“তুই আমায় লোভী বলেছিস।”
“লোভ সব মানুষেরই অল্পস্বল্প থাকে, তারা। পড়ে-পাওয়া সম্পত্তির লোভ ভাই আমারও থাকত। যাকগে, তুই লোভী নোস, যা বলেছি–ভুল করে বলেছি। এবার হল তো?”
তারাপদ কোনো কথা বলল না। চন্দন বন্ধুর গলা জড়িয়েই হাঁটতে লাগল। খানিকটা এগিয়ে এসে বলল, “ভুজঙ্গ তোকে বশ করে ফেলছে, তারা। ধীরে ধীরে তোকে মুঠোয় পুরে ফেলছে। এরপর তুই আর পালাতে পারবি না, সে-ক্ষমতা তোর থাকবে না। আমিও তোকে সাবধান করে দিচ্ছি।”
তারাপদ বলল, “যা মনে করিস বল, আমি কিছু বলব না।”
“তুই সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করিস তোর মা-বাবার আত্মা আসে? তুই কি বাস্তবিকই মনে করেছিস–কাল তোর কাছে পরী এসেছিল?”
“হ্যাঁ, পরী এসেছিল।”
“আমি বিশ্বাস করি না। এ অসম্ভব।”
“তুই বিশ্বাস না করতে পারিস, কিন্তু আমি করি। যদি পরী না আসবে তবে কে আমার নাকের কাছে গন্ধ শুকিয়ে যাবে, কার মাথার চুল আমার মুখে লাগবে? কার আঙুলের ছাঁচ পড়ে থাকবে?”
চন্দন বন্ধুর গলা থেকে হাত সরাল। মুখোমুখি তাকাল। বলল, “তুই পাগলের মতন কথা বলছিস। পরী মারা গিয়েছিল ছোট্ট বয়সে, তুই বলিস বছর দুই-তিন বয়েসে । শোন তারা, যা বলছি ভেবে দেখ । পরী যখন মারা যায় তখন তুই নিজেই ছেলেমানুষ; পরীর ঠিক-ঠিক বয়েস কত হতে পারে তুই জানিস না। দু-তিন বছর হতে পারে, আবার চারও হতে পারে। সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু ছোট্ট পরী কি মরে গিয়েও পরলোকে বাড়ছে?”।
তারাপদ কথাটা বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
চন্দন বলল, “এটা তো সোজা ব্যাপার। আমরা চেয়ারে বসেছিলাম–ঠিক কিনা বল? একটা তিন-চার বছরের মেয়ে মাথায় কত লম্বা হবে রে যে তোকে গন্ধ শুকিয়ে যাবে, মুখে চুলে ছোঁয়া দিয়ে যাবে? যদি মেয়েটা কম করেও ফুট চারেকের মতন লম্বা না হয়, কখনোই আমরা চেয়ারে বসে থাকার সময় মুখে মাথার চুল ছোঁয়াতে পারে না। এটা সোজা অঙ্কের ব্যাপার। চেয়ারে বসে থাকার সময় আমাদের মুখ মাটি থেকে অন্তত সোয়া তিন সাড়ে তিনি ফুট উঁচুতে থাকে, ওই হাইটের কোনে মেয়ে পাশে না দাঁড়ালে তার চুলের ছোঁয়া তোর মুখে লাগতে পারে না। অবশ্য যে-মেয়ে মাথায় আরও লম্বা সে কিন্তু ঘাড় নামিয়ে হেঁট হয়ে তোর মুখে চুলের ছোঁয়া লাগাতে পারে। এবার তুই বল, মারা যাবার পর স্বর্গে গিয়ে পরী কি তোর-আমার মতন বছরে বছরে বাড়ছে? তা যদি বাড়ে–তবে তার বয়েস আজ ষোলো সতেরো হতে পারে।”
তারাপদ বোকার মতন বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কথা বলতে পারল না। পরীর মুখ কিংবা স্মৃতি যেটুকু মনে আছে তারাপদর, তাতে সেই ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে কখনোই মাথায় অত লম্বা হতে পারে না। বড় জোর বছর তিনেকের ছিল পরী। সে কতই বা লম্বা হবে? তা ছাড়া তার মাথার চুল ছিল ঝাঁকড়া, কিন্তু বল্ করে ছাঁটা। সেই চুলই বা কেমন করে মুহূর্তের জন্যে পালকের ছোঁয়ার মতন তারাপদর গালে লেগে সরে যাবে? মোমের আঙুলের যে ছাঁচ তারাপদ দেখেছে–সেটাও তো কচি মেয়ের নয়। তা হলে? আত্মারা কি মানুষের মতন পরলোকে গিয়ে বয়েসেও বাড়ে? যদি তা বাড়ত–তবে হাজার-হাজার আত্মার বয়েস শ, দুশ, পাঁচশ বছর হয়ে গেছে।
তারাপদ এরকম একটা হেঁয়ালির কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না। বলল, “কী জানি, আমি কিছু জানি না। তবে ভুজঙ্গ তো আগেই বলেছে–পরী আর অত ছোট্টটি নেই। আত্মাদের অন্য কোনো ব্যাপার আছে।”
“কোনো ব্যাপার নেই”, চন্দন ঘাড় নেড়ে বলল, “আমি তোকে বলছি–যে-মেয়েটি আমাদের সঙ্গে টেবিলে বসে, আত্মা নামাবার মিডিয়াম হয়–সেই মেয়েটাই কাল পরী সেজে তোর কাছে এসেছিল।”
তারাপদ প্রবলভাবে বাধা দিতে গেল, চন্দন শুনল না। বলল, “মেয়েটার মাথায় অনেক চুল, সব সময় চুল এলো করে থাকে, মাথায় লম্বা, গায়ে রোগা–তারা, এই মেয়েই কাল পরী সেজে এসেছিল।”
চন্দন আরও কী বলতে গিয়ে থেমে গেল। পরে বলল, “কিকিরার কাছে চল । কিকিরা তোকে বুঝিয়ে দিতে পারবেন ভুজঙ্গ কেমন করে আত্মা নামায়।”
.
মাঠেঘাটে নয়, কিকিরা বাড়িতে চন্দনদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। বাড়ি মানে সেই হরিরামের আস্তানা। বালিয়াড়ির আড়ালে মাঠকোঠা ধরনের বাড়ি, দোতলা, কাঠের সিঁড়ি, মাথায় খাপরার চাল। চারদিকেই কিছু-না-কিছু গাছপালা। বাড়ির একপাশে বাঁধানো কুয়ো।
হরিরাম খেতখামার নিয়ে পড়ে থাকত একসময়, ছেলে গোরখপুরে বড়সড় ব্যবসা ফাঁদার পর বাবার কাছে বড় একটা আসতে পারে না। হরিরামের স্ত্রী মারা গিয়েছে বছর কয়েক আগে। সংসারে একলা মানুষই এখন হরিরাম। খেতখামারের ওপর তার আর টান নেই, ধর্মকর্ম নিয়েই দিন কাটায়। বাড়িতে জোয়ান বয়েসের কাজের লোক আছে একটা, আর আছে পাঁড়েজি, বুড়ো বামুন।
কিকিরা দোতলার ঘরে ডেকে নিলেন চন্দনদের। ঘরটা কাঠের, শীতের রোদ খেয়ে মোটামুটি গরমই লাগছিল, সরাসরি রোদ পড়েছে পেছন দিকটায়, সামনে সরু বারান্দা।
কিকিরার ঘরে একটা তক্তপোশ, টিনের চেয়ার আর কাঁঠালকাঠের টেবিল ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। দড়ির আলনায় জামাটামা ঝুলছে কিকিরার।
চন্দনরা বসার পর কিকিরা তারাপদর মুখ খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, “রাত্তিরে ঘুম হয়নি, স্যার?” বলে একটু হাসলেন।
চন্দন বলল, “ওর ঘুম তো গেছেই, সঙ্গে-সঙ্গে আমারও। কাল সারারাত তারা যা করেছে–ভাবছিলাম ওকেই একটা ইঞ্জেকশান ঠুকে দিই।”
