আমি ভেবেছিলাম রিয়া এরকম একটা ব্যাপারে রাজি হবে না–কিন্তু দেখলাম সে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। আমরা তখন রাস্তার মোড়ে একটা বাইভার্বালের জন্যে পঁড়িয়ে রইলাম।
প্রথম দুটি বাইভার্বালকে ছেড়ে দিতে হল–তার চালক একেবারে নতুন মডেলের সাইবর্গ, তাদের মেটাকোড এখনো আমার জানা নেই, এটাকে আমি অচল করতে পারব না। তৃতীয়টি পুরোনো বাইভার্বাল, চালকটিও তৃতীয় প্রজন্মের। আজ সকালেই এদের দুটিকে বালুবেলায় অচল করে এসেছি।
বাইভার্বালটি উপরে ওঠার তিরিশ সেকেন্ডের ভেতরে আমি সাইবর্গটি অচল করে দিয়ে তার নিয়ন্ত্রণটি হাতে নিয়ে নিলাম। শহরের উপরে একবার পাক খেয়ে আমি সেটিকে উড়িয়ে নিতে থাকি। রিয়া আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি বাইভার্বাল চালাতে পার?
না।
তা হলে কেমন করে চালাচ্ছ?
নিজেই চলছে–আমি শুধু বলছি কোন দিকে চলতে হবে!
আমি রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, যে জিনিস সাইবর্গ চালাতে পারে সেটা যে কোন মানুষ চালাতে পারে। তুমি নিশ্চয়ই জান সাইবর্গের বুদ্ধিমত্তা একটা শিশুর সমান।
আমি নিশ্চিত এরকম একটা পরিবেশে অন্য যে কেউ হলে ঘাবড়ে যেত কিন্তু রিয়ার ভয়ভীতি কম–কে জানে একজন নিখুঁত মানুষ, সম্ভবত সাহসী মানুষ।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক উড়িয়ে নেবার পর আমরা এই শহরটির শেষ মাথায় এসে উপস্থিত হলাম। নিচে রাস্তার আলো কমে এসেছে। আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে নেবার পর হঠাৎ করে অন্ধকার কেটে এক ধরনের আলো ফুটে উঠল। আমরা সোজাসুজি এগিয়ে যেতে থাকি এবং হঠাৎ করে এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করতে থাকি। যে জিনিসটিকে আমরা আলো হিসেবে ভাবছি সেটি সত্যিকার অর্থে আলো নয়–সেটি হচ্ছে অন্ধকারের অনুপস্থিতি। আমরা ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেলাম শহরটি হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে এবং তাকে ঘিরে এক ধরনের শূন্যতা। কোথাও কিছু নেই–ব্যাপারটি এত অস্বাভাবিক যে তাকে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এটি কুয়াশার মতো নয় যে সবকিছু ঢাকা পড়ে আছে। এটি স্পষ্ট এবং এর মাঝে কোনো বিভ্রান্তি নেই। মনে হচ্ছে হঠাৎ করে সমস্ত সৃষ্টি জগৎ শেষ হয়ে গেছে। সেই ভয়ংকর শূন্যতা দেখে আমার সমস্ত চেতনা হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল, আমি চিৎকার করে বললাম, রিয়া–চোখ বন্ধ কর।
কেন?
এটা দেখলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।
রিয়া দুই হাতে আমাকে শক্ত করে ধরে বলল, এটা কী?
এটা হচ্ছে শূন্যতা। এটা হচ্ছে সত্যিকারের শুন্যতা।
এখানে কেন?
আমার একটা জিনিস মনে হচ্ছে, কিন্তু কিন্তু
কিন্তু কী? রিয়া ভয় পাওয়া গলায় বলল, বলো এটি এখানে কেন?
আমি বাইভার্বালটিকে ঘুরিয়ে শহরের ভেতরে নিয়ে এলাম–কিছুক্ষণের মাঝে অন্ধকার নেমে এল, নিচে রাস্তাঘাট, আলো, জনবসতি দেখা যেতে লাগল। রিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, রেস্টুরেন্টে যে মানুষটি আমাকে ধরেছিল সে নিশ্চয়ই এই শূন্যতা দেখে এসেছে।
হ্যাঁ, দেখে পাগল হয়ে গেছে।
আমরা কি পাগল হয়ে গেছি?
আমি একটি নিশ্বাস ফেলে বললাম, হয়ে গেলে মনে হয় ভালো হত।
কেন? রিয়া ভয় পেয়ে বলল, কেন তুমি এ কথা বলছ?
আমি সাবধানে বাইভার্বালটিকে হ্রদের তীরে বালুবেলায় নামিয়ে এনে তার ইঞ্জিন বন্ধ করে দরজা খুলে দিলাম। প্রথমে রিয়া এবং তার পিছু পিছু আমি নেমে এলাম। আকাশে বড় একটা চাঁদ উঠেছে, হ্রদের পানিতে সেই বড় চাঁদের প্রতিফলন ঘটে পানি চিকচিক করছে। বিশাল বালুবেলা ধূসর একটি সুবিস্তৃত প্রান্তরের মতো–পুরো দৃশ্যটিকে খানিকটা অতিপ্রাকৃতিক বলে মনে হতে থাকে।
রিয়া আমার পাশে প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, কী হয়েছে ত্রাতুল, তুমি কেন বলছ আমাদের পাগল হয়ে যাওয়া উচিত ছিল?
তুমি বুঝতে পারছ না? কথা বলতে গিয়ে আমার গলা কেঁপে গেল, তুমি এখনো বুঝতে পার নি?
না।
তোমার মনে আছে আমার এবং তোমার মাথায় ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেস লাগানো আছে?
হ্যাঁ।
ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেস লাগিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের ম্যাপিং করা হয়েছে?
রিয়া মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ, আমি জানি।
যার অর্থ আমাদের একটা অস্তিত্ব তৈরি করে একটা তথ্যকেন্দ্রে জমা করে রেখেছে।
হ্যাঁ। তাতে কী হয়েছে?
আমরা সেই অস্তিত্ব। আমরা সত্যিকারের ত্রাতুল নই, সত্যিকারের রিয়া নই।
রিয়া একটা আর্তচিৎকার করে আমাকে ধরে ফেলল, তারপর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। আমি গভীর মমতায় তাকে ধরে রেখে খুব সাবধানে বালুবেলায় বসিয়ে দিলাম। সে অপ্রকৃতিস্থের মতো আমার কাঁধে মাথা রেখে আকুল হয়ে কেঁদে উঠল। আমি রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, আমি খুব দুঃখিত রিয়া। আমি খুব দুঃখিত।
আমি আকাশে পূর্ণ একটি চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই চাঁদ, চাঁদের আলো, হ্রদ, হ্রদের পানি, বালুবেলা সব কৃত্রিম, সব একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডারের তথ্য। আমি এবং রিয়াও কৃত্রিম—আমাদের ভাবনা–চিন্তা, দুঃখ–কষ্ট আসলে বিশাল কোনো এক যন্ত্রের ভেতরের হিসাব, আলো এবং ইলেকট্রনের বিচ্ছুরণ, কিছু যান্ত্রিক পদ্ধতি।
গম্ভীর হতাশায় আমার বুকের ভেতরে কিছু একটা গুঁড়িয়ে যেতে থাকে। আমি আমার হাতের দিকে তাকালাম, কী আশ্চর্য–আমি আসলে সত্যিকারের আমি নই? কৃত্রিম একটা ছোট শহরের জগতে আটকে পড়ে থাকা কিছু তথ্য? ভ্রাতুল এখন কোথায় আছে? সত্যিকারের ত্রাতুল?
০৫. সত্যিকারের ত্রাতুল
আমি চোখ খুলে তাকালাম, দেখতে পেলাম আমাকে ঘিরে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, নিরানন্দ চেহারার সরীসৃপের মতো মানুষ, লালচে চুলের বিরক্ত চেহারার মানুষ এবং পুরুষ না নারী বোঝার উপায় নেই সেই মহিলা। চিকিৎসক রোবটটিকে দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু আমার মাথার পেছনে খুটখাট শব্দ শুনে বুঝতে পারছি সে কাছেই আছে।
