জিগি কাছাকাছি একটা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, ঠিক বলেছ! সেই বাসাটি নিশ্চিতভাবে নেটওয়ার্কের সাথে জুড়ে দেওয়া আছে।
কিন্তু সেখানে ঢুকব কেমন করে? কত রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা!
জিগি হাত নেড়ে উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, সেটা দেখা যাবে। চল যাই।
আমি বললাম, রাজকুমারী রিয়ার সাথে যোগাযোগ করলে কেমন হয়?
জিগি খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মাথা নেড়ে বলল, পাবে না।
কী পাব না?
রিয়াকে।
চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?
ঠিক আছে চেষ্টা কর।
আমি ভিডি মডিউলে চেষ্টা করতে থাকি। প্রথম দুবার যোগাযোগ করা গেল না– তৃতীয়বার আমাকে অবাক করে দিয়ে ভিডি স্ক্রিনে অপরূপ রূপসী একটি মেয়ের ছবি ভেসে উঠল, মেয়েটি কৌতূহলী চোখে বলল, কে? কে তুমি?
আমি থতমত খেয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, তুমি কি রাজকুমারী রিয়া?
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, কেউ যখন খুব গম্ভীর হয়ে আমাকে রাজকুমারী রিয়া বলে ডাকে তখন আমার খুব হাসি পায়।
আমি–আমি–আসলে বুঝতে পারছি না তোমাকে কী বলে ডাকব।
ছেড়ে দাও ওসব। বলো তুমি কে?
তুমি আমাকে চিনবে না। আমি একটা বিশেষ প্রয়োজনে তোমার সাথে কথা বলতে চাইছি!
রিয়া মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, প্রয়োজনটা সত্যি না হলে কিন্তু ভালো হবে না আগেই সাবধান করে রাখছি। প্রতিদিন কতশত মানুষ আমার সাথে যোগাযোগ করে তুমি জান?
আমি অনুমান করতে পারি। তুমি নিশ্চিত থাক। প্রয়োজনটা খুব জরুরি।
বলো।
তোমার মাথার পেছনে কি একটা ধাতব টিউব লাগানো?
রিয়া হতচকিত হয়ে বলল, কী বললে? কী বললে তুমি?
তোমার মাথায় কি গত এক-দুইদিনের মাঝে কোনো ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেস লাগানো হয়েছে?
রিয়া নিজের মাথার পেছনে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলল, হ্যাঁ। লাগিয়েছে। তুমি কেমন করে জান? এটি কারো জানার কথা না।
আমি একটা নিশ্বাস ফেলে বললাম, আমারও লাগিয়েছে। আমার মস্তিষ্ক ম্যাপিং করে আমার একটি অস্তিত্ব তৈরি করা হয়েছে। সেই অস্তিত্ব আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। করে বলেছে সে খুব কষ্টে আছে। তার সাথে কে আছে জান?
কে?
তুমি।
রিয়া এক ধরনের হতচকিত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, কিন্তু তারা যে বলল আমার অস্তিত্বটি সুপ্ত থাকবে, কখনো জাগাবে না–শুধু নিরাপত্তার জন্যে তৈরি করেছে।
মিথ্যা কথা বলেছে। আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ। তোমার ভেতরে সম্ভবত কোনো খারাপ প্রবৃত্তি নেই–তুমি মনে হয় খারাপ কিছু দেখতে শেখ নি। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি–পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে। তারা তোমার সাথে মিথ্যা কথা বলছে।
রিয়া অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল–তার মুখ দেখে মনে হল, সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, কেউ তার সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারে। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, কেন?
আমি জানি না। তু
মি তুমি তুমি কি নিশ্চিত?
হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত।
তুমি কে? তোমার পরিচয় তো আমি জানি না।
আমার নাম ব্রাতুল। আমার কোনো ট্রাকিওশান নেই তাই আমার আর কোনো পরিচয় নেই।
রিয়া আরো কী একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ করে জিগি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিডি মডিউলটি বন্ধ করে চিৎকার করে বলল, সাবধান ব্রতুল।
কী হয়েছে?
ধরতে আসছে।
ধরতে আসছে? কাকে?
তোমাকে আর আমাকে।
কে ধরতে আসছে?
জিগি শুষ্ক মুখে বলল, নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ স্কোয়াড। ঐ দেখ–
আমি ঘরের এক কোনায় স্ক্রিনে দেখতে পেলাম রাস্তার পাশে বড় বড় বাইভার্বাল থামছে আর সেখান থেকে পিলপিল করে কালো পোশাক পরা নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ স্কোয়াড নেমে আসছে। মানুষগুলোর পোশাক কালো, চোখে কালো চশমা এবং কোমরে বীভৎস স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ঝুলছে। যন্ত্রের মতো তারা সারিবদ্ধভাবে ছুটে আসছে। আমি জিগির দিকে তাকালাম, এরা কেন আসছে?
আমাদের ধরতে।
কেন?
একটু আগে নেটওয়ার্কে ঢোকার চেষ্টা করলাম মনে নেই?
কিন্তু তুমি বলেছিলে কেউ তোমাকে ধরতে পারবে না। তোমার ট্রাকিওশান তুমি পাল্টে ফেলেছ। তুমি
জিগি মুখ খিঁচিয়ে বলল, এখন থামো–আগে পালাই।
কেমন করে পালাবে? সব ঘেরাও করে ফেলেছে না?
আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম কয়েকটা কালো বাইভার্বাল এই দুই হাজার তলা বিল্ডিংটিকে ঘিরে উড়ছে। ভালো করে লক্ষ করলে ভেতরে বসে থাকা মানুষগুলোকেও দেখা যায়। জিগি আমার কথার উত্তর না দিয়ে ছোট একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে তার যন্ত্রপাতির মাঝে ছোটাছুটি করে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে বলল, চলো।
আমি দরজার দিকে এগুতেই জিগি ধমক দিয়ে বলল, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?
বাইরে যাবে না?
দরজা দিয়ে? তুমি কি ভেবেছ সিঁড়ি, লিফট আর বের হবার পোর্ট তোমার জন্যে রেডি করে রেখেছে? সব জায়গায় বিশেষ স্কোয়াড এখন কিলবিল করছে।
তা হলে?
এই যে, এদিক দিয়ে।
আমি জিগির পেছনে পেছনে গেলাম, তার বিছানাটা টেনে তুলতেই নিচে একটা ছোট চৌকোনা দরজা বের হল। সেটা খুলতেই একটা গোলাকার ডাক্ট দেখা গেল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এদিক দিয়ে?
হ্যাঁ। ডানদিকে দশ মিটার মতো গেলে মূল তথ্য সরবরাহের লাইনটা পাবে, ঝুলে নেমে যেতে হবে। তোমার উচ্চতাভীতি নেই তো?
আমি শুষ্ক গলায় বললাম, আছে কি না কখনো পরীক্ষা করে দেখি নি।
