পরের দিন যাব কি যাবনা করে বিশু সাধুবাবার কাছে যায়। বাড়িতে কাউকে কিছু বলেনি। বিকেলের পর সাধুবাবা বিশুকে যেতে বলেছিল। বিশু সেই সময়েই যায়। বিকেল শেষ হয়ে আসার পর সাধুবাবা অন্য যে দু-পাঁচজন ছিল তাদের সরিয়ে দিয়ে বিশুকে নিয়ে ঘোডা-সাহেবের কুঠির মধ্যে ঢোকে। সঙ্গে অন্য কেউ ছিল না। শুধু কুকুরটা ছিল। কুঠির মধ্যে বেশ খানিকক্ষণ ঘঘারাঘুরি করে শেষে সাধুবাবা তাকে দোতলার বড় একটা ঘরে নিয়ে যায়। সেই ঘরে বিশু আরও দুজনকে দেখতে পায় একজন চরণমামা, মানে অমূল্যর শালা, অন্য একজন চরণের সঙ্গী, বিশু তাকে চেনে না।
সাধুবাবার সঙ্গে চরণমামার কথা কাটাকাটি বেধে যায়, কুকুরটা চেঁচাতে থাকে, আর হঠাৎ চরণমামার সঙ্গী সাধুবাবার কুকুরটাকে বন্দুকের বাট দিয়ে মারে। প্রচণ্ড জোরে। এত আচমকা ঘটনাটা ঘটে যায় যে, বিশু প্রথমটায় ভয় পেয়ে পালাতে যাচ্ছিল। পালাতে গিয়ে তার সঙ্গে চরণের সঙ্গীর ধাক্কা লাগে। বন্দুক পড়ে যায় সঙ্গীর হাত থেকে। বিশু সেটা কুড়িয়ে নিতে যায়। বন্দুকটা সে তুলেই নিচ্ছিল। চরণমামা তার হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নেয়। তখনই সাধুবাবাকে গুলি করা হয়। সাধুবাবা জানলা দিয়ে লাফ মারছে–বিশু দেখেছে। তারপর কী হয়েছে, তার খেয়াল নেই। শুধু সে যে পালাতে পেরেছিল, এইটুকু তার মনে আছে।
যা শুনেছে তারাপদ সেই ঘটনা থেকে স্পষ্ট করে কিছুই ধরা যায় না। তবু একবার ঘটনাটা ভেবে নিল।
তারাপদ বলল, “সাধুবাবা বোধ হয় বিশুকে কোনো গোপন খবর দিতে চাইছিল। দেখাতে চাইছিল কিছু।”
কিকিরা বললেন, “হতে পারে। নাও হতে পারে। সেই খবর শোনার জন্যে বিশু গিয়েছিল? না, এমনিই গিয়েছিল? মনে রেখো, বিশু ছেলেমানুষ। ছেলেমানুষের মনে নেহাতই একটা কৌতূহল থাকতে পারে। কিংবা ধরো, বিশু খানিকটা ভয়ও পেয়েছিল। সাধুবাবার কথা না শুনলে পাছে অমঙ্গল হয়।”
“সেই সাধুবাবাই বা কোথায় গেল?”
“সেটাও একটা রহস্য।…রহস্য অনেক। কে এই সাধুবাবা? কোথায় গেল সে? কেন ওই কুঠিবাড়িতে চরণ গিয়েছিল, তার সঙ্গীই বা কে? বন্দুক কেন ছিল চরণদের সঙ্গে? এতগুলো কেনর কোনো জবাবই পাচ্ছি না, তারাপদ।”
তারাপদ বলল, “আপনার একার পক্ষে কি এতগুলো কেন র জবাব খুঁজে পাওয়া সম্ভব, কিকিরা? আমার মনে হয়, ফকিরবাবুর উচিত ছিল পুলিশের কাছে যাওয়া।”
মাথা নাড়লেন কিকিরা।”তাতে লাভ হত না।”
“কেন?”
সাধুবাবাই যেখানে বেপাত্তা, সেখানে বিশু কেমন করে প্রমাণ করত যে, সাধুবাবা তাকে কুঠিতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল? তা ছাড়া, চরণ আর চরণের সঙ্গী কুঠিতে ছিল, এটাও সে প্রমাণ করতে পারত না। কেননা, চরণরা অস্বীকার করত।”
“তা হল চরণরাই বা কেমন করে বিশুকে ফাঁসাতে পারে?”
“পারে না। পারছে না বলেই চুপ করে আছে। তবে ওরা একেবারে চুপ করে নেই। বাইরে চুপ। ভেতরে-ভেতরে ফকিরকে অস্থির করে তুলেছে।”
তারাপদ চুপ করে থাকল। তার মাথায় কিছু আসছিল না।
বৃষ্টি থামেনি। তোড় অনেকটা কমে এসেছে। কালচে আলো অল্প পরিষ্কার হয়েছে।
মাথার চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে কিকিরা বললেন, “কাল আমরা ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে যাব। তন্ন-তন্ন করে সব দেখব। চরণরা মিছেমিছি কুঠিতে যাবে না। তারা কেন যেত? কী তাদের উদ্দেশ্য? আর ওই সাধুবাবাই বা কে?”
তারাপদ বলল, “চরণ নিশ্চয় অমূল্যর কথা-মতন কাজ করত? তাই না?”
“নিশ্চয়। তা ছাড়া চরণ লোক ভাল নয়। পাকা শয়তান বলে আমি শুনেছি।”
তারাপদ আর কোনো কথা বলল না।
.
০৭.
পরের দিন ফকিরের যাওয়া হল না। আগের দিন রাত্রে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পা হড়কে পড়ে গোড়ালি মচকে ফেলেছেন। বাঁ পায়ের গোড়ালি গোদের মতন ফুলে গিয়েছে; ব্যথা প্রচণ্ড। বসার ঘরে বসে গুলাব লোশান লাগাচ্ছেন।
ফকির যেতে পারলেন না, কিন্তু তিনি নকুলকে সঙ্গে দিলেন। বললেন, “গাড়ি নিয়ে যাও, নকুলও সঙ্গে থাক।”
জিপের রাস্তা সরাসরি নয়, খানিকটা ঘোরা পথে যেতে হয়। রাস্তাও পাকা নয়, কোথাও মাটি আর নুড়ি-ছড়ানো রাস্তা, কোথাও ঘেঁষ ছড়ানো, কোথাও বা একেবারে মেঠো পথ।
সঙ্গে লোচনও ছিল।
যেতে-যেতে সাধারণ কিছু কথার পর কিকিরা লোচনকে বললেন, “সেই শশিপদর খবর পেলে, লোচন?”
“আজ্ঞা না। দামড়া গাঁয়েও লাই।” লোচন বলল।
“নেই তো গেল কোথায়? ওর বাড়ি দামড়া গাঁয়ে।”
লোচন বলল, “উ মস্ত খেপা, বাবু! আজ হেথায়, কাল হোথায়, কুথায় যে থাকে খেপা, কেউ বলতে লারে। তবে গাঁয়ের লোকে বলল বটে, খেপা গাঁয়ে ঘোরাফেরা করছিল।”
নকুল গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, “শশিপদ বড় একটা ওঝা বটে, বাবু। চিতি সাপেরও বিষ নামায়।”
কিকিরা আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, “তাই নাকি! শশী তো গুণী লোক হে। শুনি, কিছু বলো বটে উর কথা।”
তারাপদ মুচকি হাসল। কিকিরার কথা শুনেই।
লোচন শশিপদর বৃত্তান্ত বলতে লাগল, মাঝে-মাঝে নকুলও বলছিল দু চার কথা।
শশিপদ দামড়া গ্রামের লোক। বরাবরই খেপাটে ধরনের। একটা কুঁড়ে ঘর আর একফালি সবজি বাগানের বেশি ওর কিছু ছিল বলে কেউ জানে না। গানটান গাইতে পারত শশী। গ্রামের যাত্রাদলে গানটান গাইত। শশীর মাসি মারা যাবার পর অনেকদিন ও আর নিজের গ্রামে ছিল না। কোথায় চলে গিয়েছিল কে জানে। আবার ফিরে এল। একেবারে বোষ্টম বৈরাগীর বেশ। ফিরে আসার পর জানা গেল, শশী ওঝাগিরি শিখেছে। গাছ-গাছড়ার ওষুধ দিতে পারত, কাউকে সাপে কামড়ালে বিষ নামাত। শশিপদর হাতে সাপে কামড়ানো লোক অনেক বেঁচে গিয়েছে। যারা মারা গিয়েছে, তাদের জন্যে শশী অনেক করেছিল, বাঁচাতে পারেনি। সদর হাসপাতালে পাঠিয়েও তো সাপেকামড়ানো রোগী মরে। মোট কথা, শশিপদ খেপা হলেও তার কতক গুণ রয়েছে।
