তারাপদর কাঁধেই জলের বোতল ঝুলছিল। কিকিরাই নিতে বলেছিলেন। তারাপদ জল খেল।
কিকিরাও জল খেয়ে নিলেন। ঢিলেঢালা পোশাক তাঁর, হাতে একটা সরু ছড়ি, হাতলটা ছাতার হাতলের মতন বাঁকানো। ঘন খয়েরি রঙ ছড়িটার; বোঝাই যায় না ওটা লোহার।
জল খেয়ে তারাপদ একটা সিগারেট ধরাল। আবার হাঁটতে লাগল দুজনেই।
হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা বললেন, “তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তারাপদ। ফকিরদের যে বংশতালিকা দেখলে, তা থেকে কিছু আন্দাজ করতে পারো?”
তারাপদ বলল, “সত্যি কথা বলতে কী কিকিরা, ওই টেবল–কিংবা বলুন চার্ট-এর ছেলে অমুক, তার ছেলে তমুক–এসব আমার মাথায় ঢোকে না। একরাশ নাম দেখলাম এই মাত্র।”
“তা ঠিক। নাম থেকে কী আর বোঝা যায়?” বলে সামান্য চুপ করে থেকে কিকিরা আবার বললেন, “আচ্ছা, ফকিরের ছোটাকাকা সম্পর্কে তোমার কী মনে হয়?”
“ছোটকাকা! মানে সেই সন্ন্যাসী! তিনি তো মারা গিয়েছেন।”
“হ্যাঁ। কিন্তু কেউ চোখে দেখেনি। লোকের মুখের খবর থেকে জেনেছে ফকিররা।”
তারাপদ বেশ অবাক হয়ে কিকিরার মুখের দিকে তাকাল।”আপনার কথা বুঝলাম না। আপনার কি মনে হয়, ছোটকাকা মারা যায়নি?”
“তা আমি বলছি না। হয়ত গিয়েছেন। ..আবার ধরো, না-ও যেতে পারেন?”
“মানে?”
“মানেটা তো এখন বোঝা যাচ্ছে না। …তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপারে আমার খটকা লাগছে। ফকিরের ঠাকুরদারা দুই ভাই। বড় হলেন ফকিরের ঠাকুরদা। ছোটজনের একটি ছেলের নাম দেখতে পেলাম ওই লিস্টিতে, কিন্তু তারপর আর কোনো নাম নেই। অর্থাৎ ফকিরের ছোট ঠাকুরদার বংশের একজনকে পাচ্ছি। অন্যরা কোথায়? কেউ কি ছিল না?”
তারাপদ এত জটিল ব্যাপার বুঝল না। বলল, “আপনার সন্দেহ আমি বুঝতে পারছি না।”
কিকিরা হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “বিষয়-সম্পত্তি, ধন-দৌলত নিয়ে বড়বড় রাজরাজড়াদের মধ্যে যত না গণ্ডগোল বাধে, এই সব ছোটখাট রাজা-টাইপের লোকের মধ্যে তার চেয়ে ঢের বেশি গোলমাল। উটকো বড়লোকদের মধ্যে আকছাড়। তা ছাড়া এই সব এলাকায় পারিবারিক ঝগড়াঝাটি, খুনোখুনি, মামলা-মকদ্দমা খুব বেশি। আমার মনে হচ্ছে, ফকিরদের ফ্যামিলিতে আরও কিছু রহস্য আছে।”
“সে তো আপনারই জানার কথা। ফকিরবাবু আপনার বন্ধু।”
“বন্ধুরাও সব সময় সব কথা বলে না। যেমন আজ ফকির বলল, তার ছেলে বিশু ছুঁড়েছিল। আমার কিন্তু কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না।”
তারাপদ কোনো কথা বলল না। বরং কিকিরার মাথায় কেমন করে এত। চিন্তা আসে ভেবে অবাক হচ্ছিল।
আর কিছুক্ষণ হেঁটে আসার পর কিকিরা তাঁর ছড়ি তুলে দূরে কিছু দেখালেন। বললেন, “ওই যে দেখো, দেখতে পাচ্ছ? ওটাই ঘোড়া-সাহেবের কুঠি।”
তারাপদ দূরে তাকাল। গাছপালার জঙ্গলের মতন খানিকটা জায়গা, ঘর বাড়ি কিছুই চোখে পড়ে না। তারাপদ বলল, “ওই জঙ্গলটা?”
“আর-একটু এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে।”
বেশি এগিয়ে যেতে হল না, গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা বাড়ির সামান্য অংশ চোখে পড়ল। তারাপদ বলল, “নদী কোথায়? আপনি বলেছিলেন বাড়ির পাশে নদী আছে?”
“নদী নয়; নালা। এখানকার লোক নদীই বলে। নুনিয়া নদী। এখান থেকে দেখতে পাবে না। বাড়ির কাছে গেলে পাবে। নুনিয়া ও-পাশ দিয়েই চলে গিয়েছে।”
“জল নেই?”
“বর্ষাকালে থাকে। ভরেই থাকে। এখন হাঁটুতক থাকতে পারে। চলো, দেখা যাবে।”
“আপনি কদিন আগেই এসেছিলেন, তখন ছিল?”
“অল্প।”
কথা বলতে বলতে কুঠির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তারাপদরা। সামান্য পরে একেবারে কাছাকাছি এসে গেল।
ঘোড়া-সাহেবের কুঠির কাছাকাছি এসে তারাপদ থমকে দাঁড়াল।
কিকিরার কথা থেকে এতটা বোঝেনি সে। এখন বুঝতে পারছে। বিশাল-বিশাল গাছপালায় ঘেরা একটা পরিত্যক্ত, ভাঙা দুর্গর মতনই দেখতে। মনে হয়, এককালে এখানে বোধ হয় কোনো রাজাটাজা দুর্গ বানিয়ে থাকত। কিকিরা বললেন, “এদিক দিয়ে এসো। পেছন দিক দিয়ে যাব।”
“কেন? সামনে কেউ থাকে?”
“সাবধানের মার নেই। তা ছাড়া সামনে দিয়ে ঢুকতে পারব না। সদর-ফটকটা কাঁটা-তার দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ। আগাছার পাঁচিল হয়ে গেছে ওখানটায়।”
তারাপদ কিকিরার কথামতন তাঁর পেছনে-পেছনে এগুতে লাগল। নালার মতন নদীটাও চোখে পড়ল এবার। বাড়ি আর পাথর, মাঝ-মধ্যিখানে গোড়ালি-ডোবা জল। চারদিক ফাঁকা মাঠ আর মাঠ, একেবারে নেড়া মাঠই বলা যায়, গাছপালা নামমাত্র।
এবড়ো-খেবড়ো জমি, কাঁটা-ঝোপ, বনতুলসীর ভেতর দিয়ে এগুতে-এগুতে তারাপদ বুঝল, কিকিরা একটা ঢোকার রাস্তা আগেই বেছে রেখে গিয়েছেন। অবশ্য না বেছে রাখলেও চলত, কেননা কুঠিবাড়ির চারদিকে যে মানুষ-সমান উঁচু পাঁচিল, তার অনেক জায়গাই ভেঙে গিয়েছে, ভেতরের গাছপালার শেকড় পাঁচিল ফাটিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া ওই আম-জাম-জারুলের ডালপালা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, সামান্য চেষ্টা করলেই পাঁচিলের বাইরে হাত পাওয়া যায়।
রোদের তাত আর নেই, আলোও মরে এসেছে। চারদিক থেকে গাছপালার জংলা গন্ধ ছড়াচ্ছিল, বনতুলসীর গন্ধ বেশ ভারী, অজস্র নয়নতারা ফুটে আছে, কাঁটাঝোপে নানা রঙের ছোট-ছোট ফুল।
অনেকটা হেঁটে এসে কিকিরা বললেন, “এসো। ওই ফাটলটার মধ্যে দিয়ে ঢুকে যাব।”
“পেছনে কোনো ফটক নেই?”
“আছে। গোটা দুয়েক আছে। ছোট ছোট। সেদিকটা এত অপরিষ্কার নয়। তবু ওখান দিয়ে ঢুকব না।”
