তারাপদ নিশ্বাস ফেলল।”সত্যি বন্দুক তা হলে নয়। ওটা আপনি আনলেন কেমন করে? সঙ্গে তো দেখিনি?”
“ট্রাংকে ছিল। খোলা যায় পার্টসগুলো।”
“সত্যি কিকিরা, আপনি মিস্টিরিয়াস” তারাপদ হেসে ফেলল। কালো ট্রাংকটায় কি ম্যাজিকের জিনিস ভরে এনেছেন?”
“কিছু কিছু এনেছি। দাও, একটা ধোঁয়া দাও।”
তারাপদ সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই দিল ককিরাকে। দুজনেই সিগারেট ধরাল।
তারাপদ বলল, “এবার আপনাকে আমি সারপ্রাইজ দেব। খানিকটা আগে একজনের সঙ্গে আলাপ হল। নাম শশিপদ পঙ্খি। বলল, বৈরাগী।”
তাকালেন কিকিরা। “এই গ্রামের লোক?”
“না, ঠিক এই গ্রামের নয় বলল।” বলে তারাপদ শশিপদর সঙ্গে দেখা হবার ঘটনাটা পুরো বলল।
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, “লোচনকে জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে, ওই নামে আশেপাশের গ্রামে কেউ থাকে কি না। তা ছাড়া এই গ্রামে আসা-যাওয়া করলে তোক নিশ্চয় তাকে চিনবে।”
“ডাকব লোচনকে?”
“এখন কি তাকে পাবে? শুনেছিলাম, এই সময়টায় সন্ধিপুজো। ফকির তাই বলছিল।”
জানলার বাইরে আরও তোড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘও ডাকছিল। বাইরের দিকে তাকিয়ে তারাপদ বলল, “ফকিরবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। খানিকটা আগে উঠে গেল। স্নান করে সন্ধিপুজো দেখতে যাবে।”
ইতস্তত করে তারাপদ আবার বলল, “কালকের কথা বলেছেন?”
“বলেছি।..ফকির বিশ্বাসই করল না, ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে কেউ থাকতে পারে। বলল, পুরনো বাড়ি, অনেক কিছুই ভেঙেচুরে পড়ে। হয়ত কিছু ভেঙে পড়েছিল।”
“কোথাও কিছু নেই, ভেঙে পড়বে?”
“হতে পারে। তা আমি ঠিক করলাম, আগামী কাল সকালের দিকে আমরা আবার ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে যাব।” বলে মুহূর্তের জন্যে থেমে আবার বললেন, “এবার শুধু তুমি আর আমি নয়। সঙ্গে ফকির থাকবে। নকুলকেও সঙ্গে নেব। বিশুকে নিতে পারলে আরও ভাল হত। কিন্তু তাকে নেবার। উপায় নেই।”
“বিশুকে কেন নেবেন?”।
“ঠিক কোথায়, কোন জায়গায় খুনের ব্যাপারটা ঘটছিল সেটা জানা দরকার। কখনো শুনছি পুব দিকের ঘরে, কখনো শুনছি উত্তর দিকের ঘরের বড় জানলার কাছে। সঠিকভাবে বলতে পারছে না।”
“যে জানালার কাছেই হোক, তফাত কোথায়?”
“তফাত,” কিকিরা তারাপদর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থেকে একটু যেন হাসির মুখ করলেন, “তফাত অনেক। সে তুমি এখনো বুঝতে পারবে না।”
“আপনি বুঝেছেন?”
“না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা, “বুঝিনি; বোঝার চেষ্টা করছি।”
তারাপদ চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিল। বৃষ্টির, তোড় কমে এসেছে খানিকটা। শরৎকালের বৃষ্টির অনেকটা এই ধরন।
কিকিরা বললেন, “তোমার সঙ্গে খানিক পরামর্শ করা যাক।…কাল থেকে আজ পর্যন্ত যা দেখলে তাতে কিছু আন্দাজ করতে পারো?”
তারাপদ ভাবল সামান্য। মাথা নাড়ল।”না, আমি কিছুই আন্দাজ করতে পারছি না। সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে অপরিষ্কার।”
“যেমন?”
“প্রথমত ধরুন, ঘোড়া-সাহেবের কুঠি নিয়ে ফকিরবাবুদের মধ্যে রেষারেষি এত বেশি হবে কেন? অন্য পাঁচটা সম্পত্তি যদি তাঁরা ভাগাভাগি করে নিয়ে থাকতে পারেন, এটাও পারতেন। যদি ভাগাভাগিতে রাজি না-থাকতেন, মামলা-মকদ্দমা করতেন–তারপর কোর্টের বিচারে যা হবার হত। মামলা তো ওঁদের হাতের পাঁচ।”
কিকিরা বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। ফকিররা পাঁচ-সাতটা মামলা তো লড়ছেই, আর-একটা বেশি হলে কোনো ক্ষতি হত না। কিন্তু তারা লড়ছে না। কেন? এর নিশ্চয় কোনো কারণ রয়েছে। কারণটা কী?”
“সে তো আপনার বন্ধু ফকিরবাবু বলবে।”
“ফকির বলছে না। এড়িয়ে যাচ্ছে। ও যা বলছে তাতে মনে হয়, নেহাতই রেষারেষির ব্যাপার। আমার কিন্তু তা মনে হয় না।”
“আপনার কী মনে হয়?”
“ঘোড়া-সাহেবের কুঠির মধ্যে অন্য কোনো রহস্য আছে। সেটা যে কী রহস্য, তা আমি তোমায় বলতে পারছি না।”
“যদি কোনো রহস্য থাকবে–সেটা কি এতকাল পরে জানা গেল?”
কিকিরা বললেন, “বোধ হয় তাই। তা বলে ভেবো না আমি বলছি দু’দশ দিনের মধ্যে জানা গিয়েছে। হয়ত আরও আগে গিয়েছে। তবে খুব বেশিদিন আগে নয়।”
তারাপদ কী মনে করে ঠাট্টার গলায় বলল, “কোনো গুপ্তধনের খবর পাওয়া গিয়েছে নাকি?”
কিকিরা বললেন, “হতে পারে।”
তারাপদ চুপ করে থাকল।
সামান্য পরে কিকিরাই আবার বললেন, “দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, ফকিরের ছেলে বিশু কেন ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে গিয়েছিল?”
কেন গিয়েছিল তারাপদ জানে না, কিকিরাও নয়। ফকিরও বলেছেন, তিনি জানেন না। সত্যি বলেছেন না মিথ্যে বলেছেন, তিনিই জানেন।
তারাপদ যা শুনেছে, তা এই রকম ঘোড়া-সাহেবের কুঠির কাছাকাছি নুনিয়ার এক পাশে এক সাধু এসে আড্ডা গেড়েছিল। বিশাল এক বটগাছের তলায় বসে থাকত সাধুবাবা। ধুনিও জ্বালাত না, গাঁজাও খেত না। শুধু একটা ত্রিশূল সাধুবাবার সামনে মাটিতে পোঁতা থাকত। সাধুবাবার সঙ্গী বলতে একটা জংলি কুকুর। সাধুবাবার খবর কিছুদিনের মধ্যে সর্বত্র রটে যাবার পর অনেকেই বাবাকে দেখতে যেত। অসুখ-বিসুখের ওষুধ চাইত, ভাগ্যে কী আছে জানতে চাইত। সাধুবাবা কথাবার্তা বড় বলত না, ওষুধ-বিষুধও দিত না। তবে খেয়ালের মাথায়-দু একজনকে গাছ-গাছড়ার কথা বলে দিয়েছে। বিশুর এক বন্ধু আছে কাছাকাছি এক কোলিয়ারিতে। ম্যানেজারের ছেলে। সে-বেচারির মা অসুখে খুব ভুগছিল। ছেলেটার বাবা সাধুবাবার কাছে গিয়েছিল দৈব কোনো ওষুধ চাইতে। বন্ধুর মুখ থেকে সাধুবাবার কথা শুনে বিশু সাধুর কাছে গিয়েছিল। সাধুবাবা বিশুকে পরের দিন একা দেখা করতে বলে। বিশু জিজ্ঞেস করেছিল, কেন সে দেখা করবে? সাধুবাবা কথার কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি; শুধু বলেছিল “তোর মঙ্গল হবে।”
