বাইরের আলো থাকায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কোনো অসুবিধে হল না।
দোতলায় আসতেই বাইরের আলোয় চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। অজস্র গাছপালার মাথায় গায়ে শরতের রোদ মাখানো। কাল বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় ঘোওয়া-মোছা গাছপালা যেন সকালের উজ্জ্বল রোদে আরও সবুজ হয়ে গিয়েছে। বাতাসও রয়েছে এলোমেলো।
তারাপদ বেশ কয়েকবার হাঁটার পর রুমালে নাক-মুখ মুছে নিয়ে আলোর দিকে তাকাল।
নিচের তলার মতন দোতলাতেও টানা বারান্দা। বারান্দার ধার ঘেঁষে মোটা মোটা থাম। কোনো কোনো থাম খসে যাচ্ছে। মেঝে ধুলোয় ভরতি, গাছের শুকনো পাতা জমে রয়েছে, আরও নানান রকম আবর্জনা।
কিকিরা প্রথমে বাঁদিকেই পা বাড়ালেন। নিচের তুলনায় ঘরের সংখ্যা কম লাগছিল চোখে। নিচের তলায় পর-পর দরজা ছিল। ওপরে পাশাপাশি দরজা কম। বিশাল-বিশাল দরজা-জানলা। দরজা বন্ধ, জানলা কোথাও-কোথাও খোলা, কাচের শার্সি ভাঙা। সামনের ঘরটারই জানলা খোলা ছিল।
জানলা টপকেই ঘরে ঢুকলেন কিকিরা। তারাপদরাও সাবধানে জানলা টপকাল।
রোদ বা আলো কোনোটাই ঘরে ঢোকার উপায় নেই। জানলা দিয়ে যেটুকু আলো আসছিল।
কিকিরা হাতের টর্চ জ্বাললেন।
তারাপদ টর্চের আলোয় ঘরটা অনুমান করার চেষ্টা করল। এত বড় ঘরে টর্চের আলো কিছুই নয়। ঘরের চারটে দেওয়াল যেন চারপ্রান্তে। বিরাট একটা ভাঙা টেবিল পড়ে আছে একদিকে। কোনো বড়সড় ছবির ভাঙা ফ্রেম। একটা পা মচকানো আর্ম চেয়ার।
কিকিরা টর্চের আলোয় মেঝে দেখালেন। তারাপদর মনে হল, দাবার ছকের মতন দেখতে মেঝেটা। পা দিয়ে ধুলো সরাল।”কিসের মেঝে? কাঠের?”
“সিমেন্টের,” কিকিরা বললেন, “লাল আর কালো রঙ দিয়ে চৌকো ডিজাইন করা।”
লোচন বলল, “মাথার উপর শিকলি ঝুলছে বটে, বাবু।”
কিকিরা টর্চের আলো ফেললেন ছাদের দিকে। একসময় বোধহয় ঝাড়বাতি গোছের কিছু ঝোলাতেন ঘোড়াসাহেব। ঝাড় নেই, কিন্তু গোটা দুয়েক শেকল ঝোলানো রয়েছে। কিকিরা বললেন, “সাহেবের বাতি ঝুলত গো! লাও, চলো।”
জানলা টপকেই বাইরে আসতে হল।
পর-পর তিনটে ঘর দেখলেন কিকিরা। কোনটা কিসের ঘর ছিল বোঝা দায়। কোনোটা হয়ত খাবার, কোনোটা বসার কোনোটা বা শোবার।
বাঁদিকের ঘরগুলো দেখা হয়ে যাবার পর ডান দিকে এগুলেন কিকিরা।
ডানদিকের প্রথম ঘরটার জানলার সবই রয়েছে। কাঁচই যা ভাঙা। দরজা খোলা ছিল।
দরজা দিয়েই ভেতরে এলেন কিকিরা। ফাঁকা ঘর। দুপাটি পুরনো দোমড়ানো জুতো মাত্র পড়ে আছে। বুট জুতো।
কিছুই পাওয়া গেল না। কিকিরা যেন হতাশই হলেন।
আবার বারান্দায় এসে পা বাড়াতেই তারাপদ হঠাৎ বলল, “কিকিরা?”
“কী?”
“পায়ের দিকে তাকান”, তারাপদ বলল।
মেঝের দিকে তাকালেন কিকিরা। তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাত দিয়ে ইশারায় নোচন আর নকুলকে দাঁড়াতে বললেন।
“কিসের দাগ কিকিরা?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
মাটিতে বসে কিকিরা ভাল করে নজর করলেন। বললেন, “কোনো ভারী জিনিস টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেন। ধুলোটুলোর ঘষটানো দাগ।“ বলে সামনের ঘরের দিকে তাকালেন, দাগটা ঘর পর্যন্ত গিয়েছে। ঘরের দরজা বন্ধ। জানলাও। এতক্ষণে একটিমাত্র জানলা চোখে পড়ল, যা অটুট।
কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন।”দরজাটা খোলা যায় কি না দেখ তো, নকুল?”
নকুল প্রথমে ধাক্কা মারল, শেষে লোহার রড গলাবার চেষ্টা করল দরজার ফাঁকে, পারল না।
জানলাটা অবশ্য শেষ পর্যন্ত খোলা গেল।
কিকিরা জানলা টপকে ভেতরে ঢুকলেন।
টর্চের আলোয় এই ঘর একেবারে অন্যরকম দেখাল। ঘরটার অনেকটা পরিষ্কার। একপাশে লোহার স্প্রিং দেওয়া খাট, ছোবড়ার গদি রয়েছে খাটের ওপর, যদিও পুরনো গদি। কোণের দিকে মাটির কলসি আর কলাইয়ের অগ রাখা। দু চারটে শুকনোশালপাতা পড়ে আছে ঘরের পাশে। লণ্ঠনও চোখে পড়ল। শিসওঠা কাঁচ। মাদুর গুটিয়ে রেখেছে কেউ।
বাইরের দিকের জানলা বন্ধ ছিল। বড় বড় দুই জানলা। হাত আট-দশ অন্তর। কিকিরা নকুলকে জানলা দুটো খুলে দিতে বললেন, “সাবধানে খুলো হে।”
লোচন আর নকুল জানলা দুটো খুলে দিল। খুলে দিয়েই লোচন যেন কী লল। আলো এল জানলা দিয়ে, ঘর স্পষ্ট হল।
তারাপদ ঘরটা দেখতে লাগল। বিশাল ঘর, সেই একই রকমের লাল কালোর চৌকো-ঘর কাটা সিমেন্টের মেঝে। মাথার ওপর এক জোড়া শেকল ঝুলছে। ঘরের এক কোণে একটা বা দাঁড় করানো।
কিকিরা ডানদিকের জানলার কাছে গিয়ে একমনে কখনো জানলা, কখনো বাইরেটা দেখছিলেন। একবার ডানদিকের জানলাটা দেখেন, আবার গিয়ে বাঁদিকেরটা। জানলার কাঠের ওপর হাত বোলান। বেশ কিছুক্ষণ জানলা দেখার পর তারাপদকে ডাকলেন।
কাছে গেল তারাপদ।
ডানদিকের জানলাটা দেখালেন কিকিরা। তারাপদ অবাক হয়ে দেখল, পর-পর প্রায় গায়ে-গায়ে দুটো জানলা। একই মাপ।
কিকি বাইরের দিকটাও দেখালেন। ”দেখো, নিচেও দেখো।”
তারাপদ অবাক হয়ে দেখল, লোহার একটা ঘোরানো সিঁড়ি নিচে নেমে গিয়েছে। সিঁড়িটা বাড়ির বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই, কেননা সিঁড়ির বাইরের তিনটে দিকই ইটের গাঁথনি দিয়ে গোল করে ঘেরা। সেই গাঁথনির জায়গায়-জায়গায় ইট খসে যাওয়ায় আলো ঢুকছে সিঁড়িতে। সুড়ঙ্গর মতন দেখায় সিঁড়িটা।
তাারাপদ সরে গিয়ে বাঁদিকের জানলা দেখল। কিছু বুঝতে পারল না।
কিকিরা বললেন, “বাঁদিকের ওই জানলা আর এই ডান দিকের জানলাটায় তফাত বুঝতে পারছ? আসলে, ডানদিকেরটা ডবল জানলা। দু আড়াই ফুট তফাত দুটো জানলার মধ্যে। মাঝখানে ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়ে গলে গেলেই ওই সিঁড়ি। তুমি লক্ষ করে দেখো, সিঁড়িটা ওপরের দিকে একেবারে জানলা পর্যন্ত উঠে আসেনি। খানিকটা নিচুতে শেষ হয়েছে। তার মানে, এই সামনের দিকের জানলাটা টপকে ফাঁকের মধ্যে দিয়ে গলে গেলেই সিঁড়িটা ধরতে পারা যাবে। আমি যতটা জানি, এই রকম ডবল জানলা একসময় য়ুরোপে দেখা। যেত যুদ্ধবাজ রাজ-রাজড়াদের প্রাসাদে। কেন জানো? তখন কথায় কথায় কাটাকাটি রক্তারক্তি চলত। কে যেন শত্রু হবে কখন, কেউ জানত না। কাজেই, ঘরের মধ্যে আচমকা শত্রুর মুখোমুখি হলে বাঁচবার এই একটা পথ খোলা থাকত। ঘোড়া-সাহেব কেন এমন জানলা বানিয়েছিলেন জানি না। শখ করে কিংবা আভিজাত্যের জন্যে হতে পারে। অন্য কারণও থাকতে পারে।”
