রিয়া খিলখিল করে হেসে বলল, তুমি সেটা নিয়ে চিন্তা করো না। আমি হচ্ছি রাজকুমারী রিয়া–সারা পৃথিবীর মাঝে একমাত্র নিখুঁত মানুষ ইউনিটের অভাব বলে আমরা এক বেলা ভালো খাবার খেতে পারব না এটা তো হতে পারে না। তবে রিয়া একমুহূর্ত থেমে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমার চিন্তা এখন কোনো না অঘটন ঘটে যায়।
কেন? অঘটন কেন ঘটবে?
তাই তো ঘটছে। সারা জীবনে আমার যতগুলো অঘটন ঘটেছে গত দুই দিনে তার থেকে বেশি ঘটে গেছে।
আমি হেসে ব্যাপারটি উড়িয়ে দিলাম।
আমরা যখন খাবারের মাঝামাঝি পর্যায়ে আছি–একটি সুস্বাদু সত্যিকার তিতির পাখির মাংস সত্যিকারের জলপাই তেল এবং মশলায় হালকা করে রান্না করা হয়েছে, সেটি যবের রুটি দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছি ঠিক তখন রিয়ার কথা সত্যি প্রমাণিত হয়ে গেল। প্রথমে একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম, তারপর হঠাৎ করে ইতস্তত কিছু মানুষ ছোটাছুটি করতে লাগল। রাগী চেহারার একজন ভয়ংকর দর্শন একটা অস্ত্র নিয়ে একবার ছুটে গেল, কিছুক্ষণ পর আবার সে ফিরে এল এবং আমরা তখন নিরাপত্তাকর্মীদের দেখতে পেলাম। ভয়ংকর দর্শন অস্ত্র হাতে রাগী চেহারার মানুষটি হঠাৎ একটি বিচিত্র জিনিস করে বসল, ঝটকা মেরে রিয়াকে আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নেয় এবং তার মাথায় ভয়ংকর দর্শন অস্ত্রটি চেপে ধরে চিৎকার করে বলল, খবরদার। কাছে এলে এই মেয়ের মাথাটাকে উড়িয়ে দেব।
আমি দেখতে পেলাম নিরাপত্তাকর্মীরা যে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে গেছে। রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম, সেখানে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই–বরং মনে হল একটু কৌতুক ফুটে উঠেছে। আমি নিশ্চিত নই কিন্তু মনে হল সে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে একটু হাসারও চেষ্টা করল। হয়তো বলার চেষ্টা করল, বলেছিলাম না?
নিরাপত্তাকর্মীরা অস্ত্র উদ্যত করে রেখে বলল, তুমি কী চাও?
মানুষটি ধমক দিয়ে বলল, তুমি খুব ভালো করে জান আমি কী চাই। একটা চতুর্থ মাত্রার বাইভার্বাল নিয়ে এস এক্ষুনি।
কেন, বাইভার্বাল দিয়ে কী করবে?
আমি এই দ্বীপ থেকে পালাব। এখানে মানুষ থাকে? রিয়া হঠাৎ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মানুষটির ভয়ংকর দর্শন অস্ত্রটাকে প্রায় অবহেলায় সরিয়ে দিয়ে বলল, কী হয়েছে এই দ্বীপটায়?
বের হওয়া যায় না এটার শেষ নাই মানুষটার কথা শেষ হবার আগেই নিরাপত্তাকর্মীরা তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল– মানুষটি মরিয়া হয়ে গুলি করে বসল–আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম রিয়ার শরীরে গুলি লেগেছে, কিন্তু হুটোপুটি শেষ হবার পর দেখলাম রিয়া গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
রাগী চেহারার মানুষটি চিৎকার করতে লাগল এটা নরক, জাহান্নাম, এটা ভূতের বাড়ি–কবরখানা কিন্তু কেউ তার কথার বিশেষ গুরুত্ব দিল না, সম্ভবত ট্রান্সক্রেনিয়াল স্টিমুলেটর ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বারোটা বাজিয়ে রেখেছে। মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা সরিয়ে একটা কপোট্রনিক ইন্টারফেস বসিয়ে এখন তাকে একটা সাইবর্গ বানিয়ে ফেলতে হবে।
আমাদের খাবার পর্বটি সেখানেই শেষ করতে হল–দুজনের কারোরই আর সেখানে থাকার ইচ্ছে করল না। বের হয়ে আমি রিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, এত বড় একটা ব্যাপার তুমি একটুও ঘাবড়ে যাও নি।
বড় ব্যাপার কে বলেছে? পুরোটা সাজানো নাটক।
সাজানো নাটক?
হ্যাঁ, তোমাকে বলেছিলাম না। আমি যেখানেই যাই সেখানেই অঘটন। রিয়া হাসার চেষ্টা করে বলল, এটাও তাই।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, না–এটা তাই না। লোকটার হাতের অস্ত্রটি সত্যি। গুলিতে কতটুকু জায়গা ধসে গিয়েছিল দেখেছ? আমি ভেবেছিলাম তোমার গায়ে গুলি লেগেছে।
কিন্তু কখনো লাগে না। আমি তাই দেখছি–শেষ মুহূর্তে আমি রক্ষা পেয়ে যাই। যেন একটা নাটক হচ্ছে। আমি তার নায়িকা। শেষ দৃশ্য পর্যন্ত বাচিয়ে রাখতে হবে।
আমি কোনো কথা না বলে রিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। রাত সেরকম গম্ভীর হয় নি কিন্তু এর মাঝে চারপাশে নির্জনতা নেমে এসেছে। ঠিক কী কারণ জানি না, আমি হঠাৎ এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। অস্বস্তির কারণটুকু বুঝতে পারছি না বলে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করতে থাকি। কথা না বলে দুজনে অনেকটুকু হেঁটে গেলাম। একসময় রিয়া মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, কী হল, কথা বলছ না কেন?
ভাবছি?
কী ভাবছ?
মানুষটা কী বলছিল মনে আছে? এই জায়গাটা নরক, এটা ভৌতিক দ্বীপ–সেটা?
হ্যাঁ! আমি মাথা নাড়লাম, মানুষটা বলছিল এখান থেকে বের হওয়া যায় না। মনে আছে?
হ্যাঁ।
কেন বলছিল? আমাদের কি এখানে আটকে রাখা হয়েছে? এটা কি বিশেষ একটা এলাকা? কেন এখান থেকে বের হওয়া যায় না?
রিয়া ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী বলছ তুমি?
আমি কিছুই বলছি না, কিন্তু মানুষটার কথা আমাকে খুব ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।
চলো তা হলে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।
না, ওখানে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, ওরা বলবে না।
তা হলে?
আমাদের নিজেদের বের করতে হবে।
রিয়া আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী বের করতে হবে?
আসলেই কি আমাদের আটকে রেখেছে নাকি।
কীভাবে বের করবে?
সোজা। একটা বাইভার্বাল নেব সাইবর্গটাকে অচল করে সোজা এখান থেকে বের হয়ে যাব–দেখি কেউ আটকায় নাকি।
