মেয়েটি এবার মনে হল প্রথমবার সত্যিকার কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে তাকাল, তার মুখে এক ধরনের হাসি ফুটে উঠল এবং শুধুমাত্র এই হাসিটির কারণে আমার হঠাৎ করে মনে হল মেয়েটি অপূর্ব সুন্দরী। আমি বললাম, কী হল? তুমি হাসছ কেন?
আমি শুধু নেটওয়ার্কে শুনেছি কোনো কোনো মানুষ নাকি শরীর থেকে ট্রাকিওশান সরিয়ে ফেলে। কখনো কাউকে দেখি নি।
জেলখানায় গেলেই দেখবে। বড় বড় অপরাধীরা শরীরে ট্রাকিওশান রাখে না। রাখলেও ভুল ট্রাকিওশান রাখে।
কিন্তু সেটা তো অন্য ব্যাপার। অপরাধ করার জন্যে ট্রাকিওশান সরানো–।
আমি হেসে বললাম, তুমি কেন ধরে দিলে আমি একজন অপরাধী না। আমি তো অপরাধী হতেও পারি।
মেয়েটি একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, বলল, আমার একবারও মনে হয় নি যে তুমি অপরাধী হতে পার। তাকে কেমন যেন বিভ্রান্ত দেখাল, ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি অপরাধী?
আমি হেসে ফেললাম, প্রথমবার বুঝতে পারলাম মেয়েটির মাঝে এক ধরনের সারল্য রয়েছে যেটি আমি বহুদিন কারো মাঝে দেখি নি। বললাম, তুমি কি মনে কর আমি অপরাধী হলে সেটি তোমার কাছে স্বীকার করব?
করবে না, তাই না?
না। অপরাধী হওয়ার পর প্রথম কাজই হচ্ছে মিথ্যা কথা বলা।
মেয়েটি খুব একটি নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছে সেরকম ভঙ্গি করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই আমি অপরাধী না। ঠিক করে বলতে হলে বলতে হয় যে বড় ধরনের অপরাধী না।
তার মানে ছোট ছোট অপরাধ করেছ?
হ্যাঁ, এই যে দুটি সাইবর্গকে অচল করেছি সেটাও ছোট একটা অপরাধ।
কিন্তু সেটা তো করেছ আমাকে বাঁচানোর জন্যে।
তবুও। আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, কিন্তু তোমাকে সাহায্য করার জন্যে কেউ এল না কেন?
আমি বুঝতে পারছি না। গত কয়েকদিন থেকে আমার শুধু অঘটন ঘটছে। নিউরাল কানেকশান ম্যাপ করার পর থেকে
আমি চমকে উঠে বললাম, তোমার নিউরাল কানেকশান ম্যাপ করা হয়েছে?
হ্যাঁ।
তার মানে তোমার মাথাতেও ট্রাইকিনিওয়াল বসানো হয়েছে?
হ্যাঁ, এই দেখ। মেয়েটি আমার সামনে তার মাথাটি এগিয়ে নিয়ে আসে, আমি তার ঘন কালো রেশমের মতো চুল সরিয়ে দেখতে পেলাম মাথার পেছনে ছোট একটা ধাতব সকেট লাগানো–এটা নিশ্চয়ই ট্রাইকিনিওয়াল ইন্টারফেস আমার মাথাতেও আছে।
আমি একটু অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার দৃষ্টিতে নিশ্চয়ই কিছু একটা ছিল, মেয়েটা কেমন যেন ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? তুমি এরকমভাবে তাকিয়ে আছ কেন?
না, আমি একটু বোঝার চেষ্টা করছি। আমার নিউরাল কানেকশান ম্যাপ করেছে কারণ আমার মানুষ হিসেবে কোনো অধিকার নেই। কিন্তু তোমাকে কেন করল?
ও! মেয়েটার মুখে নির্দোষ সারল্যের একটা হাসি ফুটে উঠল, বলল, তার কারণ আমি হচ্ছি রাজকুমারী রিয়া!
রাজকুমারী রিয়া?
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, সত্যিকারের রাজকুমারী নই–কিন্তু তবু নাকি আমি রাজকুমারী।
কেমন করে শুনি?
জিনেটিক কোডিং করে একেবারে নিখুঁত একজন মানুষ তৈরি করা হয়েছে তুমি জান?
হ্যাঁ, জানি। একটি মেয়েকে তৈরি করা হয়েছে। সেটা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে, নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে–
আমি সেই মেয়ে।
আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম–খানিকক্ষণ আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। মেয়েটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, আমি নেটওয়ার্কে এই মেয়েটির ছবি দেখেছি, কালো চুল, কালো গভীর চোখ, মসৃণ ত্বক। ছবিতে শুধুমাত্র চেহারার সৌন্দর্যটুকু ধরা পড়ে–ভেতরের সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। সামনাসামনি কথা বলে বোঝা যায়। এই মেয়েটির ভেতরে একটি আশ্চর্য সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। আমি খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বললাম, তুমি সেই রিয়া?
হ্যাঁ।
তুমি এখানে কেন?
আমি জানি না। আমার নিউরাল ম্যাপিং করে এখানে নিয়ে এসেছে। বলেছে এখানে এক সপ্তাহ থাকতে হবে। আমি কাউকে চিনি না, জানি না, যেখানেই যাই সেখানেই একটা অঘটন ঘটে।
অঘটন?
হ্যাঁ। আমি একটা ছোট গেষ্ট হাউজে আছি সেখানে দুই দল মারামারি করল একটা বিস্ফোরক আমার এই কনুই ঘেঁষে গিয়েছে, পেছনে একটা দেওয়াল ধসে গিয়েছে। গত রাতে গেস্ট হাউজের একটা বিম খুলে পড়েছে–একটুর জন্যে বেঁচে গেছি। দুপুরে খাবার গলায় আটকে গেল–নিশ্বাস বন্ধ করে মারাই গিয়েছিলাম, একজন এসে হেইমলিক। ম্যানুভার১৬ করে আমাকে বাচাঁলো। এখানে কী হয়েছে তা দেখতেই পেলে!
আমি ভুরু কুঁচকে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। রিয়া একটু হেসে বলল, আমার কী মনে হচ্ছে জান?
কী?
আমাকে এরা তৈরি করেছে একেবারে নিখুঁত মানুষ হিসেবে।
হ্যাঁ।
মানুষের যেসব গুণ থাকার কথা সব নাকি আমার মাঝে দিয়েছে আমার কিন্তু বিশ্বাস হয় না!
কেন?
মাঝে মাঝে এমন সব চিন্তা আমার মাথার মাঝে আসে যেগুলো নিখুঁত ভালোমানুষের মাঝে আসার কথা নয়। যাই হোক–যা বলছিলাম, আমার কী মনে হয় জান?
কী?
এরা আমাকে পরীক্ষা করছে। এতদিন আমাকে আর আমার মাকে খুব ভালো করে রেখেছে, যত্ন করে রেখেছে। ভালো স্কুলে গিয়েছি ভালো মানুষের সাথে মিশেছি সব সময় আমাকে চোখে চোখে রেখেছে। এখন আমার ওপর একটা পরীক্ষা করছে। বিপদ–আপদ অঘটন হলে আমি কী রকমভাবে ব্যবহার করি সেটা দেখতে চাইছে।
