“কেন বলুন তো? বাড়ির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখানে কেউ ভুলেও পা দেয় না। এক যদি ভূতটুত থাকে তো আলাদা কথা।” তারাপদ ঠাট্টা করেই বলল শেষের কথাগুলো।
কিকিরা বললেন, “ভূতের কাছে সাহস দেখানো ভাল। কিন্তু অদ্ভুতের কাছে নয়। এখানে যদি অদ্ভুত কিছু দেখো। এসো। সাবধানে আসবে।”
ভাঙা পাঁচিলের গায়ে আতা ঝোপ, কোনোরকমে শরীরটাকে গলানো যায়। কিকিরা রোগা মানুষ, দিব্যি গলে গেলেন। তারাপদ কিকিরার মতন করে সাবধানে ভেতরে মাথা গলিয়ে দিল।
পাঁচিলের এ-পারে গাছ। লতাপাতার জঙ্গল। দু-চার পা এগুতেই বড় বড় গাছের সারি। কতকালের পুরনো। ডালপালায় ছায়া করে রেখেছে নিচেটা। খানিক পরে সূর্য ডুবে গেলে হয়ত অন্ধকার হয়ে যাবে।
কিকিরার পাশে-পাশে আসছিল তারাপদ। গাছপালা পেরিয়ে আসতেই ঘোড়া-সাহেবের কুঠির মুখোমুখি হল। না, তারাপদই কল্পনাই করতে পারেনি এই কুঠি এত বড়, শুরু আর শেষ চোখে যেন ধরাই যায় না। বিশাল বাড়ি। গড়নটা কলকাতার পুরনো সাহেববাড়ির মতন, অন্তত পাশ থেকে সেই রকমই দেখাচ্ছে। পাথরের বাড়ি। রোদে বৃষ্টিতে পড়ে থাকতে থাকতে পাথরের গায়ে। শ্যাওলা ধরে-ধরে কালচে রঙ হয়ে গিয়েছে। বিশাল বিশাল জানলা। জানলার মাথাগুলো বাঁকানো। খড়খড়ি-করা পাল্লা। কোনোটা বন্ধ, কোনোটা ভেঙে জানলার গায়ে ঝুলছে। ভেতরের শার্সিও ভাঙাচোরা। বাড়ির গা-বেয়ে বাঁধানো নালা ছিল চারপাশে জল যাবার জন্যে, আর্বজনায় ভরতি হয়ে সেখানে আগাছা জন্মেছে নানারকমের।
বাড়িটা দোতলা হলেও অনেক অনেক উঁচু দেখাচ্ছিল। সেকালের বাড়ি, তার ওপর সাহেববাড়ি–উঁচু, উঁচু-ছাদ দোতলাই বোধ হয়, সাধারণ বাড়ির চারতলার কাছাকাছি। তারাপদ বলল, “কত উঁচু হবে? ওই ছাদ পর্যন্ত?”
“তা বলতে পারব না। আগেকার দিনে বাংলোবাড়ির ঘরও যত বড় হত, মাথার ছাদও তত উঁচু হত। এতে ঘর ঠাণ্ডা থাকে, বাতাস-চলাচল ভাল হয়। আসলে, এইটেই ছিল তখনকার ধরন। কলকাতার বনেদি পুরনো বাড়িতেও এই রকম ব্যবস্থা।”
“আপনি তেতলা থেকে লাফ মারার কথা বলছিলেন না? তেতলা কোথায়?”
“এ-বাড়ির দোতলার ছাদ কম করেও সাধারণ বাড়ির তেতলা হবে। তাই নয়? আমি কতটা উঁচু থেকে লাফ মারা হয়েছিল সেটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। ধরো, পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ ফুটের কাছাকাছি হবে ছাদটা।”
তারাপদ অত বুঝল না।
কিকিরা ধীরে-ধীরে বাড়ির সামনের দিকে এগুতে লাগলেন। এক সময় বাংলো ঘিরে রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা এখন ঘাস আর বুনো লতায় ভরতি, ফাটল ধরেছে, এবড়ো-খেবড়ো হয়ে আছে।
“একটু সাবধানে,” কিকিরা বললেন, “সাপখোপ আছে কিন্তু।“
তারাপদ সঙ্গে-সঙ্গে লাফিয়ে উঠল। সাপের নামে গা শিরশির করে উঠেছিল। বলল, “আপনি কি আমাকে সাপের মুখে ফেলবেন?”
কিকিরা হাসলেন। “কলকাতার ছেলে তোমরা, সাপের নামেই চমকে ওঠো। না, তোমায় সাপের মুখে ফেলব না। আমি নজর রাখছি।”
তারাপদ ভয়ে-ভয়ে বলল, “বিষাক্ত সাপ রয়েছে?”
“থাকলে বিষাক্ত থাকবে,” কিকিরা মজার গলায় বললেন।”কেউটে, গোখরো?”
তারাপদ দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, “তা হলে আর এগিয়ে দরকার নেই ফিরে চলুন। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। এখুনি ঝপ করে অন্ধকার হয়ে যাবে। সাপের মুখে পড়ার চেয়ে ফিরে যাওয়াই ভাল।”
কিকিরা বললেন, “তা ঠিক। অন্ধকারে এ বাড়ির চারপাশে ঘোরাঘুরি করা ভাল না। বিপদ হতে পারে। বাড়িটা তোমাকে চোখের দেখা দেখাবার জন্যে এনেছিলাম। কেমন দেখছ?”
“পুরনো সাহেবি কেল্লার মতন?”
কিকিরা তাঁর ঢিলেঢালা পোশাকের ভেতর থেকে বায়নাকুলার বের করে তারাপদকে দিলেন। বললেন, “এটা চোখে দিয়ে দেখো।”
তারাপদ দূরবীন চোখে লাগিয়ে দেখতে লাগল বাড়িটা। সেকেলে কোনো বিশাল ইমারতের মতনই দেখাচ্ছিল। দেওয়ালের গায়ে গাছ পর্যন্ত গজিয়ে গিয়েছে।
“কত ঘর আছে জানো এই বাড়িটায়?” কিকিরা বললেন, “মোটামুটি কুড়ি পঁচিশটা। বাড়িটা সামনের দিকে ছিল ঘোড়া-সাহেবের অফিস। পেছনে থাকত খানসামা, বাবুর্চি, আয়া। আস্তাবল ছিল আলাদা। ঘোড়া থাকত। সাহেব থাকত ওপরে। বুড়োবুড়ি। মেয়ে থাকত দার্জিলিংয়ে। ছেলে বিলেতে।”
তারাপদ লক্ষ করছিল, বিকেল পড়ে যাবার পর খুব তাড়াতাড়ি ছায়া ঘন হয়ে আসছে। হয়ত আর আধ ঘণ্টার মধ্যে অন্ধকার নেমে যাবে। তার অশান্তি হচ্ছিল। ভয় করছিল। এত গাছপালা জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে তার সাহস হচ্ছিল না। বাড়িটাও ভীষণ ভুতুড়ে দেখাচ্ছিল। দূরবীন নামিয়ে নিল তারাপদ।
কিকিরা আবার এগুচ্ছেন দেখে তারাপদ বলল, “আবার কোথায় যাচ্ছেন?”
“চলো, সামনেটা একবার দেখে আসবে?”
“না। অন্ধকার হয়ে যাবে।”
“হবে না। এসো। আমার সঙ্গে টর্চ আছে।”
“আপনি স্যার বেশি-বেশি সাহস দেখাচ্ছেন। অন্ধকার হয়ে গেলে ঝোপঝাড় গাছপালা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাব কেমন করে?”
“চলে যেতে পারব। এসো। দাঁড়িয়ে থেকো না।”
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তারাপদ পা বাড়াল। তার ভাল লাগছিল না।
খানিকটা এগিয়ে তারাপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিকিরাও দাঁড়ালেন।
”কিসের শব্দ?” তারাপদ বলল।
”বাড়ির ভেতর থেকে আসছে?” কান পেতে থাকলেন কিকিরা।
শব্দটা দূরে মেঘ ডাকার মতন লাগছিল অনেকটা। বাড়ল। তারপর থেমে গল হঠাৎ।
তারাপদর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকল বড়বড় চোখ করে।
