দেখছিল তারাপদ। জায়গা বেশ শুকনো, পানা-পুকুর কিংবা বাঁশঝাড় চোখে পড়ে না। বরং পলাশ-ঝোপ আর কুল-ঝোপই বেশি চোখে পড়ে। হ্যাঁ, একপাশে অনেক কাশফুল ফুটে আছে। বাতাসে দুলছে। চোখ জুড়িয়ে যায়।
জিপ আরও খানিকটা এগিয়ে বাঁ দিকে ঘুরল।
কিকিরা বললেন, “আর তিন-চার মিনিট।”
তারাপদর হঠাৎ ঢাকের আওয়াজ কানে এল। কোথায় যেন ঢাক বেজে উঠল। এই বাজনা একেবারেই আলাদা, কলকাতার মতন নয়, কানে বড় মিষ্টি লাগছিল। মনে পড়ল আজ সপ্তমী পুজো। কলকাতায় থাকলে তারাপদ এতক্ষণে বটুকবাবুর মেসে পড়ে-পড়ে ঘুমোত। আর এখানে সে চোখ চেয়ে-চেয়ে সব দেখছে ওই যে কত বড় ধানখেত, সবুজ হয়ে রয়েছে, মাথা দুলছে ধানের শিষের; ওই দেখো কত বিরাট এক পুকুর আর্ট-দশটা আমগাছ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ছোট্ট এক টুকরো খেত, সবজি ফলেছে। চোখ যেন জুড়িয়ে গেল তারাপদর। আকাশ রোদে রোদে ভরে উঠছে, পাখি উড়ে যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে সাঁতরে।
কেমন যেন ঘোর এসেছিল তারাপদর, আচমকা জিপগাড়ির হর্নে চমকে উঠল। তারপরই দেখল, দোতলা এক বিরাট বাড়ির সামনে এসে তাদের গাড়ি থামল। ওই বাড়িরই গালাগানো ঠাকুর-দালান থেকে ঢাকের শব্দ আসছে।
কিকিরা নেমে পড়লেন। তারাপদ আগেই নেমেছে।
”ফকিরদের বাড়ি,” কিকিরা বললেন, “আদি বাড়ি।”
বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় একালের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, পুরনো টঙ, পুরনো ছাঁদ। কলকাতায় চিতপুরের গলির মধ্যে, বউবাজারের এ-গলি ও-গলিতে এই ছাঁওদর বাড়ি দেখেছে তারাপদ। সামনের দিকে কোনো ভাঙচুর নেই, একেবারে সটান, লম্বার দিকটা বেশি, বড়বড় থাম, মোটা পাঁচিল, খড়খড়িকরা দরজা জানালা। রং-চং তেমন কিছু চোখে পড়ছিল না।
লোচন আর নকুল জিনিসপত্র নামাতে লাগল।
তারাপদ জিজ্ঞেস করল, “এবাড়ি কত কালের?”
“সামনের দিকটা অনেককালের। শ খানেক বছরের। পেছনের দিকটা পরে হয়েছে–ফকিরের বাবা কাকারা করেছিলেন। তাও সেটা ধরো বছর পঞ্চাশ-ষাট আগেকার।”
“ঠাকুর-দালান বাইরে কেন?”
“অন্দরমহল আলাদা রাখার জন্যে। গ্রামের লোকজন আসে যায়, দু-চারটে দোকানও বসে, তার ওপর এই যাত্রা–এ-সবের জন্যে বোধহয়। ভেতরেও ফকিরদের গৃহদেবতার ঘর রয়েছে।”
কথা বলতে বলতে তারাপদ কিকিরার সঙ্গে ভেতরে এল। এসে অবাক হয়ে গেল। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না যে, ভেতরটা স্কুল বাড়ির মৃতন। মাঝখানে মস্ত চাতাল-অনায়াসেই টেনিস খেলা যায়–এত বড়সড় ফাঁকা জায়গা। আর চারদিক ঘিরে ফকিরের বাড়ি। সবটুকুই প্রায় দোতলা, শুধু একপাশের খানিকটা একতলা। দোতলার বারান্দা আর রেলিং দেখা যাচ্ছিল।
এক-তলার দিকটা আঙুল দিয়ে দেখালেন কিকিরা।”ওই আমাদের আস্তানা। বাইরের লোকজন এলে ওখানে থাকে।”
“কিন্তু আপনি তো বাইরের লোক নন, স্যার।”
“না, ঠিক সেভাবে নই, তবে যেখানের যা আচার। আমি যখনই আসি, ওখানে থাকি।”
“আসেন মাঝে-মাঝে?”
“আসি। ফকির আমার নিতান্ত বন্ধুই নয়, ভাইয়ের মতন।”
তারাপদ আর কিছু বলল না।
প্রায় গোটা বাড়ি পাক দিয়ে তারাপদ নিজেদের জায়গায় এসে পৌঁছল। ততক্ষণে লোচনেরা ঘর খুলে দিয়েছে। জিনিসপত্রও রাখছে নামিয়ে। ফকিরদের বাড়ির লোকজনের গলা পাওয়া যাচ্ছিল। দু-একজনকে দেখাও গেল।
ঘরে ঢুকে তারাপদ থমকে দাঁড়াল। তাকাল চারপাশ। তারপর বলল, “বাঃ! বেশ ঘর তো।”
পছন্দ হবার মতনই ঘর। বড়সড়। বিরাট-বিরাট জানলা। কাচের শার্সি আর খড়খড়ি দুইই রয়েছে। দরজা-জানলা সবই ভোলা। বাইরে গাছপালা, বাগান। রোদ নেমেছে বাগানে।
কিকিরা বললেন, “এটা আমার ঘর; তোমারটা পাশে। “
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “এত বড়বড় ঘরে মাত্র একজনের থাকার ব্যবস্থা?”
হাসলেন কিকিরা। বললেন, “একেই বলে বনেদিয়ানা। ফকিরলাটের ব্যাপার?” বলে আবার হাসলেন, “আমরা ফকিরের বড়লোকি দেখে ওকে ঠাট্টা করে লাট বলতাম।”
তারাপদ আসবাবপত্র দেখছিল। যা যা প্রয়োজন, সবই গোছানো।
লোচনরা গেল পাশের ঘর খুলতে।
তারাপদ ঘরের বাইরে দিকের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল। এ-দিকটায় বাগান। গাছগাছালি কম নয়। এখনো ঢাক বাজছে। শিউলি ফুলের গন্ধও পাচ্ছিল তারাপদ।
হঠাৎ বিশ্রী কানফাটা আওয়াজে চমকে উঠল তারাপদ। সঙ্গে-সঙ্গে সরে গেল একপাশে। গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ। ফাঁকায় অনেকটা ছড়িয়ে গিয়েছে শব্দটা। কাক ডাকছে, পাখিরা ভয় পেয়ে ডেকে উঠল। উড়তে লাগল গাছপালার মাথায়।
কিকিরা চেঁচিয়ে বললেন, “দরজার কাছ থেকে সরে এসো।”
তারাপদ সরে গেল। আর কোনো শব্দ হল না।
.
০৪.
হাত-মুখ ধুয়ে কিকিরা আর তারাপদ চা খেতে বসেছে, লোচন এসে বলল, কতাবাবু আসছেন।
তারাপদর মনটাই বিগড়ে গিয়েছিল। সপ্তমী পুজোর সকালটা শুরু হয়েছিল ভাল, চমৎকার লাগছিল তারাপদর, চোখ জুড়িয়ে আসছিল, ঝরঝরে লাগছিল শরীর-মন, হঠাৎ কোত্থেকে একটা বন্দুক ছোঁড়ার আওয়াজে সব নষ্ট হয়ে গেল। কে বন্দুক ছুড়ল, কেনই বা ছুড়ল, তাও বোঝা গেল না।
কিকিরা বললেন, “দেখো তারাপদ, বন্দুক যেই ছুড়ক, আমাদের লক্ষ করে ছোড়েনি। তা যদি ছুড়ত তবে আগেই ছুড়ত। জিপে করে যখন আসছিলাম। বাড়িতে পৌঁছানোর পর কেন আমাদের দিকে নজর দেবে? ওটা অন্য কিছু। ফকির আসুক, জানা যাবে।”
যুক্তিটা তারাপদও স্বীকার করল। মন কিন্তু বিগড়েই থাকল।
