলে মনে করো না যে তোমার ওপরে আমার বিশ্বাস নেই।
জিগি টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, তা হলে?
তা হলে কী?
তা হলে তোমার মস্তিষ্ক আমাকে ব্যবহার করতে দিচ্ছ না কেন? আমি কি নিজের জন্যে চাইছি? তোমার জন্যেই চাইছি!
আমার জন্যে?
জিগি মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। তোমার জন্যে। তোমার অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্যে যদি নেটওয়ার্কে ঢুকতে হয় তা হলে একটা নিউরাল কম্পিউটার দরকার। তোমার সেই নেটওয়ার্কিং কেন্দ্রে কি আমাদের এমনিতে ঢুকতে দেবে? দেবে না–দরজার গোপন পাসওয়ার্ড বের করতে হবে। একটা ভালো নিউরাল কম্পিউটার ছাড়া কি গোপন পাসওয়ার্ড বের করতে পারব? পারব না।
আমি তবু অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। জিগি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, আমার ওপর বিশ্বাস রাখ লাতুল, আমি তোমার এক বিলিয়ন নিউরন শুধু ব্যবহার করব, একটা নিউরনেরও ক্ষতি করব না। এস–এই টেবিলটার ওপর শুয়ে পড়।
আমি খুব অনিচ্ছার সাথে টেবিলের ওপর শুয়ে পড়লাম। জিগি তার বিচিত্র জোড়াতালি দেওয়া যন্ত্রটি আমার মাথার কাছে নিয়ে এল। সেখান থেকে একটা মান্টিকোর কো–এক্সিয়াল তার বের হয়ে এসেছে, তার এক পাশে একটা বিদঘুঁটে সকেট। সকেটটি সে চাপ দিয়ে আমার মাথার পেছনে ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেসে লাগিয়ে দিল। সাথে সাথে আমার পুরো শরীরে আমি একটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করি। মাথার ভেতরে হঠাৎ করে প্রচণ্ড যন্ত্রণা করে ওঠে অনেকগুলো আলোর ঝলকানি, উচ্চ কম্পনের একটা শব্দ এবং ঝুঁজালো এক ধরনের গন্ধের সাথে সাথে মুখে তীব্র এক ধরনের বিস্বাদ অনুভব করতে লাগলাম। আমি ছটফট করে উঠলাম, জিগি শক্ত করে আমাকে টেবিলে চেপে ধরে বলল, নড়বে না, খবরদার নড়বে না। এক্ষুনি সব ঠিক হয়ে যাবে।
জিগির কথা সত্যি প্রমাণিত হল, সত্যি সত্যি কিছুক্ষণের মাঝে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল, শুধুমাত্র কোথায় যেন একটা ভোঁতা শব্দ শুনতে থাকলাম। জিগি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, চমৎকার! নিউরাল কম্পিউটারের সাথে আমার প্রথম সফল যোগাযোগ। এখন। তোমাকে দিয়ে আমি কিছু জটিল সমস্যার সমাধান করাব।
কী ধরনের সমস্যা?
বায়োমেটেরিয়ালে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশানে নন লিনিয়ার উপঘাত
আমি এসব কিছুই জানি না।
জিগি আনন্দে হা–হা করে হাসল, বলল, এটাই তো মজা, তুমি এর কিছুই জান না কিন্তু তুমি এর সমাধান বলে দেবে। আমি সমস্যাটি সমান্তরাল করে দেব–তোমার মস্তিষ্কে যখন সেটি যাবে তুমি সমাধান করতে পার সেভাবে
আমি বুঝতে পারছি না।
এক্ষুনি বুঝতে পারবে। হঠাৎ হঠাৎ করে তুমি এখন বিচিত্র জিনিস দেখবে, তোমার সেই বিচিত্র জিনিস থেকে কোনো কিছু করার ইচ্ছে করবে তুমি সেটা করবে এবং আমি আমার সমাধান পেয়ে যাব।
যদি কিছু না করি?
করবে। জিগি অর্থবহভাবে চোখ টিপে বলল, করবে নিশ্চয়ই করবে!
জিগির কথা শেষ হবার আগেই আমি চোখের সামনে দেখতে পেলাম ছোট ছোট
অনেকগুলো বৃত্তাকার বস্তু। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, তবুও সেগুলো দেখা যেতে লাগল। সেগুলো ক্রমাগত বড় হচ্ছে, বড় হতে হতে সেগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার নতুন করে কিছু বৃত্ত তৈরি হচ্ছে যেগুলো আকার পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। আমার মনে হতে থাকে এই বৃত্তগুলোর একটার সাথে আরেকটার সমন্বয় করতে হবে–না করা পর্যন্ত আমি বুঝি শান্তি পাব না। আমার বিচিত্র এক ধরনের কষ্ট হতে থাকে। শারীরিক কোনো কষ্ট নয়, অন্য কোনো এক ধরনের কষ্ট। আমি প্রাণপণে সেই বিচিত্র বৃত্তাকার বস্তুগুলোকে আমার মাথার ভেতরে সাজাতে থাকি, হঠাৎ হঠাৎ সেগুলো সাজানো হয়ে যায় এবং আমি তখন নিজের ভেতরে এক আশ্চর্য প্রশান্তি অনুভব করি কিন্তু সেটি মুহূর্তের জন্যে; আবার সেগুলো পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে যায় এবং আমি বিচিত্র এক ধরনের কষ্ট অনুভব করতে থাকি। আমি প্রাণপণে নিজের সেই কষ্ট কমানোর চেষ্টা করে ভাসমান প্রতিচ্ছবির সাথে যুদ্ধ করতে থাকলাম।
কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না হঠাৎ করে সবকিছু মিলিয়ে গেল এবং আমি তখন নিজের ভেতরে আশ্চর্য এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করতে থাকলাম। আমি জিগির গলা শুনতে পেলাম, চমৎকার ত্রাতুল! তোমার কাজ শেষ।
আমি ওঠার চেষ্টা করতেই জিগি টেবিলে চেপে ধরে রেখে বলল, এক সেকেন্ড দাঁড়াও, তোমার মাথা থেকে সকেটটা খুলে নিই।
আমি কিছু বলার আগেই সে হ্যাঁচকা টান দিয়ে মাথার পেছন থেকে সকেটটা খুলে নেয়, মুহূর্তের জন্যে আমার শরীর ভয়ংকর রকম অনিয়ন্ত্রিতভাবে খিচুনি দিয়ে ওঠে। আমার মনে হল কানের কাছে একটা ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটেছে, চোখের সামনে উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলো ঝলসে উঠল এবং মুখে তিক্ত এক ধরনের স্বাদ অনুভব করলাম। জিগি আমাকে টেনে। বসিয়ে দিয়ে আমার সামনে একটা মনিটর ধরে রাখল, বলল, এই দেখ।
আমি তখনো অল্পসল্প কাঁপছি, কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখব?
তোমার সমাধান এবং আসন সমাধান। হুবহু মিলে গেছে। জিগি আনন্দে হা–হা করে হেসে বলল, আমি এখন একটি ব্যক্তিগত নিউরাল কম্পিউটারের মালিক।
না। আমি মাথা নাড়লাম, তুমি এখনো নিজেকে মালিক বলে দাবি করো না। আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটা আনন্দের না–তোমার নিউরাল হিসেব করতে হলে আমার যদি এরকম কষ্ট হয় তা হলে আমি তোমাকে কখনো আমার মাথায় সকেট বসাতে দেব না।
