কিকিরা আর-কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, শুধু তারাপদকে বললেন, “এদিকে সাপের উৎপাত বেশ, বুঝলে তারাপদ। মাঝে-মাঝেই সাপের কামড়ে লোক মারা যায়।”
তারাপদ প্রথমটা ধরতে পারেনি, পরে কিকিরার চোখের দিকে তাকিয়ে ধরতে পারল। কিকিরা বোধ হয় ফকিরের ছোটকাকার ব্যাপারটা ইঙ্গিত করলেন। অবশ্য, এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক তারাপদ খুঁজে পেল না। ফকিরের ছোটকাকা সাপের কামড়ে মারা গিয়েছেন, আর শশিপদ সাপের ওঝা। এই দুয়ের সম্পর্ক কী?
তারাপদ কিছু জিজ্ঞেসও করল না।
ঘোড়া-সাহেবের কুঠির পেছন দিকে একটা গাছতলায় জিপ রেখে চারজন কুঠির ভাঙা পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকল।
তারাপদ চারদিকে তাকিয়ে দেখল একবার। মাথার ওপর সূর্য দেখা যাচ্ছে না, গাছে আড়াল পড়েছে, রোদও তেমন গায়ে লাগে না বড় বড় গাছপালার জন্যে। পাখির ডাক ছাড়াও কোথাও কোনো শব্দ নেই। নির্জন, নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে কুঠিটা। আলোয় স্পষ্ট।
আগের বার বিকেলের দিকে এসেছিল বলে, কিংবা প্রথম এসেছিল বলেই তারাপদর ভয়-ভয় লেগেছিল। আজ আর লাগছে না। তা ছাড়া তারা চারজন রয়েছে। নকুল আর লোচন কি কিছু কম!
বাইরে ঘোরাঘুরি না করে কিকিরা প্রথমেই বললেন, “লোচন, সোজা ভেতরে ঢুকব। নকুল, তুমি সবার পেছনে থাকবে। তোমার হাতের ওই লোহার রড়ে শব্দ করো না।”
নকুল গাড়িতে একটা হাত তিনেক লম্বা লোহার রড় সব-সময় রেখে দেয়। সেটা হাতে নিয়ে এসেছে। লোচনের হাতে কিছু নেই। তারাপদরও খালি হাত। কিকিরার হাতে সেই সরু ছড়ি। আলখাল্লা ধরনের ঢিলেঢালা জামার পকেটে কী আছে কে জানে।
কুঠিবাড়ির সামনের দিকে ঢাকা বারান্দা। বারান্দাটা চাঁদের কলার মতন বাঁকানো। বিশাল বারান্দা চওড়াও কম নয়। সাত-আট ধাপ সিঁড়ি উঠে বারান্দা। মাঝের দরজাটা যেন পাহাড়। খোলার উপায় নেই। পাশাপাশি ঘর অনেক। দরজাও রয়েছে পর-পর। একটা দরজার জানলা ভাঙা। লোচন কিকিরাকে ডাকল।
সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল চারজনেই।
ভেতরে পা দিতেই তারাপদ বিশ্রী গন্ধ পেল। কতকালের ধুলোবালি, আবর্জনা জমে-জমে গন্ধ হয়েছে। বদ্ধ বাতাস। দরজার পাল্লা ভাঙা থাকার দরুন আলো আসছিল মোটামুটি। উলটো মুখের জানলাও আধ-খোলা। তারাপদ পকেট থেকে রুমাল বার করে নাক চাপা দিল।
কিকিরা ঘরটা একবার দেখলেন। একেবারে ফাঁকা ঘর ভেতরের পলেস্তরা ভেঙে পড়েছে, একদিকে কিছু কাঠকুটো জড়ো করা, সাপের খোলস, মরা টিকটিকি, ঝুলে আর মাকড়শার জালের কোনো অভাব নেই। সাপ, ছুঁচো সবই থাকা সম্ভব এই ঘরে।
কিকিরা বললেন, “লোচন, প্রথমে নিচের ঘরগুলো দেখে নিই, পরে দোতলায় উঠব।”
বাড়িটার সুবিধে এই, পাশাপাশি ঘরের মধ্যে আসা-যাওয়া করার জন্যে দরজা রয়েছে, দরজার পাল্লাগুলো ভাঙাচোরা, একটা হয়ত আছে, অন্যটা নেই; কোথাও কোথাও একেবারেই নেই। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে অসুবিধে হয় না। ঘরগুলো বড়বড়, বেশ বড়, মাথার ছাদ ধরতে হলে লম্বা সিঁড়ি চাই, লোহার কড়ি বরগা, জানলাগুলো বেশির ভাগই বন্ধ, রোদে-জলে কাঠের এমন অবস্থা হয়েছে যে, সেই বন্ধ জানলা আর খোলার উপায় নেই। সমস্ত ঘরেই দুর্গন্ধ। আসবাবপত্রের মধ্যে কদাচিৎ কোনো ভাঙাচোরা চেয়ার কিংবা টেবিল চোখে পড়ে।
কিকিরা তারাপদকে বললেন, “নিচের তলাটা ছিল ঘোড়া-সাহেবের অফিসঘর। এজেন্টেস অফিস।“
তারাপদর মনে হল, অফিসঘর বলেই হয়ত পাশাপাশি ঘরে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা। অফিসের অংশটা মোটামুটি দেখে নিয়ে কিকিরা ভেতর-দরজা দিয়ে সরু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। এটা ভেতর দিকের বারান্দা। প্যাসেজ বলা যায়। প্যসেজের ওদিকে আরও কতকগুলো ঘর। প্যাসেজের গা দিয়ে চওড়া সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলায়। কাঠের সিঁড়ি।
তারাপদ বুঝতে পারল, নিচের তলায় দুটো অংশ। সামনের দিকে অফিস ছিল। পেছনের দিকে কী ছিল? কিকিরা বললেন, “চাপরাশি, পিয়ন, বয়বাবুর্চিরা থাকত।”
প্যাসেজে দাঁড়িয়ে কিকিরা বললেন, “লোচন, ও-পাশে বারান্দায় গিয়ে একবার দেখো তো কোনো দরজা খোলা পাও কি না?”
লোচন বারান্দার দিকে চলে গেল।
তারাপদ বলল, “কিকিস্যার, এটা দেখছি একেবারে ভুতের বাড়ি হয়ে গিয়েছে। এখানে ঢুকলে মানুষ এমনিতেই মরে যাবে।” বলতে বলতে তারাপদ হাঁচল। বদ্ধঘর, ধুলো ময়লা আর দুর্গন্ধে তার মাথা ধরে উঠছিল।
কিকিরা বললেন, “তা ঠিক। তবে ভূতের একটু-আধটু চিহ্ন দেখতে পেলে ভাল হত, তাই না? চলো, দোতলায় চলো, সেখানে যদি দেখতে পাই।”
লোচন ফিরে এল। বলল, দরজা দিয়ে ঢাকার কোনো উপায় নেই। সবই বন্ধ। শুধু বন্ধ নয়, এমনভাবে আটকে আছে যে, একটু নড়ানোও যায় না। তবে ভাঙা জানলা দিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়।
কিকিরা একটু ভেবে বললেন, “আগে দোতলাটা ঘুরে আসি। পরে ওদিকটা দেখব, লোচন।”
নকুল হাতের রডটা কাঁধে তুলে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। কথাবার্তা বলছিল না। কিন্তু তার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে খুব সতর্ক, বাইরে গাছপালার শব্দ হলেও কান খাড়া করে শুনেছে।
কিকিরা সিঁড়ি উঠতে লাগলেন। পেছনে তারাপদরা। কাঠের সিঁড়ি। শব্দ হচ্ছিল। পুরু হয়ে ধুলো জমে আছে সিঁড়িতে। ধুলো, পাখির পালক, ঘেঁড়া-খোঁড়া কাগজ, আরও নানান আবর্জনা। সিঁড়ির ধাপ কোনো-কোনোটা নড়বড়ে, কোনোটা আধভাঙা। পায়ের দাগ স্পষ্ট করে বোঝার উপায় নেই, কাঠের রঙ কালচে হয়ে গিয়েছে, ধুলো আর কাঠের রঙ প্রায় এক।
