“মানে এখনো বেশ আছে?”
“ওদের কাছে বেশ নয়, তোমার আমার কাছে যথেষ্ট।”
“গোলমালটা কেথায়?”
“মুখে শুনলে গোলমালটা ভাল বুঝতে পারবে না। চোখে দেখলে আঁচ করতে পারবে খানিকটা। তা হলেও ঘটনাটা ছোট করে শুনে রাখো।” কিকিরা একবার মুখ ফিরিয়ে বাইরেটা দেখে নিলেন। আবার স্টেশন এসে গেল। বললেন, “ফকিরদের বিষয়-সম্পত্তি এখন একরকম ভাগ-বাঁটরা হয়ে গিয়েছে। যে-সব সম্পত্তি কেউ কাউকে ছাড়তে রাজি নয়, তাই নিয়ে কোর্ট কাছারি চলছে। এইরকম এক সম্পত্তি ঘোড়া-সাহেবের কুঠি।”
“ঘোড়া-সাহেবের কুঠি? সেটা আবার কী?”
“একটা বাড়ি। যেমন-তেমন বাড়ি অবশ্য নয়; দুর্গ বলতে পারো। পাথরের তৈরি। এক-একটা পাথর হাতখানেকের বেশি লম্বা। চওড়াও আধ হাত।“
“কী পাথর?”
“এমনি পাথর, সাধারণ। পাথরের বাড়ি দেখোনি?”
তারাপদ ঘাড় হেলাল। দেখেছে।
গাড়ি থামল। সামান্য থেমে আবার চলতে শুরু করল।
তারাপদ বলল, “বলুন তারপর। ঘোড়া-সাহেবটা কে?”
কিকিরা বললেন, “অনেকদিন আগেকার কথা বলছি। তা ধরো বছর পঞ্চাশ তো বটেই। তখন ব্রিটিশ রাজত্ব। এ-দিককার অনেক কোলিয়ারির মালিকানা ছিল সাহেবদের। ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার বেশির ভাগই ছিল সাহেব। ওয়েলকাম কোলিয়ারিজ বলে একটা কোম্পানি ছিল সাহেবদের। এদিকে তাদের ছোট-বড় অনেকগুলো কয়লাকুঠি ছিল। ফারকোয়ার সাহেব বলে এক সাহেব ছিল। সে-ই কয়লাকুঠিগুলোর সর্বেসর্বা। এজেন্ট অ্যান্ড জেনারেল ম্যানেজার। ঘোড়া-সাহেবের কুঠি ছিল তাঁর বাংলো আর অফিস দুই-ই।”
“তা ঘোড়া-সাহেব নাম হল কেন?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“সাহেবের ঘোড়া বাকি ছিল। আস্তাবল ছিল বাংলোয়, ঘোড়া রাখতেন, ঘোড়ার তদ্বির করার জন্যে লোজন থাকত। সাহেব নিজে প্রায়ই ঘোড়ায় চড়ে সকাল-বিকেল টহল মারতেন। তাই লোকে নাম দিয়েছিল ঘোড়া-সাহেব।”
তারাপদ মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা যেন সহজ হল এতক্ষণে। বলল, “ঘোড়া-সাহেবের বাড়ি আপনি দেখেছেন?”
“দেখেছি বই কি! আমাদের ছেলেবেলায় ওটা দেখার মতন জিনিস ছিল। ধরো, কলকাতায় যেমন মনুমেন্ট। সবাই অন্তত একবার তাকিয়ে দেখে। ঘোড়া-সাহেবের কুঠি দেখা ছিল সেইরকম। ওখানকার মানুষ, গাঁ-গ্রামের লোক, কোলিয়ারির লোকজন, সবাই দেখত। বাইরে থেকেই। বিঘে আট-দশ জমি, মস্ত পাঁচিল, নানা রকম গাছগাছালি, ফুলের বাগান, মধ্যিখানে দোতলা বাংলো ঘোড়া-সাহেবের। পাশেই ছিল নালার মতন এক নদী, নুনিয়া। বর্ষায় জল থাকত, অন্য সময় শুকনো।…তা আমাদের যখন বাচ্চা বয়েস, তখন ঘোড়া-সাহেব বুড়ো হয়ে পড়েছেন। তিনি আর বেশিদিন থাকেননি, নিজের দেশে ফিরে গেলেন। অন্য কে একজন এল, তার নাম মনে নেই।”
“আপনিও কি কালীপাহাড়ির লোক?”
“না না, লোক নই। আমার মামা কাজ করত একটা কোলিয়ারিতে। মাঝে মাঝে মামার বাড়ি গিয়ে থাকতাম। আর ফকিরের সঙ্গে আমার ভাব স্কুলে। আমি শহরের স্কুল-বোর্ডিংয়ে থেকে পড়তাম, ফকির আসত বাড়ি থেকে।”
তারাপদ এবার একটা সিগারেট ধরাল।”তারপর বলুন, কী হল?”
কিকিরা বললেন, “ওয়েলকাম কোম্পানির সুদিন ফুরলো। ঘুষিকের দিকের একটা কোলিয়ারিতে বিরাট এক অ্যাকসিডেন্ট হল। আরও পাঁচরকম গোলমাল। ওয়েলকাম কোম্পানি তাদের কোলিয়ারি বেচে দিতে লাগল। দু-একটা করে। ঘোড়াসাহেবের কুঠি ফাঁকা হয়ে গেল। মারোয়াড়ি, কচ্ছিরা কোলিয়ারি কিনে নিতে লাগল। এক বাঙালি ভদ্রলোকও কিনলেন একটা। তিনিই ওই ঘোড়াসাহেবের কুঠিটা কিনেছিলেন। বাগান-টাগানের বেশির ভাগই তখন নষ্ট। কিন্তু সেই ভদ্রলোক বেশিদিন বাঁচেননি। অ্যাকসিডেন্টে মারা গেলেন। তখন ফকিরদের উঠতি সময়, টাকা আসছে বস্তা বস্তা। ফকিরের বাবা আর কাকা বেশ সস্তায় ওই কুঠি সেই ভদ্রলোকের স্ত্রীর কাছ থেকে কিনে ফেললেন। কেন যে কিনলেন নিজেরাও জানেন না। পয়সা আছে, লোকের কাছে চাল দেখাতে হবে বলেই বোধ হয়। ওই কুঠিতে কেউ কিন্তু থাকতে যায়নি। খানিকটা ভয়ে, খানিকটা দরকার পড়েনি বলে। ঘোড়া-সাহেবের কুঠি ধীরে ধীরে জঙ্গল হয়ে আসতে লাগল। ফকিরের বাবা কাকা একসময়। এক একরকম প্ল্যান করতেন বাড়িটাকে নিয়ে। কাজে কিছুই করতেন না। শেষে ফকিরদের মন্দ দিন এল। মারা গেলেন ফকিরের বাবা। বছর কয় পরে মেজকাকা। ফকিররা সব সেয়ানা হয়ে উঠেছে ততদিনে, জমিজমা ব্যবসাপত্র দেখছে। শরিকের ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। সেটা আর থামল না। পরিবার আলাদা হল, ভাঙল, বিষয়সম্পত্তি ভাগাভাগি হতে লাগল, মামলা ঝুলতে থাকল মাথায়।” কিকিরা একটু থামলেন। আবার বললেন, “ফকিরের নিজের ছোট ভাই তার সব বেচেবুচে বিদেশে চলে গেছে। কাকার ছেলেদের মধ্যে ছোটজন পুরীতে থাকে। ব্যবসা করে হোটেলের।”
প্যাসেঞ্জার গাড়িটা আপন খেয়ালে চলছে। থামছে, চলছে, আবার থামছে। লোকও উঠছে নামছে কম নয়।
তারাপদ বার দুই হাত তুলল। বলল, “ঘোড়া-সাহেব কুঠির ইতিহাস তো শুনলাম। কিন্তু গণ্ডগোলটা কী নিয়ে?”
কিকিরা বললেন, “গণ্ডগোল বাড়িটা নিয়ে। ফকিররা বাড়িটা তাদের বলে দাবি করছে, আবার তার খুড়তুতো ভাই বলছে, বাড়ি তাদের।”
“এটা তো মামলা-মকদ্দমা করে ঠিক করতে হবে। বাড়িটা কাদের! তাই না?”
“হ্যাঁ, সেই রকমই। কিন্তু এর মধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে গিয়েছে।”
“কী কাণ্ড?”
