কথাটা এমনভাবে বললেন ফকির যে, তারাপদর মনে হল, এ বাড়ির ছেলেদের ওটা শিখে রাখতেই হয়।
“ও বাড়ির খবর কী?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“অমূল্যদের কথা বলছ? কাল একবার এসেছিল। ওরাও আজকাল দুগা পুজো করে, বলতে এসেছিল। বিশুকে দেখতে চাইছিল। এড়িয়ে গিয়েছি।
কিকিরা কপাল কুঁচকে চোখ ছোট করে ফকিরকে দেখছিলেন। দেখতে-দেখতে বললেন, “কিছু বলল?”
“না, সরাসরি কিছু বলল না। তবে হাবেভাবে বুঝিয়ে গেল, বিশুকে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়াই ভাল।”
“তুমি কিছু বললে না?”
“বলেছি। ঘুরিয়ে বলেছি। বিশুর যদি কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করে আমি তাকে ছেড়ে দেব না। আমার হাতে সে মরবে।” ফকিরের কটা চোখ ঝকঝক করে উঠল প্রতিহিংসায়।
কিকিরা তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নিলেন।”না, না, এখন মাথা গরম করে কাজ করার সময় নয়, ফকির। মাথা গরম করলে কিচ্ছু হবে না। ঠাণ্ডা মাথায় যা করার করতে হবে। তা ছাড়া তুমি ভাবছ কেন? অমূল্যদের হাতে যদি তেমন কোনো প্রমাণ থাকত, তবে তারা থানা-পুলিশ না করে বসে থাকত নাকি এতদিন?”
“সবই জানি, ভাই। আমার বরাতের দোষ, নয়ত আর কী বলব, বলো? আমি নিজেই বুঝতে পারি না, বিশু কেন, কার পাল্লায় পড়ে ঘোড়াসাহেবের কুঠিতে গেল? কী দরকার ছিল তার ওখানে যাবার?”
কিকিরা বললেন, “ছেলেমানষ, এত কি বুঝতে পেরেছিল!..যাক, সে পরে ভাবা যাবে। এখন অন্য ক’টা কাজের কথা বলি, শোনো।”
“বলো?”
“তোমার কাছে তোমাদের সাত-পুরুষের একটা বংশলতিকা গোছের কি আছে না?”
“আছে একটা। সাতও হতে পারে, দশও হতে পারে।”
“সেটা একবার পাঠিয়ে দিতে পারো না?”
“অনায়াসেই পারি।”
“তা হলে পাঠিয়ে দিও, এ-বেলাতে।…এবার আর একটা কথা বলল, তোমার বাবা কাকারা তিন ভাই ছিলেন তো?”
“হ্যাঁ। তিন ভাই দুই বোন।”
“অমূল্যের বাবা তোমার মেজো কাকা? ছোট কাকা মারা গেছেন। কবে তুমি জানো?”
“জানি বই কি। বছর বারো–হাঁ, মোটামুটি তাই হবে।”
“তুমি বলেছিলে, এখানে মারা যাননি।
“না। ছোটকাকার শেষের দিকে সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসী ভাব হয়েছিল। বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। কোথায় ঘুরে বেড়াত কে জানে! কেউ বলত শ্মশানে বসে সাধনা করে, কেউ বলত পঞ্চকোট পাহাড়ের তলায় ধুনি জ্বেলে বসে থাকে। আমরা সঠিক কিছু জানি না।”
“ছোটকাকা মারা গিয়েছেন, এটা কেমন করে জানলে?”
“একদিন এক গেরুয়া-পরা সন্ন্যাসী এসে খবর দিয়েছিল।”
“কী ভাবে মারা গিয়েছিলেন ছোটকাকা?”
“সাপের কামড়ে।”
“মৃতদেহ তোমরা কেউ দেখোনি তো?”
“না। বরাকর নদীতে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
“সেই কাকার কে কে আছে?”
“কাকিমা বেঁচে আছেন। কাকার ছেলেমেয়ে নেই। কাকিমা এখানে। কেন না। বহুকাল। বাপের বাড়ি কাশীতে সেখানেই থাকেন। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারেই নেই। তা তুমি এ-সব জিজ্ঞেস করছ কেন? সবই তো আগে শুনেছ।”
কিকিরা তারাপদর দিকে আঙুল তুলে দেখালেন, “তারাপদ শুনে রাখল।…যাক, তুমি একবার তোমাদের ওই বংশের লিস্টিটা পাঠিয়ে দাও। ভাল করে একবার দেখব। আর শোনো, আজ বিকেলে আমি আর তারাপদ একবার ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে যাব। তারাপদকে দেখিয়ে আনব কুঠিটা। তুমি কিছু ভেব না। আমরা সাবধানে যাব-আসব।”
.
০৫.
ফকির রায়দের বাড়ি থেকে ঘোড়া-সাহেবের কুঠি মাইল দুয়েকের পথ। মাঠঘাট ভেঙে গেলে সামান্য কম। ফকির চেয়েছিলেন, কিকিরাদের সঙ্গে নকুল যাক জিপ নিয়ে; কিকিরা রাজি হননি। জিপের দরকার নেই, মাঠ ভেঙে হাঁটাপথে তাঁরা চলে যাবেন। জিপ সঙ্গে থাকলে পাঁচজনের চোখ পড়বে, হাঁটাপথে বেড়াতে বেরুলে কে আর নজর করবে।
বিকেলে ছোট হয়ে আসছে, আলো থাকতে-থাকতেই কুঠিতে পৌঁছতে চান কিকিরা পড়ন্ত বেলার রোদ নিস্তেজ হয়ে আসার আগেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন তারাপদকে নিয়ে।
রোদ সরাসরি মুখে লাগায় সামান্য অস্বস্তি হচ্ছিল তারাপদর। নয়ত এই হাঁটাপথ তার ভালই লাগছিল এখানকার মাঠের চেহারা খানিকটা আলাদা, অনবরত উঠছে আর নামছে, যেন ঢেউ-খেলানো মাঠ, মাটির রঙ কোথাও কোথাও গেরুয়া রঙের হলেও বেশির ভাগটাই কালচে গোছের। পায়ে-পায়ে পলাশ-ঝোপ, আর আকন্দ। কিকিরা চিনিয়ে দিচ্ছিলেন ওটা শিশুগাছ, ওকে বলে অর্জুন।
কিকিরা যে এই অঞ্চলের অনেক কিছুই জানেন, বেশ বোঝা যাচ্ছিল। এমনকী, তিনি ঘোড়া-সাহেবের কুঠি যাবার মেঠো রাস্তাও বেশ চেনেন।
তারাপদ একবার ঠাট্টা করেই বলেছিল, “কিকিরা স্যার, ঠিক রাস্তায় নিয়ে যাবেন তো?”
কিকিরা জবাব দিয়েছিলেন, “চলো দেখবে, সব জায়গায় মাকা করে এসেছি।”
কথাটা ঠিকই। কদিন আগেই কিকিরা ফকিরের বাড়িতে এসে দশ-পনেরো দিন থেকে গিয়েছেন, তখন লোচনকে নিয়ে বার তিনেক এই হাঁটাপথেই ঘোড়া-সাহেবের কুঠিতে গিয়েছেন এসেছেন। অবশ্য কোথায় কী মাকা করে এসেছেন তিনিই জানেন।
মাঠ দিয়ে যেতে-যেতেই সামান্য তফাতে কয়লাখনিও চোখে পড়ছিল। লোহার উঁচু-উঁচু থাম, তার মাথায় বিশাল চাকা ঘুরছে, ডুলি উঠছে নামছে, কয়লার টব গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কুলি মজুর, এক-এক জায়গায় কয়লার পাহাড় জমে আছে, বাতাসে কেমন কয়লা-কয়লা গন্ধ।
বেশ খানিকটা রাস্তা এগিয়ে এসে গাছপালা ঝোপঝাড় পাওয়া গেল। ছায়াও ঘন। তারাপদ বলল, “স্যার, একটু জল খেয়ে নিই। আপনার বন্ধুর বাড়িতে যেভাবে খেয়েছি, তাতে গলা পর্যন্ত বুজে আছে এখনো।”
