রিয়া মেয়েটি নিশ্চয়ই বুদ্ধিমতী, পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মানুষের তো বুদ্ধিমত্তা থাকারই কথা–তার কথায় একটি যুক্তিও আছে। আমি নিশ্বাস ফেলে বললাম, তুমি ঠিকই বলেছ। মনে হয় তোমাকে একটা পরীক্ষা করছে। তোমার ট্রাকিওশান নিশ্চয়ই সব তথ্য কোনো একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে পাঠিয়ে যাচ্ছে
রিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু ত্রাতুল তুমি জান একটা জিনিস?
কী?
আমার কখনো যেটা হয় নি সেটা হচ্ছে।
কী হচ্ছে?
আমার কেন জানি ভয় করছে।
ভয়?
হ্যাঁ, রিয়ার বড় বড় কালো দুটি চোখে ভয়ের একটি আশ্চর্য ছায়া পড়ল। মেয়েটি পৃথিবীর নিখুঁত মানুষ, তার চেহারায় মানুষের অনুভূতির কী চমৎকার একটি প্রতিফলন হয়– আমি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। আমি একটা নিশ্বাস নিয়ে বললাম, কী নিয়ে ভয় রিয়া?
আমি সেটা জানি না। সেজন্যেই ভয়।
আমার হঠাৎ খুব ইচ্ছে করল এই কোমল চেহারার মেয়েটিকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে বলি, তোমার কোনো ভয় নেই রিয়া–আমি তোমার পাশে আছি। কিন্তু আমি সেটা মুখ ফুটে বলতে পারলাম না।
বালিয়াড়ির নিচে খচমচ করে এক ধরনের শব্দ হল–আমি তাকিয়ে দেখলাম সাইবর্গ দুটো ওঠার চেষ্টা করছে। রিয়া আমার কাছে এসে হাত ধরে বলল, ঐ যে ওগুলো উঠে দাঁড়াচ্ছে।
পারবে না। আমি বললাম, আমার হিসেবে এখনো পনের মিনিট কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তা ছাড়া ওপর থেকে গড়িয়ে এসেছে, আমি নিশ্চিত কপোট্রনের কিছু যোগাযোগ নষ্ট হয়েছে। ভেতরে কিছু ভেঙেচুরে গেছে।
নষ্ট হয়ে তো ক্ষতিও হতে পারে, হয়তো আমাদের আক্রমণ করে বসল।
তার আশঙ্কা নেই কিন্তু খামকা ঝুঁকি নেব না। চলো, আমরা যাই।
রিয়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমার সাথে কিছুক্ষণ থাকবে?
অবশ্যই থাকব। আমি নরম গলায় বললাম, তুমি হচ্ছ পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ—-তোমার সাথে কিছুক্ষণ থাকা তো আমার জন্যে অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। রিয়া কিছু না বলে বালিয়াড়ি ভেঙে হাঁটতে শুরু করল–আমি হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রিয়ার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম।
০৪. শূন্য দিয়ে ঘেরা
আমরা একটা প্রাচীন বাইভার্বালে করে শহরের মাঝামাঝি ফিরে এলাম। রিয়া যে গেস্ট হাউজে আছে সেটি ভারি সুন্দর, হ্রদের তীরে ছোট একটা কুটিরের মতো, চারপাশে গাছ দিয়ে ঘেরা। সামনে চমৎকার একটি ফুলের বাগান, বখানে নানা রঙের ফুল। আমাদের রেটিনা যদি পতঙ্গের চোখের মতো আরো স্বল্প তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে সংবেদনশীল হত তা হলে না জানি কী বিচিত্র রঙ দেখতে পেতাম।
রিয়া তার ঘরে গিয়ে যোগাযোগ মডিউলে তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করল। খানিকক্ষণ কথা বলে আমার কাছে ফিরে এসে বলল, কিছু একটা গোলমাল আছে।
গোলমাল?
হ্যাঁ।
কী গোলমাল?
জানি না।
আমি রিয়ার দিকে তাকালাম, কিন্তু রিয়ার চোখে–মুখে কৌতুকের কোনো চিহ্ন নেই। সে বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কখনো এরকম হয় নি, যে তুমি জান কোথাও কিছু একটা সমস্যা আছে কিন্তু সমস্যাটি কী ঠিক ধরতে পারছ না?
হয়। অবিশ্যি হয়।
এখানেও সেই একই ব্যাপার। যেমন মনে কর মায়ের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারটা, আমি ইচ্ছেমতো করতে পারি না। এখানে এসে কথা বলতে হয়। যখন মায়ের সাথে কথা বলি তখন–
তখন কী?
না, কিছু না।
বলো কী বলতে চাইছ।
মনে হচ্ছে মা কিছু একটা গোপন করতে চাইছে, বলতে চাইছে না।
তোমার মা তোমার কাছে কিছু একটা গোপন করছেন?
রিয়া দুর্বলতাবে হাসার চেষ্টা করে বলল, আমি ঠিক তা বলি নি। বলেছি যে মনে হচ্ছে কিছু একটা গোপন করার চেষ্টা করছেন।
সেটাই তোমার মনে হবে কেন?
যাই হোক–ছেড়ে দাও। আমাকে এখানে এক সপ্তাহ থাকতে হবে, দুদিন এর মাঝে পার হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে আর পাঁচদিন কাটিয়ে দেব। তোমার সাথে পরিচয় হয়েছে, এখন এত কষ্ট হবে না। তুমি মানুষটা চমৎকার।
আমি রিয়ার দিকে তাকালাম–মেয়েটি খুব সরাসরি স্পষ্ট কথা বলে–ভদ্রতার নামে নিজেকে আড়াল করে রাখার যে পদ্ধতি আছে সেটি সে জানে না। আমি হেসে বললাম, তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জান না। আমাকে দেখেছ বড়জোর দুই ঘণ্টা, আর বলে ফেললে আমি মানুষটা চমৎকার?
তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ। আমি মানুষকে খুব ভালো বুঝতে পারি।
আমি একেবারেই পারি না। আমার ধারণা ছিল আমি মানুষটা অলস, অকর্মণ্য, কঁকিবাজ, বোকা–এক কথায় একেবারে ফালতু।।
রিয়া খিলখিল করে হেসে বলল, অলস, অকর্মণ্য, ফাঁকিবাজ, বোকা আর ফালতু মানুষেরা চমৎকার হতে পারে না তোমাকে কে বলেছে?
আমিও হেসে ফেললাম, বললাম, তা ঠিক।
চলো কোথাও থেকে খেয়ে আসি। খোজাখুঁজি করলে নিশ্চয়ই ভালো একটা খাওয়ার জায়গা পাওয়া যাবে। রিয়া চোখ নাচিয়ে বলল, আমার কাছে অনেকগুলো ইউনিট, খরচ করতে হবে না?
রিয়া খাবার জন্যে যে জায়গাটি খুঁজে বের করল আমি একা হলে কখনোই সেরকম জায়গায় যেতে সাহস পেতাম না। জায়গাটি হ্রদের উপরে ভাসছে, বিশেষ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো ব্যবহার করে এক ধরনের আলো-আঁধারি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। টেবিলের উপর খাবারের তালিকা দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম আমরা সচরাচর যেসব কৃত্রিম খাবার খাই এখানে তার কিছু নেই, সব খাবার প্রাকৃতিক! আমি ভয়ে ভয়ে রিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, এরকম খাবার খাওয়ার মতো ইউনিট আছে তো?
