“কেন কেন?” কিকিরা কৌতূহল বোধ করে বললেন।
চন্দন বলল, “বলছি। তার আগে আর-একটা খবর আছে। সাধুমামার আজ শেষরাত থেকে শরীর খারাপ। বুকে ব্যথা। মৃত্যুঞ্জয় আমায় ডাকতে এসেছিল শেষরাতে।”
কিকিরা কেমন ব্যস্ত হয়ে বললেন, “বুকে ব্যথা? কী হয়েছে?”
“আমার মনে হল, অনেকদিন ধরেই উনি কোনো দুঃখ-দুভাবনার মধ্যে রয়েছেন, শরীরটাও দুর্বল। হার্টের কিছু গোলমাল হয়ে থাকতে পারে। আমার কাছে স্টেথেসকোপও নেই। নাড়ি ধরে কতটুকু আর বুঝব! প্রেশার, হার্টসই দেখানো দরকার। তবে এই ব্যথাটা বোধ হয় মনের ভীষণ দুভাবনা থেকে হয়েছে।” বলে চন্দন অল্প সময় করে থেকে তারাপদকে দেখল দু পলক, শেষে কিকিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি যখন সাধুমামাকে দেখছিলাম, মৃত্যুঞ্জয় আমার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। যখন নিচে এসে ইনঞ্জেকশান নিয়ে আবার ওপরে গেলাম তখন আমি মৃত্যুঞ্জয়কে ঘর থেকে সরিয়ে দিলাম কায়দা করে।”
“কেমন করে?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“ব্যাপারটা সহজ। বললাম, আমার কাছে ইথার-টিথার নেই, ইনজেকশানের সিরিঞ্জ আর ছুঁচ স্টেরিলাইজ করতে হবে। গরম জলে এগুলো ফুটিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন তাড়াতাড়ি।”
কিকিরার মুখ দেখে মনে হল তিনি চন্দনের উপস্থিত বুদ্ধিতে খুশি হয়েছেন।
চন্দন বলল, “সাধুমামার মুখ চোখ দেখে আমি আগেই বুঝেছিলাম তিনি আমায় কিছু বলতে চান। তাই কায়দা করে মৃত্যুঞ্জয়কে সরালাম। ঘরে যখন আমি আর সাধুমামা ছাড়া অন্য কেউ নেই, তখন সাধুমামা বালিশের ওয়াড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটা চিরকুট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, আপনার কাছে চিরকুটটা দিতে।” বলে চন্দন প্যান্টের পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করল।
তারাপদ বোকার মতন বসে থাকল । অবাক চোখ করে, সে একবার চন্দনকে দেখছে, একবার কিকিরাকে। কী যে হয়ে যাচ্ছে কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না। বেশ বোঝা যাচ্ছে সাধুমামা কিকিরাকে জানেন। এটাও জানেন যে কিকিরা এখন এখানে। তারাপদদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। সাধুমামাও যেন এক রহস্য।
কিকিরা চিরকুটটা নিয়ে পড়লেন। বার দুই মনে হল, চঞ্চল হয়ে পড়েছেন; প্রকাশ করতে চাইলেন না। কী মনে করে একটা সিগারেট চাইলেন চন্দনের কাছে, তারপর সিগারেটটা ধরিয়ে হঠাৎ উঠে গেলেন।
ঘরে তারাপদ আর চন্দন।
তারাপদ বলল, “কিসের চিরকুট?”
চন্দন বলল, “কিকিরা বলবেন।”
“তুই দেখিসনি?”
“দেখেছি। বুঝতে পারিনি।” চন্দন এ কথা এড়িয়ে গেল ।
তারাপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, “সাধুমামা তোকে চিরকুট দিল কেন?”
চন্দন বলল, “তোকে দিয়ে লাভ হত না বলে। কিংবা তোকে দেবার কোনো সুযোগ ছিল না বলে।”
তারাপদর সন্দেহ হল। কিছু যেন ভাবল তারাপদ; বলল, “তুই কী বলতে চাসবুকের ব্যথার নাম করে সাধুমামা তোকে ডেকে ওই চিরকুটটা দিয়েছে?”
“আমার তাই মনে হয়,” চন্দন ছোট করে জবাব দিল।
“সাধুমামাও তাহলে কিকিরাকে চেনে?” তারাপদ বলল।
চন্দন চুপ করে থাকল।
কিকিরা ফিরে এলেন। ফিরে এসে বসলেন না, ঘরের মধ্যে বার দুই পায়চারি করলেন, তারাপদকে দেখলেন বারবার। তারপর বললেন, “একটু দেহাতী চা খেয়ে নিন স্যার, তারপর কথা বলা যাবে।”
তারাপদর ধৈর্য থাকছিল না। সাধুমামা কেন চিরকুট পাঠিয়েছে কিকিরাকে? কী লিখেছে চিরকুটে? অসহিষ্ণু হয়ে তারাপদ বলল, “সাধুমামা আপনাকে কী লিখেছে?”
কিকিরা প্রথমটায় জবাব দিলেন না। পরে বললেন, “সবই বলব স্যার, রয়েসয়ে শুনতে হবে। তার আগে বলুন, ভুজঙ্গ কাল আপনাকে কোন্ খেলা দেখিয়েছে?”
তারাপদর রাগ হল। খেলা? কিকিরা সব জিনিসকেই খেলা মনে করেন? রাগ করে তারাপদ বলল, “ভুজঙ্গ যা যা দেখায়, সবই আপনি খেলা মনে করেন?
কিকিরা তারাপদর রাগ বুঝে যেন মনে-মনে হাসলেন। চন্দনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনিই বলুন স্যার।”
সাধুমামার চিরকুটে কালকের কথার একটু-আধটু উল্লেখ ছিল । কিকিরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন কাল ভুজঙ্গ কোন্ খেলা দেখিয়েছে। তবু, সবটাই শুনতে চান তিনি। কাল যা যা ঘটেছে চন্দন বলতে লাগল ।
ওরই মধ্যে কাঁচের বড় বড় গ্লাসে চা এল। দেহাতী চা না দুধ-চা বলা মুশকিল, দুধে সাদা হয়ে রয়েছে, সর ভাসছে ওপরে।
চন্দন কথা শেষ করে থামল।
কিকিরা সব শুনে তারাপদর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “আপনি ঠিক জানেন আপনার বোনের আত্মা এসেছিল?”
তারাপদ জেদীর মতন বলল, “আসেনি তার প্রমাণ কোথায়?”
চন্দন চা খেতে খেতে বলল, “তারা, তোর মতন মুখ্য আমি আর দেখিনি। তোকে আমি অত করে বোঝালাম সাধারণ নিয়মে এটা হতে পারে না, অসম্ভব ব্যাপার।”
তারাপদ বলল, “জগতে অনেক অসম্ভবই সম্ভব হয়। ভুজঙ্গ আমার পিসেমশাই হয়ে ডেকে পাঠাবে এটাই কি সম্ভব?” চন্দন ভীষণ বিরক্ত বোধ করে চুপ করে গেল ।
সামান্য চুপচাপ। কিকিরা বললেন, “তারাপদবাবু, আপনি তা হলে বিশ্বাস করেন, আত্মা আছে, আর পরলোক থেকে সেই আত্মারা ভুজঙ্গর ডাকে মাটিতে। নেমে আসে?”
তারাপদ একগুঁয়ের মতন বলল, “হ্যাঁ করি। আমি যা দেখেছি তা অবিশ্বাস করব কেমন করে?”
কিকিরা কয়েক মুহূর্ত তারাপদর দিকে তাকিয়ে থেকে মজার গলায় বললেন, “আপনি যা যা দেখেছেন আমি যদি আপনাকে সেগুলো দেখাতে পারি তাহলে কি আপনি স্বীকার করবেন ভুজঙ্গ আপনাদের ধোঁকা দিয়েছে?”
