বিড়বিড় করে তারাপদ বলল, “আমায় ভাববার একটু সময় দিন।”
“বেশি সময় তোমায় কেমন করে দেব। আমার সামনেও যে সময় নেই। তুমি কি কোনো সন্দেহ করছ তারাপদ? তোমার মা-বাবার আত্মার ইচ্ছে কি পূরণ করতে মন চাইছে না?”
তারাপদ কিছু খেয়াল না করেই বলল, “আত্মা কি কথা বলে না?”
“না। কখনো-সখনো এক-আধটা কথা কেউ বলেছেন। আমি কাউকে কথা বলতে দিতে চাই না।”
“আমার মা-বাবা যদি একটা কথা বলতেন।”
‘তারাপদ, আত্মারা তোমারা আমার মতন স্কুল দেহ নিয়ে থাকেন না। সূক্ষ্ম আত্মা, সে প্রায় বাতাসের মতন। তাঁদের দিয়ে কথা বলাবার চেষ্টা না করাই উচিত। যিনি বাতাসের আকার নিয়ে থাকেন, তাঁকে সবাক করা উচিত নয়। তাতে তাঁদের বড় কষ্ট হয়।…তবে আমি একটা কাজ করতে পারি। আত্মারা
যে কখনো কখনো নিজেদের আসা-যাওয়ার চিহ্ন রেখে যান, সে-প্রমাণ আমি তোমায় দেখাতে পারি? দেখবে?”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দনের চোখে কৌতূহল।
তারাপদ বলল, “দেখব। “
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “বেশ। তুমি দেখতে চেয়েছ যখন আমি দেখাব। ওই ঘন্টাটা আমার কাছে দিয়ে যাও।”
তারাপদ উঠল। ঘন্টাটা চন্দনের পায়ের দিকে, যেদিকে চন্দন আর মেয়েটি পায়ে পা ছুঁইয়ে বসেছিল। চন্দন মাটিতে হাত নামিয়ে ঘণ্টাটা তুলে দিল। তারাপদ ঘন্টা হাতে করে ভুজঙ্গর সামনে গিয়ে হাত বাড়াল ।
ভুজঙ্গভূষণ ইশারা করে ঘন্টাটা নিচে নামিয়ে রাখতে বললেন।
তারাপদ ঘণ্টা নামিয়ে রাখল। রেখে নিজের জায়গায় ফিরে আসার সময় শুনল ভুজঙ্গ ঘণ্টা বাজালেন। তাঁর মাথার দিকে টকটকে লাল আলো জ্বলে উঠল আবার। তারাপদদের ওপরকার আলো নিবে গেল। আর কী আশ্চর্য, ভুজঙ্গভূষণের পেছন দিক থেকেই পরদার আড়াল সরিয়ে সাধুমামা এলেন। তারাপদদের দিকে তাকালেন না সাধুমামা, বাধ্য অনুগত চাকরের মতন ভুজঙ্গর সামনে মাথা নিচু করে আদেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন।
ভুজঙ্গভূষণ হাতের ইশারায় তাঁর সামনের নিচু টেবিলটার দিকে দেখালেন। নিচু গলায় কী যেন বললেন, শুধু ‘মোম’ শব্দটা কানে গেল তারাপদর। সাধুমামা টেবিলের ওপর থেকে সামান্য লম্বা গোল মতন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রটা নিয়ে চলে গেলেন। কাঁচের গোল বয়ামটা পড়ে থাকল। তার মধ্যে যেন জল, অর্ধেকের বেশি বয়ামটা ভরতি।
ভুজঙ্গভূষণ তারাপদর দিকে তাকালেন। “তুমি কতটা সাহসী?” কথার মধ্যে যেন একটু ঠাট্টার ভাব ছিল।
তারাপদ কথার জবাব দিল না। সে সাহসী নয়। ঘরের মধ্যে যা ঘটছে, তা সহ্য করার মতন মনের জোরও তার থাকার কথা নয়। তবু, দু দিনের পর–আজ তৃতীয় দিনে কেমন করে সে সাহস দেখাতে পারছে–সে নিজেই জানে না।
“তোমার বন্ধুর সাহস বোধ হয় বেশি।”–ভুজঙ্গ চন্দনকে লক্ষ করে বললেন। “ডাক্তার লোক..আমার এখানে ভয় পাবার মতন কিছু নেই, তবু লোকে ভয় পায়। ভয় পায় কেন জানো? যারা ইহলোকের মানুষ, তারা পরলোকের কথা বোঝে না। পরলোক থেকে যাঁরা আসেন, তাঁদেরও বুঝতে পারে না। যা অজ্ঞেয়, তাকে মানুষ ভয় করে। তবে আত্মারা সচরাচর কারও ক্ষতি করেন না, যদি না আমরা তাঁদের বিরক্ত করি, অশ্রদ্ধা করি। কখনো কখনো কোনো দুষ্ট আত্মা হঠাৎ এসে যান। তাঁরাই বড় ভয়ংকর। তাঁরা কাউকে ভর করলে বিপদে পড়তে হয়। যাক, আবার একবার আমি চেষ্টা। করে দেখি তারাপদ–যদি কাউকে আনতে পারি। একটা কথা মনে রেখো, আত্মারা আমাদের ইচ্ছাধীন নন, আমরাই তাঁদের ইচ্ছাধীন। তোমার মা বাবাকে আজ অনেকক্ষণ আমরা ডেকে এনে কাছে রেখেছিলাম। এভাবে থাকতে ওদের বড় কষ্ট হয় । জানি না ওরা আর আসবে কিনা! তুমি কাকে আনাতে চাও আমি জানি না। “
তারাপদর মনে হল, মা-বাবার হয়ত কষ্ট হবে আসবে। হতেও তো পারে।
তারাপদ আচমকা বলল, “পরী আসবে না?”
“পরী?”
“পরীকে দেখতে আমার বড় ইচ্ছে করে। সে যদি একবার আসত.” বলতে বলতে আবেগে গলা ধরে গেল তারাপদর।
ভুজঙ্গভূষণ অল্প নীরব থেকে বললেন, “তুমি যে-পরীকে দেখেছ সেই পরী–তোমার সেই ছোট্ট পরী কি এখনও অতটুকু আছে! আত্মা অমর, তার কোনো পরিবর্তন থাকে না–তবু নিজেদের মতন করে তারা কিছুটা বদলে যায়।…ঠিক আছে, আমরা পরীকেই ডাকব। যদি সে আসে–এই ঘরে তার আসার চিহ্ন রেখে যাবে। তোমাদের আমি সাবধান করে দি, এবার যে আসবে–সে সরাসরি আসবে, মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে নয়, তোমরা কোনো রকম নড়াচড়া করবে না, কথা বলবে না, কিছু ধরবার চেষ্টা করবে না–আত্মাকে ধরার চেষ্টা করা মুখ । শান্ত, ধীর-স্থির হয়ে বসে থাকবে–। দেখো কী। হয়! পরী আসে কি আসে না।”
সাধুমামা আবার ফিরে এলেন। সেই পাত্রটা ভুজঙ্গভূষণের টেবিলের সামনে নামিয়ে রাখলেন। ভুজঙ্গ ঘরে আরও কিছুটা ধুনো-গুগগুল দিয়ে দিতে বললেন। ঘরের কোণে কোণে ধূপের বাটি ছিল ঢাকা, ধূপ দিতে বললেন।
সবাই যেন তৈরি ছিল। সাধুমামা চলে যেতেই মৃত্যুঞ্জয় এল। তার দু হাতে ধোঁয়া-ওঠা ধুনোর পাত্র। গলগল করে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ঘরে ধোঁয়া দিয়ে সে পাত্র দুটো আড়ালে রেখে দিল। একটুও আগুন বা আভা দেখা গেল না। বাটিতে ধূপ এনে সাধুমামা ঘরের কোণে আড়াল করা জায়গায় রেখে গেলেন। ধূপের আগুনও চোখে পড়ল না।
ঘরের সমস্ত বাতি নিভে গেল। ঘোর অন্ধকার । কোথাও এক বিন্দু আলো নেই। ভুজঙ্গভূষণ তাঁর জলদগম্ভীর গলায় আশ্চর্য সুরে দীর্ঘ এক সংস্কৃত মন্ত্র আবৃত্তি করতে লাগলেন। গানের সুরের মতন লাগছিল। ধোঁয়ায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, ধুনোর গন্ধ, গুগগুলের গন্ধ, ধূপের তীব্র এক গন্ধেও ঘর ভরে উঠল।
