চন্দন বলল, “সাধুমামার বুকে ব্যথা উঠেছিল।”
“সাধুমামার?”
“ভোর রাতে আমায় মৃত্যুঞ্জয় ডাকতে এসেছিল। তোকে আর আমি জাগাইনি। একটু আগে আর একবার দেখতে গিয়েছিলাম সাধুমামাকে।”
তারাপদ উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “কী হয়েছে সাধুমামার? কেমন আছে?”
“ভালই আছেন এখন!”
“বুকে ব্যথা কেন? হার্টের গোলমাল?” চন্দন পর পর দু’ চুমুক চা খেল। সিগারেটও ধরাল। শেষে হেঁয়ালি করেই যেন বলল, “হতে পারে।”
“হতে পারে মানে?”
“বলতে পারছি না। হার্টের গোলমাল ধরা কঠিন। আমার কাছে স্টেথোও নেই। তবে ব্যথাটা হার্টের দিকটাতেই।”
“তোর কাছে তো ওষুধও নেই কিছু?”
“না। দু-চারটে যা এনেছি, তাতেই আপাতত কাজ চালিয়ে দিচ্ছি।”
তারাপদ কিছুই বুঝতে পারছিল না। সাধুমামার বুকের ব্যথা যদি এতই বেশি তাহলে চন্দন তেমন গা করছে না কেন? আশ্চর্য! যে ডাক্তারের না আছে স্টেথোসকোপ না কোনো ওষুধপত্র, সে-ডাক্তার কেন রোগীর ভার নেবে! তারাপদ বলল, “তুই সবে পাশ করেছিস, তোর কাছে ওষুধপত্র নেই–কেন তুই এই দায়িত্ব মাথায় নিচ্ছিস? সাধুমামা বুড়োমানুষ, একটা-কিছু হয়ে গেলে তখন সামলাতে পারবি না। তার চেয়ে ভুজঙ্গদের বল–কোনো ডাক্তার-টাক্তার ডেকে আনবে।”
চন্দন কথাগুলো কানে শুনেও গা করল না, বলল, “বোকার মতন কথা বলিস না। আমি যেমন ডাক্তারই হই বিপদে পড়ে কেউ যদি আমায় ডাকতে আসে আমি না বলতে পারি না। তা ছাড়া এখানে ধারেকাছে কোনো ডাক্তার নেই । হয় মধুপুর না হয় দেওঘর থেকে ডাক্তার আনতে হবে। তার মানে গোটা একটা দিনের ব্যাপার । তোকে বলেছি না–কাজে লাগতে পারে ভেবে আমি দু-একটা ইনজেকশানের ওষুধ নিয়ে এসেছিলাম। তার মধ্যে একটা হার্টের ওষুধ ছিল। ভেবেছিলাম ভুজঙ্গ অক্কা পাবার আগে কাজে লাগবে। সাধুমামার দরকারে লেগে গেল ।…যাক গে, সাধুমামা এখন ঘুমোচ্ছে; ইনজেকশান দিয়ে দিয়েছি ভোর রাতেই। মনে হচ্ছে, কোনো গণ্ডগোল হবে না। এর পর ভুজঙ্গ কী করবে না-করবে সেটা তার ব্যাপার। আমার যা করার করেছি, যা বলার মৃত্যুঞ্জয়কে বলেছি।”
তারাপদ চা শেষ করে ফেলল। হাই তুলল আবার। চা খাওয়ার পর সামান্য আরাম লাগছিল।
চন্দন বলল, “একবার কিকিরার কাছে যেতে হবে।”
“কেন?”
“চল না; গেলেই বুঝতে পারবি।”
মাথা নাড়ল তারাপদ। “আমার ভাল লাগছে না।”
“এই বাড়িতে বসে বসেই বা তোর কী ভাল লাগবে?”
কথার জবাব দিল না তারাপদ।
অপেক্ষা করে চন্দন হঠাৎ বলল, “তুই যদি আমার সঙ্গে না যাস, তারা–আমি কিন্তু আর এ-বাড়িতে ফিরব না; কিকিরার কাছে দুপুরটা কাটিয়ে বিকেলের ট্রেনে কলকাতা ফিরে যাব।”
তারাপদ বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন চন্দনের হঠাৎ এই মত পালটে ফেলার ব্যাপারটা বুঝতে না-পেরে তাকে লক্ষ করতে লাগল।
চন্দনও চা শেষ করে ফেলল। তারাপদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চল্।” ।
তারাপদ বলল, “কী হবে কিকিরার কাছে গিয়ে?”
“কী হবে না-হবে, তোর কাছে আমি এখন বলব না। যদি তুই না যাস, আমি বুঝব তুই ভুজঙ্গর ফাঁদে ধরা পড়ে গিয়েছিস। আমি আর এখানে থাকব না।“
চন্দনের মুখ দেখেই তারাপদ বুঝতে পারল, ও বাজে কথা বলছে না। সত্যিই-সত্যিই তারাপদকে রেখে চন্দন চলে যাবে। ও বরাবরই জেদী, একবার যা ঠিক করে নেয় তার নড়ানো যায় না। তবু তারাপদ বলল, “কী হল ব্যাপারটা? হঠাৎ তুই এরকম করছিস?”।
চন্দন চাপা গলায় বলল, “এখানে বসে সব কথা বলা যাবে না। তুই হয় আমার সঙ্গে চলনা হয় তুই এই লাখটাকার সম্পত্তির জন্যে ভুজঙ্গর কাছে বসে থাক–আমি থাকব না।”
তারাপদর কানে কথাটা বড় লাগল। আহত হয়ে বলল, “তুই আমায় এত লোভী ভাবলি?”
চন্দন বলল, “এই বাড়িতে বসে আমি আর একটা কথাও বলব না। যদি তোর ইচ্ছে না থাকে, তুই যাস না। আমি যাচ্ছি।”
তারাপদর সাধ্য হল, না চন্দনকে ছেড়ে দেয়। সে স্পষ্টই বুঝল, চন্দন তাকে। মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছে না–সত্যিই ও চলে যাবে, যা একগুঁয়ে ছেলে। তা। ছাড়া তারাপদর সন্দেহ হল, চন্দনের যেন কিছু বলার আছে, গোপনে বলবে। অগত্যা তারাপদ বলল, “বেশ। আমি যাব। “
তারাপদ আর চন্দন বেরিয়ে পড়ল । মৃত্যুঞ্জয় তাদের দেখেছিল, কিছু বলল না। কেউ যে নজর রাখছে, তাও মনে হল না।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঠ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলল, “তোকে একটা কথা বলি তারা, কিছু মনে করিস না। ভুজঙ্গ তোকে জব্বর প্যাঁচ মেরে কবজা করে ফেলেছে।”
তারাপদ রেগে গেল। বলল, “কেন? কী করে বুঝলি?”
“বুঝেছি। তোকে আমি বুঝব না? তুই বরাবর নরম ধাতের । একটুতেই কেঁদে ফেলিস, বুক চাপড়াস, ছটফট করিস। তোর মতন সেন্টিমেন্টাল ছেলে আমি খুব কম দেখেছি। তোর মনে কোনো জোর নেই।”
চন্দন আরও কী বলতে যাচ্ছিল, তারাপদ বাধা দিয়ে রাগের গলায় বলল, “লেকচার মারিস না, চাঁদু । আমি অনেক লেকচার শুনেছি।”
“তুই চটে যাচ্ছিস কেন?”
“আলবাত চটব। তুই আমায় লোভী বলবি, সেন্টিমেন্টাল বলবি–আর আমি চটব না!”
চন্দন বন্ধুর রাগ দেখে হেসে ফেলল। তারাপদর রাগ ভাঙাবার জন্যে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “তুই মিছিমিছি চটছিস। সকলের মন কি একরকম হয়? কারুর মন শক্ত হয়, কারুর নরম; কেউ নিষ্ঠুর হয় তোর ভুজঙ্গ-পিসেমশায়ের মতন, কেউ বা সাধুমামার মতন দুর্বল হয়। তোর মন নরম বললে তুই চটবি কেন?”
