ঘর একেবারে স্তব্ধ। তারাপদ ঘেমে উঠছিল। মা-ও কি সম্মতি জানাবে?
খুবই আশ্চর্য, সামান্য পরে ধীরে ধীরে ঘন্টাটা বেজে উঠল। একবার নয়, দু’বার ।
তারাপদ নির্বাক। তার সমস্ত কথা হারিয়ে গেছে। চন্দনের হাতটা জোরে চেপে রাখল তারাপদ। তার হাত ভিজে গিয়েছে।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “বিষ্ণু, বেণু–তোমরা বাবা-মা হিসেব তোমাদের ছেলেকে যা ভাল, যাতে তার ভাল হবে–তাই করতে বলেছ। তোমাদের ওপর আমি খুশি হয়েছি। তবু তোমরা আর-একটু কি থাকতে পারো না? আমি তোমাদের সামনে তোমাদের ছেলের সঙ্গে দুটো কথা বলে নিতে চাই।”
ঘণ্টা বাজল না। তারাপদ বুঝতে পারল না, বাবা-মা আছে না চলে গেল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তারাপদ তোমার মা বাবার ইচ্ছে তুমি শুনলে। এখন বলো, কী তুমি বলতে চাও।”
তারাপদ ভাবছিল কী জবাব দেবে। সে এখানে থাকবে না। কিছুতেই নয়। কিন্তু মা বাবা যদি চান তারাপদ এখানে থাকুক, তা হলে সে কী করবে? ঠিক এই মুহূর্তে তার মাথায় যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ ঘণ্টাটা আস্তে আস্তে বেজে উঠল, বেজে বেজে যেন দুরে কোথাও মিলিয়ে গেল।
ভুজঙ্গভূষণ কথা বললেন, “তোমার মা বাবা-বোন চলে গেল তারাপদ। ওরা চলে গেল।” বলার পর গম্ভীর মৃদুস্বরে তিনি একটা সংস্কৃত শ্লোক আওড়ালেন, মনে হল, আত্মাদের বিদায় জানালেন।
ঘরের বাতি জ্বলল। মাথার ওপরকার ফিকে আলো ।
তারাপদ চোখ খুলল । চন্দনও তাকাল। চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঝাপসা। ধীরে ধীরে দৃষ্টি পরিষ্কার হল সামান্য।
মেয়েটি হাত টেনে নিল, পা সরিয়ে নিল। কোনো দিকে তাকাল না। মুখ মাথা নিচু করে থাকল। তবু তার ফরসা মুখ আরও সাদা ভিজে ভিজে দেখাচ্ছিল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তারাপদ একবার মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল। কেমন যেন ঘুম-জড়ানো চোখ, আচ্ছন্নের মতন লাগছে।
ঘুমের মধ্যে যেন হেঁটে যাচ্ছে এইভাবে চলে গেল মেয়েটি।
মেয়েটি চলে যাবার পর ভুজঙ্গভূষণ আবার কথা বললেন। তাঁর দিকের সেই লাল আলো এখন আর জ্বলছে না। ঝাপসা অন্ধকারে ভৌতিক চেহারা নিয়ে তিনি বসে আছেন। ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তারাপদ, তোমার যা বলার আছে বলো।”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দনকে খানিকটা অন্যমনস্ক দেখাল। চোখাচোখি হওয়া সত্ত্বেও সে কোনো রকম ইশারা করল না।
তারাপদ অস্পষ্ট গলায় বলল, “আমি এখানে কেমন করে থাকব?”
“কেন?”
“কলকাতা ছেড়ে আমি কখনো থাকিনি। আমার বন্ধুবান্ধব, চেনা-জানা যারা, তারা সবাই কলকাতায় থাকে। তাদের ছেড়ে আমি এখানে একা একা কেমন করে থাকব?”
“একা একা কেন থাকবে, এই বাড়িতে লোকজন কম নেই, এরা থাকবে।” তারাপদ শুকনো গলায় ঢোক গিলল। “আমার মন টিকবে না।”
“প্রথম প্রথম টিকবে না, তারপর টিকে যাবে। আমার কেমন করে টেকে?”
“আপনি কতকাল ধরে এখানে আছেন। তা ছাড়া আরও একটা কথা রয়েছে–আপনি সাধনা করেন, কত বছর ধরে তন্ত্র-টন্ত্রর সাধনা করে আসছেন। আমি কিছু জানি না। আমার ওসব জিনিস পছন্দও হয় না। আমি কেমন করে আপনার মতন সাধক হব?”
ভুজঙ্গভূষণ শান্ত গলায় বললেন, “সে-চিন্তা আমার। তোমায় যে অনেক কিছু শেখাতে হবে–তা আমি জানি। তার ব্যবস্থাও আমি করেছি।”
তারাপদ আবার চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দনও তার দিকে তাকিয়ে আছে।
কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না তারাপদ; পরে বলল, ধরুন যদি এমন হয়, আজ আমি আপনার শর্তে রাজি হলাম, তারপর আপনি যখন থাকবেন না–তখন শর্ত ভাঙলাম–তখন কী হবে?”
ভুজঙ্গভূষণ স্বাভাবিক গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি তোমার মা বাবার মনের ইচ্ছে জেনেছ। কাল আবার আমি ওদের ডাকব। ওই আত্মাদের কাছে তোমায় শপথ করতে হবে।…তারাপদ, মৃত পিতা-মাতার আত্মার সামনে শপথ করে সেই শপথ যদি তুমি ভাঙো, তার পরিণতি যে কী হবে–তুমি কল্পনাও করতে পারছ না। তোমার সর্বনাশ হয়ে যাবে।..তা ছাড়া, আমার নির্দেশ আছে, অন্তত তিন বছর তুমি পুরনো সমস্ত সংসর্গ থেকে দূরে থাকবে। এই বাড়িতে তোমায় থাকতে হবে। কোথাও যাবে না। এখানে সাধনা করবে। যদি তিন বছর তুমি আমার নির্দেশ-মতন থাকতে পারো, তবেই তুমি আমার সমস্ত কিছুর একমাত্র উত্তরাধিকারী হবে। নয়ত নয়। আর এই তিন বছর তোমার থাকা, খাওয়া-পরার কোনো কষ্ট হবে না, দরকার পড়লে কিছু কিছু টাকা তুমি খরচ করতে পারবে। তিন বছর পরে তুমি বিষয়সম্পত্তি পেয়ে যা খুশি করতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, তোমার মাথার ওপর আত্মারা থাকবে–তোমার মা-র, বাবার, আমার ।…তিন বছর পরে আমার বিশ্বাস, তুমি আজ যা ভাবছ তা আর ভাবতে পারবে না।”
তারাপদ কোনো কালেই অঙ্ক জিনিসটা বোঝে না; তার মাথায় ফন্দি ফিকিরও খেলে না। তবু ভুজঙ্গভূষণের কথা থেকে বুঝতে পারল, লোকটি ভীষণ চতুর, সবদিক দিয়েই পথ আগলে রেখেছে।
তারাপদ চুপ। কী বলবে? সরাসরি না করে দেবে? কী দরকার তার এত সম্পত্তিতে? কোন দুঃখে সে তান্ত্রিক-টান্ত্রিক হতে যাবে? কেনই বা সে ভুজঙ্গভূষণের মতন আত্মা-টাত্মা নামাতে যাবে? সে যা আছে–এই কি যথেষ্ট নয়? সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল সাধুমামার কথা, কিকিরার কথা। সবাই তাকে বলেছেন, ভুজঙ্গ শয়তান, ভুজঙ্গ পাপী। সাধুমামা মিনতি করে বলেছেন, বাবা
তুমি আমাদের এই নরক থেকে উদ্ধার করো। কেমন করে উদ্ধার করবে। তারাপদ? তিন বছর এই পুরীতে নিজে বন্দী থেকে সমস্ত কিছু নিজের আওতায় আনার পর? কিন্তু আত্মা? মা-বাবার মৃত আত্মার সামনে শপথ নেবার পর সে কি অমন কাজ করতে পারবে? . তারাপদ কথা বলছে না দেখে ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তুমি মন স্থির করতে পারছ না?”
