“ওই বাড়ির দোতলায় একজন খুন হয়েছে।”
“খুন হয়েছে?” তারাপদ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কিকিরার দিকে। কিকিরা বললেন, “খুন হয়েছে, কিন্তু যে-খুন হয়েছে, তাকে ঘরে কিংবা নিচে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুন হবার পর সে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে।”
তারাপদ বলল, “তা আবার হয় নাকি?”
“হয় না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা।”তুমিও জানো হয় না, আমিও জানি হয় না। কিন্তু ফকিরের বড় ছেলে বলছে, সে স্বচক্ষে খুন দেখেছে।”
তারাপদ বিশ্বাস করল না। বলল, “সে কেমন করে বলছে? খুনের সময় সে ছিল সামনে?”
“হ্যাঁ, ছিল।”
“বয়েস কত ছেলেটির?”
“বছর কুড়ি-একুশ। ফকিরদের সব অল্পবয়সে বিয়ে-থা হত। কাজেই, তার বড় ছেলে এখন সাবালক।”
তারাপদর সন্দেহ হল। বলল, “ছেলেটার মাথায় গোলমাল নেই তো?”
“আগে ছিল না। এই ঘটনার পর হয়েছে। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। ভূতে পেলে যেমন হয়।”
তারাপদ ঠিক ধরতে পারল না।”কেন?”
“ভয়ে।” বলে একটু থেমে কিকিরা বললেন, “ওর মাথায় ঢুকেছে, পুলিস ওকে ধরবে। এটা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ।”
“উদ্দেশ্য?”
“উদ্দেশ্য নানা রকম হতে পারে। তবে একটা উদ্দেশ্য, ফকিররা যেন আর ঘোড়া-সাহেবের কুঠির দিকে নজর না দেয়।”
“তার মানে–” তারাপদ বলল, “ফকিরের খুড়তুতো ভাইরা প্যাঁচ মেরে কুঠিটা বাগাবার চেষ্টা করছে?”
“ভাইরা নয়, ভাই। খুড়তুতো এক ভাইকে নিয়েই গোলমাল। ফকির তাই বলে।”
তারাপদ কিছুক্ষণ যেন কিছু ভাবল, তারপর বলল, “একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছি না। খুনই যদি হবে, তবে তো সেটা পুলিশকে জানানো হয়েছে। আর পুলিশ যদি জানে, তারা তো মুখ বুজে থাকবে না। ফকিরের ছেলেকেই বা ধরবে কেন?”
কিকিরা পকেট থেকে নস্যির ডিবে বার করলেন। বাহারি চৌকোনো ডিবে। তারাপদ আগে কখনো কিকিরাকে নস্যি নিতে দেখেনি। অবাক হল। কিছু অবশ্য বলল না।
নস্যির টিপ নাকের কাছে ধরে আস্তে আস্তে টানলেন কিকিরা। বললেন, “মজাটা তো সেইখানে, তারাপদবাবু! যে খুন হয়েছে তাকে যদি জলে-স্থলে খুঁজে না পাওয়া যায়–তবে পুলিসের কাছে কে প্রমাণ করবে, অমুক লোক খুন হয়েছে। বড় জোর বলতে পারে–আমাদের অমুক লোক বেপাত্তা হয়েছে। ফকিরের খুড়তুতো ভাই পুলিসে যায়নি, যেতে পারছে না–শুধু এই কারণেই। প্রমাণ কী খুনের? কিন্তু থানায় না গিয়ে আড়ালে থেকে ফকিরকে চাপ দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে, আর তার ছেলেটাকে তো আধ পাগলা করে তুলেছে। বুঝলে?”
“কিন্তু ফকিরের ছেলে তো খুনি নয়।” তারাপদ বলল।”
“সে বলছে, নয়। কিন্তু অন্যপক্ষ যদি প্রমাণ করতে পারে, ফকিরের ছেলে খুনি-তা হলে!”
তারাপদ কিছু বুঝল, কিছু বুঝল না। বলল, “ভাল বুঝলাম না।”
“মুখে শুনে এর বেশি কিছু বুঝবে না। জায়গায় চলো; থাকো কয়েকদিন। ওদের সবাইকে চোখে দেখো–তখন বুঝতে পারবে।”
কিকিরা জল খাবার জন্যে উঠলেন। ওয়াটার বটল ঝুলছিল একপাশে।
জল খেয়ে আরামের শব্দ করলেন কিকিরা। “একটু গড়িয়ে নেওয়া যাক, কী বলো?”
তারাপদ বলল, “নিন।”
“একেবারে ভোরের মুখে কালীপাহাড়ি পৌঁছব। তুমিও শুয়ে পড়ো।”
তারাপদর আবার হাই উঠল। সারাটা দিন কম হুড়োহুড়ি যায়নি। একবার চন্দনের কাছে, তারপর অফিস, অফিস থেকে ফিরে কিছু কেনাকাটা, সেখান থেকে কিকিরার বাড়ি। চরকিবাজি চলছে আজ।
হাই-জড়ানো গলায় তারাপদ বলল, “আমি কিন্তু মড়ার ঘুম ঘুমোব। আপনি সময়-মতন ডাকবেন।”
কিকিরা বললেন, “তুমি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোও।”
.
০৩.
তখনো ভোর হয়নি, সাদাটে ভাব ফোটেনি আকাশে, গাড়ি এসে কালীপাহাড়ি স্টেশনে পৌঁছল। কিকিরা খানিকটা আগেই তারাপদকে ঘুম থেকে ডেকে দিয়েছিলেন।
স্টেশনে গাড়ি থামতেই দু’জনে মালপত্র সমেত নেমে পড়ল। তারাপদর লাগেজ বলতে একটা সুটকেস আর কাঁধ-ঝোলা। কিকিরার সঙ্গে ছিল কালো রঙের এক ট্রাভেলিং ট্র্যাংক, গোটা-দুই বেয়াড়া সুটকেস। ট্র্যাংকটা যে কেন সঙ্গে নিয়েছেন কিকিরা, তারাপদর মাথায় আসছিল না। কলকাতায় তারাপদ জিজ্ঞেস করেছিল, “এই গন্ধমাদনটা আপনি কেন নিচ্ছেন? ওঠাতে-নামাতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে।” কিকিরা খানিকটা রহস্য করে জবাব দিয়েছিলেন, “ওটায় আমার ধনদৌলত থাকে, বাপু। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি।” তারাপদ আর কিছু বলেনি।
প্ল্যাটফর্মে নেমে তারাপদ বলল, “এখনো রাত রয়েছে।”
“আরে না, দেখতে-দেখতে ফরসা হয়ে যাবে।”
স্টেশনে লোক কিন্তু খুব একটা কম নামল না। বেশির ভাগই গাঁ-গ্রামের মানুষ। প্ল্যাটফর্মে তখনো বাতি জ্বলছে।
এমন বিদঘুটে সময় যে, কুলিও জুটছিল না। কোনো রকমে দুজনে মালপত্র প্ল্যাটফর্মে নামাতে পেরেছে। এখন সকাল না-হওয়া পর্যন্ত হাঁ করে বসে থাকা।
“আপনার বন্ধুর বাড়ি থেকে তোক আসবে না?” তারাপদ বলল।
“আসবে। এত ভোর-ভোর আসা, একটু দেরি হচ্ছে বোধহয়।”
“আমরা তা হলে কী করব?”
“এখানে বসে থাকি খানিকক্ষণ।”
তারাপদর গা শিরশির করছিল। শরঙ্কাল। ভোর হয়ে আসার আগের মুহূর্ত। এই সময় গা শিরশির করাই স্বাভাবিক। ওভারব্রিজের বাঁ দিকে মন্ত-মস্ত গাছ। ডান দিকে ঘরবাড়ি। আসলে, স্টেশনটা নিচে, দু পাশে বালিয়াড়ির মতন উঁচু জমি।
একটা সিগারেট ধরিয়ে তারাপদ কাছাকাছি পায়চারি করতে লাগল। বেশ লাগছে ঠাণ্ডা বাতাস, একটু হিম-হিম ভাব রয়েছে। আকাশ সাদা হয়ে আসছে বোধ হয়। কিকিরা ঠিকই বলেছিলেন।
