আর খানিকটা পরে একেবরে ফরসা হবার মুখে-মুখে ফকিরের বাড়ি থেকে জনা-দুই লোক চলে এল।
দু’জনেই কিকিরার চেনা। লোচন আর নকুল। লোচন ফকিরদের বাড়ির কাজের লোক, বাইরের কাজকর্মগুলো সে করে; আর নকুল গাড়ির ড্রাইভার।
কিকিরার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দুজনে ভারী ট্র্যাংকটা তুলে নিল। বললে, গাড়িতে রেখে আবার আসছে।
তারাপদ কৌতূহলের সঙ্গে দু’জনকেই দেখছিল। দু’জনেই গড়নে-পেটনে তাগড়া। নকুল বেঁটে, বয়সেও কম, পঁচিশ হবে। একমাথা চুল, ভোঁতা মুখ। লোচনের বয়েস খানিকটা বেশি, বছর পঁয়ত্রিশ তো হবেই। মাথায় সে মাঝারি।
দু’জনে যেভাবে অক্লেশে ভারী ট্র্যাংকটা নিয়ে ওভারব্রিজে উঠতে লাগল, মনে হল এ-সব তাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার।
তারাপদ তারিফ করার গলায় বলল, “গায়ে বেশ ক্ষমতা তো?”
কিকিরা বললেন, “ওরা কি কলকাতার লোক হে, রোদে-জলে তেতেপুড়ে মানুষ। ওই নকুল সের দেড়েক ভাত নাকি একপাতে বসে খেতে পারে। বিশ-পঁচিশখানা রুটি হজম করা ওর কাছে কিছুই নয়।”
হাসল তারাপদ। ”খাইয়ে লোক।”
“শুধু খাইয়ে নয়, খুন-জখম করতেও ওস্তাদ।”
ঘাবড়ে গেল তারাপদ। “মানে? ও কি খুন-জখম করে বেড়ায়?”
“খুন করে কি না জানি না, তবে জখম করে। ফকিরের গাড়ি নকুলই চালায়। ফকির বড়-একটা দূরে কোথাও যায় না গাড়ি নিয়ে।”
“কেন?”
“এমনিতে তো শত্রুর অভাই নেই আজকাল। তার ওপর ব্যবসাপত্রের জন্যে দূরে যখন যেতে হয়, কাঁচা টাকা সঙ্গে থাকে। হয় আদায় করে ফিরছে, না হয় সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। রাত-বিরেত হয়ে যায়। এসব জায়গায় হামেশাই ডাকাতি হয়।”
“নকুল তা হলে ফকিরবাবুর বডিগার্ড?” তারাপদ বলল।
”খানিকটা তাই।”
ফরসার ভাব আরও বেড়ে গেল। এখন কাছাকাছি অনেক কিছুই চোখে পড়ছে স্পষ্টভাবে। তারাপদ স্টেশন, গাছপালা, প্ল্যাটফর্ম দেখছিল।
লোচন আর নকুল ফিরে এল।
জিনিসপত্র উঠিয়ে চারজনেই এবার এগিয়ে চলল ওভারব্রিজের দিকে।
তারাপদ হাঁটতে হাঁটতে গন্ধ শুকছিল। সকালের গন্ধ। গাছগাছালি থেকে কী সুন্দর গন্ধ উঠছে এই সকালে, বনতুলসীর ঝোপ বাঁ দিকে, তারই সামান্য তফাতে মাঠ। ওভারব্রিজের বাঁ দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকালে কিছুটা দূরে কয়লার স্তূপ চোখে পড়ে, সেই কয়লার একটা কাঁচা গন্ধও যেন বাতাসে মেশানো রয়েছে।
“এ-দিকে হে,” কিকিরা তারাপদকে ডান দিকে টানলেন।
ওভারব্রিজের ডান দিক দিয়ে নিচে নামলেই স্টেশনের কম্পাউন্ড। একটা জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাই যায় ফকিরবাবুর জিপ। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বেশ পুরনো কাজ-চালানো গোছের গাড়ি।
স্টেশনের দোকানপত্র এক-এক করে খোলার তোড়জোড় চলছিল। চায়ের স্টলের সামনে উনুনে ধোঁয়া উঠছে, দুটো কুকুর ঘুমিয়ে রয়েছে, একপাশে, বারোয়ারি কলকতলায় নিমের দাঁতন হাতে একটি কুলি দাঁড়িয়ে আছে।
তারাপদ বলল, “এক কাপ চা খেয়ে নিলে হত না?”
“বেশ তো, চলো,” কিকিরা বললেন, “আমারও হাই উঠছে।” বলেই লোচনকে ডাকলেন, “লোচন, চা-সেবা হবে নাকি? তোমরা মালগুলো রেখে এসো।”
স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন কিকিরা। চায়ের কথা বললেন।
চা-অলা সকালের বউনির জন্যে মন দিয়ে চা করতে লাগল।
”কেমন লাগছে, তারাপদ?”
“ভালই লাগছে।”
“খানিকটা ভেতর দিকে চলো, আরও ভাল লাগবে। একসময় বড় সুন্দর জায়গা ছিল–এখন কোলিয়ারি আর কয়লা সব গিলে খাচ্ছে। গাছপালা, মাঠঘাট কতটুকু আর আছে!”
চা তৈরি হল। কিকিরা লোচনদের ডাকলেন।
খানিকটা সঙ্কোচ বোধ করলেও লোচনরা কাছে এল, চায়ের খুরি হাতে নিয়ে আবার জিপগাড়ির দিকে চলে গেল।
তারাপদ আর কিকিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগলেন।
তারাপদ হঠাৎ বলল, “ফকিরবাবুর জিপ দেখে মনে হচ্ছে, ওটারও ঘুম ভাঙেনি।” বলে হাসল।”কেমন ময়লা দেখছেন?”
কিকিরা বললেন, “কোলিয়ারির গাড়ি ওই রকমই হয় হে, এ কি তোমার কলকাতা? কয়লার দেশ। চলো না রাস্তাঘাটের চেহারা দেখবে।”
জিপগাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তারাপদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “ফকিরাবুর কি ওই একটিই ছেলে?”
“দুটি ছেলে, একটি মেয়ে। বড় বিশু–মানে বিশ্বময়; ছোট, অংশু। মেয়ে সকলের ছোট। পৃর্ণিমা। বড় মিষ্টি দেখতে! ফকিরের ছেলেমেয়েদের সকলকেই দেখতে সুন্দর। ফকির নিজেও দেখতে সুপুরুষ ছিল। গ্রামে যাত্রাপার্টি করেছিল ফকির, রাজাটাজা সাজত।” কিকিরা হাসলেন।
চা খাওয়া শেষ করে তারাপদ আবার একটা সিগারেট ধরাল। একটা কথা সে স্পষ্টই বুঝতে পারছিল কিকিরা ফকিরের বাল্যবন্ধু শুধু নন, ফকিরকে তিনি ভালবাসেন। কিকিরার কথাবার্তা বলার ধরনে সেটা বোঝা যায়।
পয়সা মিটিয়ে দিয়ে কিকিরা বললেন, “চলো, যাওয়া যাক।”
কিকিরা আর তারাপদকে সামনেই বসিয়ে নিল নকুল। পেছনে মালপত্র সমেত লোচন।
স্টেশনের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গাড়ি ডান দিকে ঘুরল।
তারাপদর ভালই লাগছিল। কিকিরা মিথ্যে বলেননি। জিপ মিনিট দশেক ধরে চলছে, সকালও হয়ে গিয়েছে, রোদ উঠল এইমাত্র, রাস্তা ভাল নয়, কিন্তু চারপাশে কত রকম দৃশ্য ছড়িয়ে আছে। মস্ত-মস্ত নিমগাছ, বট, ছোট-ছোট কুঁড়ে, সাঁওতাল গোছের মেয়ে-পুরুষ চোখে পড়ছে, মুরগি চরছে কুঁড়ের সামনে, কুকুর, হঠাৎ খানিকটা জায়গায় ধানের খেত, তারপরই নেড়া মাঠ, কোথাও সামান্য জল জমে রয়েছে পুকুরের মতন, শালুক ফুল ফুটছে, আবার দূরে তাকালে কোলিয়ারির পিটও দেখা যাচ্ছে।
