রসিকতা করে তারাপদ বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার তাতে।”
কিকিরা জোরেই হাসলেন। হাসি সামলে বললেন, “এবার কাজের কথা বলি। কাল রাত্রের প্যাসেঞ্জারে আমরা যাচ্ছি। তুমি গোছগাছ করে আমার বাড়িতে সন্ধের মধ্যে চলে আসবে। আর চন্দনের সঙ্গে কাল সকালে দেখা করে বলবে, সে কবে যেতে পারবে?”
“চাঁদু পারবে না।”—
“কেন?”
“অনেক কষ্টে দিন চারেক ছুটি ম্যানেজ করেছ; বাড়ি যাবে মা-বাবার কাছে।”
“বেশ তো, বাড়ি থেকে ফিরে এসে যাবে।”
“ওর হসপিটাল-ডিউটি নেই?”
“তুমি বড় বাগড়া দাও। বেশ, স্যান্ডেল-উডকে বলল, কাল আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে। দুপুরের পর আমি থাকব। বুঝলে? সকাল আমাকে পাবে না। দুপুরের পর পাবে।”
“বলব।”
“ব্যস, তা হলে ওঠো। কাল দেখা হবে।”
”আপনি কিন্তু ব্যাপারটা বললেন না?”
“অত অধৈর্য হচ্ছ কেন? কাল ট্রেনে যেতে-যেতে বলব।” কিকিরা উঠলেন।
তারাপদকেও উঠতে হল।
পা বাড়িয়ে কিকিরা বললেন, “একটা ব্যাপার বেশ মন দিয়ে ভেবো তো! তেতালার সমান উঁচু থেকে একটা লোক যদি লাফিয়ে পড়ে, সে মাটিতে-না পড়ে আর-কোথায় যেতে পারে? হাওয়ায় কি মিলিয়ে যাওয়া যায়।”
তারাপদ কিছুই বুঝল না।
.
০২.
ষষ্ঠীপুজোর দিন হাওড়া স্টেশনে পা দেয়, কার সাধ্য। ভিড়ে-ভিড়াক্কার, থিকথিক করছে মানুষ। রাশি রাশি মালপত্র। পায়ে-পায়ে কুলি। হাজার কয়েক লোক একই সঙ্গে কথা বলছে, চেঁচাচ্ছে, দৌড়ঝাঁপ করছে। দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়।
কিকিরা বুদ্ধি করে প্যাসেঞ্জারের টিকিট কিনেছিলেন। রাত্রের দিকে প্রায় শেষ ট্রেন। যারা যাবার তারা মেলে, এক্সপ্রেসে, পূজা স্পেশ্যালে চলে যাবার পর ঝড়তি-পড়তি ভিড়টা পড়ে ছিল মোগলসরাই প্যাসেঞ্জারের জন্যে। মামুলি যাত্রী ছাড়া এ-গাড়িতে কেউ চড়ে না। তবু ভিড় কম হল না।
একেবারে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনেছিলেন কিকিরা। একটু আরামে যেতে চান আর কী! বললেন, “ক ঘণ্টার নবাবি করে নিচ্ছি, বুঝলে তো, তারাপদ। প্যাসেঞ্জারের ফার্স্ট ক্লাস–তাও কালীপাহাড়ি পর্যন্ত। আমাদের মতন বাবুর এইটুকুই দৌড়।”
চার বার্থের কামরা। কিকিরা আর তারাপদ ছাড়া অন্য দুজনই অবাঙালি। একজন হলেন, বিশাল চেহারার এক পঞ্জাবি ভদ্রলোক, যাবেন বর্ধমান পর্যন্ত। অন্যজন বোধহয় আসানসোলের কোনো ব্যবসাদার, প্রচুর লটবহর নিয়ে উঠেছেন গাড়িতে, মারোয়াড়ি। কিকিরার সঙ্গে মালপত্র তেমন বেশি না হলেও একটা বড়সড় ট্রাংক রয়েছে।
গাড়ি ছাড়ার পর বিশাল চেহারার পঞ্জাবি ভদ্রলোক সটান শুয়ে পড়লেন, সঙ্গে একটা অ্যাটাচি ছাড়া কিছু নেই। মারোয়াড়ি ভদ্রলোক গন্ধমাদন নিচে রেখে, ওপরে বসলেন, পা ঝুলিয়ে। সামান্য আলাপ-পরিচয়ের চেষ্টাও করলেন, কিকিরা তেমন উৎসাহ দেখালেন না।
ঘেমে প্রায় নেয়ে উঠেছিল তারাপদ। হাতমুখে জল দিয়ে এসে রুমাল ঘাড় গলা মুছে জলের বোতল খুলে জল খেল।
কিকিরা বসে ছিলেন নিচের বার্থে।
গাড়ি চলতে শুরু করার পর বাতাস আসছিল। রাত হয়েছে। বাতাস ঠাণ্ডা।
কিছুক্ষণ দুজনেই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে শরীরটা জুড়িয়ে নিলেন।
কিকিরাই কথা বললেন প্রথমে। বললেন, “চন্দন বলেছে, বাড়ি থেকে ফিরে এসে দিন-দুই হাসপাতাল করবে। তারপর ডুব দিতে পারবে।”
তারাপদ বলল, “জানি। ওর ডাক্তারির আপনিই বারোটা বাজাবেন’।”
“কে বলল! চাঁদুবাবুর হাসপাতাল তো আর মাস-দুই পরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারপর বাবুকে চরে বেড়াতে হবে।”
ঠাট্টা করে তারাপদ বলল, “আপনার সঙ্গে চরবার প্ল্যান করেছে নাকি?”
হাসলেন কিকিরা।
কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টার কথা হল। গাড়ির ভেতরে গুমোটভাব ছিল, সেটাও কেটে গিয়েছে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসে। লিলুয়ায় গাড়ি থেমে আবার চলতে শুরু করেছে।
তারাপদ বলল, “কালীপাহাড়িতে তো নিয়ে চললেন কিকিরাস্যার; কিন্তু কেন নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা এবার বলুন।”
“বলছি, বলছি” কিকিরা পা তুলে আরাম করে বসলেন।” তোমাদের কোথাও নিয়ে গেলেই রহস্যের গন্ধ পাও, তাই না?”
ঠাট্টার গলায় তারাপদ বলল, “তা পাই। কেন পাব না, বলুন। আপনি কিকিরা দি ওয়ান্ডার! মিস্টিরিয়াস ম্যাজিশিয়ান।”
কিকিরা বললেন, “তা হলে শোনো। একটু গৌরচন্দ্রিকা গেয়ে শুরু করি?”
“করুন।”
সামান্য চুপ করে থেকে কিকিরা শুরু করলেন, “আমার এক বন্ধু আছে ছেলেবেলার। আগেই তো বলেছি, একেবারে অল্প বয়েসের বন্ধু। তার নাম ফকিরচন্দ্র রায়। আমরা বলতাম ফকির। ফকিররা দু-তিন পুরুষ ধরে কালীপাহাড়িতে থাকে। নামে ফকির হলেও ওরা মোটামুটি ধনী লোক। এক সময়ে জমিজমাই ছিল ওদের সব, সে ওর ঠাকুরদার আমলে। বাবার আমলে জমি-জায়গা ছাড়াও কোলিয়ারিতে নানা রকমের কনট্রাকটারি ধরেছিল। তাতে আরও ফেঁপে ফুলে ওঠে। বিস্তর পয়সা এলে যা হয়–শবাবিতে ধরে যায়, ফকিরদেরও তাই হল, নবাবিতে ধরল। পয়সা ওড়াতে লাগল চোখ বুজে। কিন্তু ওই যে বলে, চিরদিন সমান যায় না। ফকিরদেরও হল তাই অবস্থা। অবস্থা পড়তে শুরু করল, রবরবা কমতে লাগল।”
তারাপদ বলল, “কেন?”
কিকিরা বললেন, “ঠাকুরদার আমলে ছিল এক। বাবা কাকার আমলে হল তিন। ফকিরের বাবার আরও দুই ভাই ছিল। ফকিরদের আমলে সেটা আরও ভাগ হয়ে গেল। তার মানে এই নয় যে, সে ফকির হয়ে গিয়েছে, এখনো যা আছে, তাতে তোমার আমার মতন মানুষের বরাতে থাকলে বর্তে যেতুম।”
