তারাপদ আর চন্দন কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকল। কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করে ঘণ্টাটা বাজাতে লাগলেন। তারাপদরা মাটির দিকে তাকাল, কিছু দেখতে পেল না। অথচ বেশ বুঝতে পারল টেবিলের তলায় ঘন্টা বাজছে।
কিকিরা বললেন, “আপনারা মাটিতে বসে পড়ন, উবু হয়ে বসুন, তা হলেই দেখতে পাবেন।”
চন্দন ঝপ করে বসে পড়ল। বসে পড়ে টেবিলের তলার দিকে তাকাল। দেখল, টেবিলের মাঝ-মধ্যিখানে একটা আঙটার ফাঁকে ছোট মতন এক পুজোর ঘণ্টা ঝোলানো। দেখে চন্দন বোবা হয়ে গেল।
তারাপদও চেয়ারে বসে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে টেবিলের তলাটা দেখতে লাগল ।
কিকিরা হেসে হেসে বললেন, “ভেরি ইজি স্যার, শুধু একটু প্র্যাকটিস দরকার। এই দেখুন, আমি আমার ডান পায়ের বুড়ো আর মাঝখানের আঙুল দিয়ে কেমন করে ঘন্টা বাজাচ্ছি।” কিকিরা ঘণ্টা বাজাতে লাগলেন।
কিকিরার জুতো জোড়ার একটাতে তাঁর পা নেই। জুতো পড়ে আছে।
তারাপদ সন্দেহের গলায় বলল, “আপনার ডান পায়ের জুতো পড়ে আছে, পা নেই।”
চন্দন আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
কিকিরা বললেন, “পা যদি জুতোর মধ্যেই থাকবে স্যার, তবে ঘণ্টাটা বাজাব কেমন করে!”
তারাপদ বলল, “আপনি বলতে চান জুতোর মধ্যে থেকে পা বার করে নিয়ে ঘণ্টা বাজানো হয়?”
“এক্কেবারে ঠিক কথা। যদি ঘন্টাটা এ-দেশি হয় তবে ওইভাবে বাজাতে হবে।”
“কিন্তু আপনি জুতোর মধ্যে থেকে পা বার করলেন কেমন করে? আমি তো বুঝতে পারলাম না। আপনার জুতোর ডগার ওপর আমার পা চাপানো ছিল।“
“আমি বোকা বানিয়েছি। অবশ্য স্যার, এইভাবেই আমরা আপনাদের বোকা বানাই। ব্যাপারটা কী জানেন, আমার যে জুতো জোড়া দেখছেন এটা ঠিক আমার নয়, চেয়েচিন্তে বেছে জোগাড় করেছি। এটা হল খাদে পরে যাবার মালকাট্টাদের জুতো। হরিরামের কাছে পড়ে ছিল। এই জুতোর মুখটা খুব শক্ত, লোহার মতন। এরকম জুতো পাওয়া যায় বাজারে। এই ধরনের শক্ত মুখের আরও পাঁচ রকম জুতো আছে। কলকারখানায় যারা কাজ করে তারা
অনেকেই এই ধরনের জুতো পরে। আঙুলগুলো বাঁচে আর কি-ঠোক্কর, খান, হোঁচট খান, কিসসু হবে না।…সত্যি বলতে কী স্যার, আপনাকে আমি ইচ্ছে করেই বলেছিলাম, জুতোর ডগার ওপর আপনার জুতোসুদ্ধ পা চাপিয়ে রাখতে। আপনি পা ঠিকই চাপিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু বুঝতে পারেননি আমি আলগা জুতো থেকে পা বের করে নিয়েছি। কেমন করে বুঝবেন? খুব শক্ত মুখের জুতোর ওপর যদি আপনার জুতোর মুখটা চেপে থাকেন–আপনার মনে হবে, আপনি অন্যের জুতো ঠিকই চেপে ধরে আছেন।”
চন্দন বলল, “আপনার জুতোর ফিতে বাঁধা রয়েছে।”
কিকিরা হেসে উঠে বললেন, “সেটা ওপরে-ওপরে। প্রথমত ফিতে আমি আলগা করে বেঁধেছি, তা ছাড়া–ফিতের তলার দিকে কাটা আছে স্যার। জুতোটা একবার দেখলেই বুঝতে পারবেন।”
তারাপদ বলল, “এ-সব আপনি কখন করলেন?”
“কেন, সেই যে একবার আপনাদের ঘরে বসিয়ে রেখে বাইরে গেলাম, তখন এই স্পেশ্যাল জুতো পরে এলাম। “
চন্দন কেমন কৌতূহলের সঙ্গে বলল, “আত্মারা তা হলে এইভাবে ঘণ্টা বাজায়?
কিকিরা মুচকি হাসলেন।
তারাপদ সন্দেহের গলায় বলল, “কিন্তু ওই মেয়েটি কেমন করে ঘণ্টা বাজাবে? সে আপনার মতন জুতো পায়ে এসে বসত না। খালি পায়ে বসত। আমরাও খালি পায়ে থাকতাম।”
কিকিরা সহজভাবেই বললেন, “স্যার, যে নিয়মে নৌকো জলে ভাসে, সেই একই নিয়মে জাহাজও জলে ভাসে। একই মাটি, একই খড়গড়ার বেলায় কখনো আমরা গড়ি মা দুর্গা, কখনও মা কালী ।” বলে জিবে একটা শব্দ করলেন কিকিরা। তারপর বললেন, “আপনি যদি ম্যাজিকের লাইনে থাকতেন স্যার, বুঝতে পারতেন, খেলাটা একই, তবে এক একজন এক একভাবে দেখায়, সামান্য অদলবদল করে। ভুজঙ্গ খেলাটাকে একটু অন্যভাবে দেখাত।”
চন্দন বলল, “কেমন করে?”
কিকিরা বললেন, “ব্যাপারটা খুব কঠিন নয়। আপনারা হাতে পরার দস্তানা দেখেছেন তো? নরম শক্ত অনেক রকম দস্তানা থাকে। যদি বলি মেয়েটি পায়ের দস্তানা পরত–তা হলে?”
অবিশ্বাসের সুরে তারাপদ বলল, “কী বলছেন?”
“ঠিকই বলছি স্যার, তবে বলায় একটু ভুল হয়েছে। দস্তানা না বলে বলা উচিত পায়ের ঢাকনা, অবিকল পায়ের পাতার সামনের দিকটার মতন।” বলতে বলতে কিক্রি নিজের ডান পা তুলে ধরে দেখালেন। বললেন, “এই যে আঙুল দেখছেন–ঠিক এইরকম আঙুল-অলা একটা কাঠের কিংবা খুব শব্দ রবারের, বা মেটালের ফলস্ পায়ের পাতা দরকার । পুরো পাতা না হলেও চলে, আধখানা হলেই যথেষ্ট। মেয়েটা এই রকম ফলস্ আঙুল-অলা পায়ের পাতা পরে থাকত। দরকারের সময় সে এই খোপের মধ্যে থেকে পা বার করে নিত, আপনারা বুঝতে পারতেন না।”
তারাপদ বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন। বলল, “আমাদের পায়ের আঙুল তার পায়ের আঙুলের সঙ্গে ছোঁয়ানো থাকত।”
“না, কখনোই নয়, কিকিরা বললেন, “আপনারা ভাবতেন মেয়েটির পায়ের আঙুলের সঙ্গে আপনাদের পায়ের আঙুল ছোঁয়ানো আছে। কিন্তু তা থাকত না। আপনারা তার নকল পায়ের পাতার নকল আঙুলে নিজেদের আঙুল ছুঁইয়ে রাখতেন। আর সেই মেয়েটি দরকারের সময় ঢিলেঢালা ওই নকল পায়ের পাতা থেকে নিজের পা বার করে নিয়ে ঘণ্টা বাজাত।”
চন্দন হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে বলল, “মাই গড়। ওই জন্যেই মেয়েটির পায়ের আঙুল আমার একদিন শক্ত-শক্ত লেগেছিল।”
