তারাপদ প্রথমে অবাক হল, তারপর অবিশ্বাসের চোখে কিকিরার দিকে তাকাল।
কিকিরা তাঁর আলখাল্লার মতন জামাটা খুলে ফেললেন। মাথার সেই টুপিটাও খুললেন। বড় রোগা দেখাচ্ছিল তাঁকে; রোগা আর রুগ্ন। মাথার চুলও কিছু কিছু সাদা, লম্বা লম্বা চুল, ঘাড় পর্যন্ত নামানো ।
কিকিরা বললেন, “চলুন আমরা নিচে যাই। নিচের তলায় হরিরামের একটা গুদোমঘর আছে। পুরনো, পোড়ো, ঘর। ঘরটা বেশ অন্ধকার। সেখানে আমরা এই সাত-সকালেই আত্মা নামাব ।” বলে কিকিরা যেন হাসলেন; বললেন, “ভুজঙ্গর আত্মা-নামানোর ঘরে অনেক ব্যবস্থা আছে। সেটা স্যার মডার্ন । আমাদের পোড়ো গুদোমঘরে কিছু নেই। তবু দেখা যাক সেখানে আত্মা নামে কি না?”
তারাপদ এবার কেমন বিব্রত বোধ করল । ভুজঙ্গর আত্মা-নামানোর ব্যপারটা পুরো ধোঁকা এ-কথা এখন প্রমাণ হয়ে গেলেও তার যেন ভাল লাগবে না। অথচ এটা যে মিথ্যে তাও জানা দরকার।
কিকিরা বললেন, “চলুন স্যার, দিনের বেলায় আত্মারা বড় একটা আসতে চায় না, তবু একবার চেষ্টা করা যাক। কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান অনেকদিন পরে তার খেলা দেখাবে।” বলে ঠাট্টার গলায় হাসলেন কিকিরা। তারপর জাদুকরের ভঙ্গিতে পিঠ নুইয়ে মাথা নিচু করে অভ্যর্থনার ভঙ্গি করে ডাকলেন তারাপদদের, “আসুন।”
চন্দন প্রথমে উঠে দাঁড়াল, তারপর তারাপদ। তারাপদ কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নামবার সময় কিকিরা বললেন, “তারাপদবাবু, একটা কথা আপনাকে বলে দি। ভুজঙ্গ যতবড় শয়তান তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান। কিন্তু বুদ্ধিমানও ভুল করে। ভুজঙ্গ মস্ত বড় ভুল করেছে। বারবার একই ফন্দি কাজে লাগে না। পরীর আত্মা নামিয়ে সে আপনার বাবাকে পাগল করেছিল। তাঁকে মেরেছিল বলা যায়। ওই একই কায়দা করে সে আপনাকে হাতের মুঠোয় ধরে ফেলেছে। কিন্তু ও জানে না–একই ফাঁদে দু’বার শিকার ধরা যায় না।”
বাবার কথায় তারাপদ সিঁড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
কিকিরা কিন্তু দাঁড়ালেন না। রোগা, রুগ্ন, হাড় জিরজিরে মানুষটির মুখে ঘৃণা এবং প্রতিহিংসা যেন জ্বলে উঠেছিল।
তারাপদ কিকিরার এমন মুখ কখনো দেখেনি। তার কেমন যেন ভয় হল।
কিকিরা নিচে নেমে গেলেন।
.
এগারো
হরিরামে গুদোমঘরটা বেশ অন্ধকার। তবু ভুজঙ্গর আত্মা-নামানোর ঘরটার মতন ঘুটঘুঁটে নয়। এখন আবার দিনের বেলা, বাইরের আলো ছোটখাট ফাঁকফোকর দিয়ে একটু না একটু ঢুকে পড়ছে। ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা দেখতে গেলে হলের মধ্যে যেমন লাগে–অনেকটা সেই রকম অন্ধকার লাগছিল এখানে।
কিকিরা বড় বড় ফাঁক-ফোকরগুলো ছেঁড়া চট, কাগজ, আরও যা যা পেয়েছেন হাতের কাছে, তাই দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন আগেই; ছোটগুলো ঢাকতে পারেননি। তার জন্যে তিনি ব্যস্তও হলেন না।
ঘরের মাঝমধ্যিখানে একটা ছোট টেবিল ছিল চৌকো ধরনের; আর দুটো চেয়ার, মুখোমুখি।
গুদোমঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন কিকিরা। বললেন, “তারাপদবাবু, আপনি আর আমি চেয়ারে গিয়ে বসব। মুখোমুখি। টেবিলের ওপরে আমাদের হাত থাকবে, আমরা দুজনে দুজনের হাত ধরে থাকব। আর টেবিলের নিচে আমাদের পা থাকবে, আমরা পায়ে পা ছুঁইয়ে রাখব। চন্দনবাবু যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন।..আসুন।”
তারাপদ কিকিরার মতিগতি বুঝতে পারছিল না। ওই খেপা মানুষটি কী পাগলামি শুরু করলেন? তা ছাড়া তারাপদর মাথায় বাবার কথা বারবার এসে পড়ছিল। কিকিরা কেন বললেন, ভুজঙ্গই একরকম তার বাবাকে মেরেছে? কেন বললেন, পরীর আত্মা নামিয়ে ভুজঙ্গ বাবাকে পাগল করেছিল? কিকিরা কি তার বাবার কথা জানেন? আশ্চর্য! যদি জানেন তবে আগে কেন বলেননি?
তারাপদর মন বড় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিল।
কিকিরা ততণে চেয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তারাপদকে আবার ডাকলেন তিনি, “আসুন।”
ঝাপসা অন্ধকারে তারাপদ ধীরে ধীরে এগিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“বসুন,” কিকিরা বসতে বললেন।
কেমন যেন অন্যমনস্কভাবে তারাপদ বলল, “জুতো রয়েছে পায়ে।”
কিকিরা বললেন, “আগেই দেখেছি। শু। চামড়ার। বেশ শক্ত জুতো। ওতে কোনো ক্ষতি হবে না। আমার পায়েও রয়েছে।” বলে চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর ঠাট্টার গলায় বললেন, “ধূপ ধোঁয়া স্তোত্রপাঠ গানটান কিছুই তো এ-ঘরে দেখছেন না । ভুজঙ্গর তাক-লাগানো ব্যাপার কোনোটাই নেই স্যার। তবু দেখবেন আপনার পছন্দসই আত্মারা সবাই একে-একে চলে আসবে।…নিন, বসে পড়ন।”
তারাপদ চেয়ার টেনে বসল। কিকিরাও বসে পড়েছেন। চৌকো ধরনের ছোটখাট অথচ সামান্য উঁচু টেবিলের দু ধারে মুখোমুখি দুজনে বসে। কিকিরা তাঁর দু’হাত সামনে বাড়িয়ে দিলেন। টেবিলের ওপরই ফেলে রাখলেন হাত দুটো। বললেন, “নিন, আপনার হাত দুটো এগিয়ে দিন; আমার হাত ধরুন।”
তারাপদ হাত ধরল । কিকিরা টেবিলের তলায় জুতোসমেত পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তারাপদও তার পা বাড়াল। কিকিরা বললেন, “না না, আপনি অত লজ্জা পাবেন না স্যার, জুতোর মুখে মুখে ছুঁইয়ে রাখছেন কেন–ডগাটার ওপর একটু চাপ দিয়ে থাকুন।”
সঙ্কোচ হচ্ছিল তারাপদর। কিকিরার পায়ের ওপর নিজের জুতোসমেত পা কেমন করে চাপানো যায়? তার ভদ্রতায় বাধছিল। ভুজঙ্গর ওখানে তারা শুধু মেয়েটির পায়ের আঙুলের সঙ্গে আঙুল ছুঁইয়ে রাখে। আর এখানে কিকিরা জুতোর মুখের ওপর পা চাপিয়ে দিতে বলছেন। এ
