কিকিরা যেন কিছু ভাবছিলেন। বললেন, “না, ফিরেই চলল।”
“শব্দটা কিসের?”
“বুঝতে পারছি না। মনে হল, কোনো ভারী জিনিস কেউ সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছে। কাঠের সিঁড়ি। শব্দ হচ্ছিল।”
“বাড়িতে কেউ আছে তা হলে?”
“থাকাই সম্ভব। যে আছে, সে হয়ত আমাদের দেখতে পেয়েছে। বোধ হয় ভয় দেখাল।” কিকিরা তারাপদকে টেনে নিয়ে ফিরতে লাগলেন।
.
০৬.
অষ্টমী পুজোর দিন সকাল থেকেই মেঘলা। বেলা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে মেঘলা আরও ঘন হয়ে এল। বৃষ্টি যেন মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে আছে–যে-কোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরই মধ্যে ফকির রায়দের ঠাকুর-দালানে পুজো চলছিল। ঢাক বাজছে, ফকিরদের বুড়ো পুরোহিত পুজোয় বসেছেন, অন্দরমহলের লোকজন বাইরে, ঠাকুর-দালানে, গ্রামের অনেকেই এসেছে পুজোতে। কলকাতার বারোয়ারি পুজো নয়, গ্রামের বাড়ির পুজো, তারাপদ একপাশে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পুজো দেখল। ভালই লাগছিল তার। শহুরে জাঁকজমক নেই, অথচ কিসের যেন এক সাদামাটা সৌন্দর্য রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তারাপদ ঠাকুর-দালান ছেড়ে চলে এল। ঘরে গেল না। কাছাকাছি খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করার জন্যে বেরিয়ে পড়ল। বৃষ্টি আসতে পারে। এলেও ক্ষতি নেই। কাছাকাছি থাকবে তারাপদ।
ফকির রায়দের বাড়ির শ’খানেক গজের মধ্যেই গ্রাম। বোধ হয় গ্রামের শুরু, কেননা, যত পুব দিকে যাওয়া যায় ততই ঘরবাড়ি বেশি করে চোখে পড়ে। পাকা বাড়ি, কাঁচা বাড়ি, দুরকম বাড়ি রয়েছে। চোখে দেখলে মনে হয়, নিতান্ত ছোট গ্রাম নয়। তিরিশ-চল্লিশ ঘর লোকের বসবাস তো নিশ্চয়। কোথাও আকন্দগাছের বেড়া, কোথাও কাঁটাগাছের, বাঁশের খুঁটি আর কাঁটাতার দিয়েও কেউ-কেউ বেড়া বেঁধেছে, নানা ধরনের গাছপালা, শিউলী করবী জবা, কোথাও লাউ কিংবা কুমড়োর মাচা। পুজো বলেই বাড়ির সামনে দাওয়া নিকোনো, গ্রামের মুদির দোকানের বেঞ্চিতে বসে আছে কেউ কেউ, ময়রা-দোকানে ফুলুরি ভাজা চলছে, একরাশ ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে।
তারাপদ যেন মজা পাচ্ছিল। ফুলুরি খাবার সাধ হলেও সে এগুল না। সময় বুঝে এক বেলুনঅলাও হাজির হয়েছে। কাঁধে কাগজের খেলনা, কাঁধের ঝুলিতে বেলুন, এক হাতে সাইকেলের পাম্প, মুখে একটা বিচিত্র হুইসল। মাঝে মাঝে হুইসল বাজাচ্ছে।
এগিয়ে আসতেই তারাপদ পুকুর দেখতে পেল। খুব বড় না। পুকুরের চারদিকে কিছু গাছপালা। জনা-দুই লোক পুকুরের পাশে সবজি-খেতে কাজ করছে।
আরও সামান্য এগুতেই পেছন থেকে যেন কে ডাকল। দাঁড়াল তারাপদ। ঘর তাকাল।
বাউল বৈরাগী গোছের কে একজন এগিয়ে আসছে। বোধ হয় গাছপালার আড়ালে ছিল–চোখে পড়েনি।
কাছে এসে লোকটি তারাপদকে দেখল সামান্য, তারপর হাত জোড় করে নমস্কার করল। ”বাবু লতুন বটে। চিনতে লারছি।”
তারাপদ লোকটাকে নজর করতে লাগল। বয়েস হয়েছে। একমাথা বাবরি চুল। জট পড়েছে যেন। মুখে দাড়ি, অর্ধেক সাদা হয়ে গেছে। গায়ে একটা আলখাল্লা ধরনের জামা। হয়ত কোনোকালে কালো জামাটার রঙ গেরুয়া ছিল, এখন মাটির মতন রং ধরেছে। পায়ে ছেঁড়া-ফাটা চটি। লোকটা মাথায় লম্বা। তবে রোগা। মুখের আদলও লম্বা। সাদামাটা নিরীহ মুখেই তাকিয়ে ছিল লোকটা।
তারাপদ বলল, “হ্যাঁ, আমি নতুন।”
“কুথা থেকে আসছেন বটে?”
“কলকাতা।”
“কে আছেন হেথায়? লিজের লোক?”
“ফকিরবাবুর বাড়িতে উঠেছি। তুমি এখানে থাকো?”
“আজ্ঞা না। আমার গাঁ দামড়া। চতুর্দিকেই ঘুরি ফিরি।…বাবু ঘুরতে এসেছেন?”
“হ্যাঁ, বেড়াতে।”
“একা বটে?”
“না,” মাথা নাড়ল তারাপদ।”সঙ্গে লোক আছে বলেই তারাপদ হঠাৎ কেমন সাবধান হয়ে গেল। সন্দেহের চোখে লোকটাকে দেখল।”তোমার নাম কী?”
লোকটা আচমকা কেমন থতমত খেয়ে গেল। মুখে একই রকম হাসি। সামান্য যেন শুকনো দেখাল হাসিটা। তারপর বলল, “আমাদের নির্দিষ্ট ডাক আই, বাবু। যে যেমন ডাকে। কেউ হাঁকে খেপা, কেউ ডাকে বোরেগি। আমার নাম শশিপদ পঙ্খি।”
তারাপদ হাসির মুখ করল।”বাঃ, বেশ নাম।”
আরও দু-একটা মামুলি কথার পর তারাপদ আকাশের দিকে তাকাল। বলল, “বৃষ্টি আসবে। আমি চলি।”
শশিপদ দাঁড়িয়ে থাকল। তারাপদ ফিরতে লাগল। অনেকটা এগিয়ে এসে পেছন ফিরে তাকাল একবার, দেখল, শশিপদ পুকুরের দিকে চলে যাচ্ছে।
তারাপদ খুব সময়ে বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। দু-চার ফোঁটা জল গায়ে মাথায় মেখে তারাপদ কিকিরার ঘরে গিয়ে হাজির।
কিকিরা জানলার কাছে চেয়ার টেনে বসে আছেন। সামান্য তফাতে টেবিলের ওপর একটা বন্দুক পড়ে আছে।
তারাপদ বেশ অবাক হল। বন্দুক কেন ঘরে! কার বন্দুক?
“ঘরে বন্দুক কেন, কিকিরা?” তারাপদ বলল।
কিকিরা খুবই অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন। আজ সকালেও তারাপদ। কিকিরাকে অন্যমনস্ক দেখেছে।
তাকালেন কিকিরা। ”বেড়ানো হল?”
“হ্যাঁ, তা হয়েছে। কিন্তু বন্দুক সামনে রেখে বসে আছেন কেন?”
“দেখছিলাম। বোসো।”
জলের ছাট এদিকের জানলায় আসছে না। বাইরের কালচে রঙ আরও ঘন হয়ে বৃষ্টি বেশ জোরেই নেমেছে।
তারাপদ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। বলল, “ফকিরবাবুর বন্দুক?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “না। আমার।”
“আপনার বন্দুক? আপনার বন্দুক হল কবে?” তারাপদ বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবার একবার বন্দুকটার দিকে তাকাল।
কিকিরা বললেন, “ওটা আমারই বন্দুক। ম্যাজিক বন্দুক বলতে পারো। ম্যাজিক দেখবার সময় দরকার হত। বাইরে থেকে কিছু বুঝবে না। ভেতরে তেমন কিছু নেই।”
