চন্দন বলল, “তাই মনে হয়।”
আরও খানিকটা এগিয়ে চন্দন ঘাড় ঘোরাল পিছনে। সাইকেলে-চড়া লোকটিকে দেখতে পেল না; কিকিরাকেও চোখে পড়ল না।
দুপুরটা ভালই কাটল। ভুজঙ্গভূষণের লোকজন আতিথ্যের ব্যাপারে কোনো কৃপণতা করল না। খাওয়া, শোওয়া, বাগানে ঘুরে বেড়ানো–কোনো দিকেই কারও কোনো বাধা নেই। কিন্তু তারাপদদের কেমন মনে হচ্ছিল, তারা যেন কাদের নজরে নজরে রয়েছে। সাধুমামার সঙ্গে বার দুই চোখাচুখি হয়েছে, হওয়া মাত্র সাধুমামা সরে গেছেন।
বিকেল পড়তে না পড়তে ফুরিয়ে গেল। তারপর সন্ধে। ৪ ।
তারাপদর তৈরি । আজ আবার সেই রহস্যময় ঘরেগিয়ে বসতে হবে। ভুজঙ্গ গতকালই জানিয়ে দিয়েছিলেন। আজ আবার কী দেখতে হবে কে জানে?
তারাপদ বরাবরই ভিতু ধরনের। বড় বেশি নিরীহ। কিকিরা যতই সাহস দিন, ভূত, প্রেত, আত্মা বিশ্বাস করুক আর না করুক তারাপদ, তবু বিকেল থেকেই বেশ বিচলিত বোধ করতে লাগল। সন্ধের মুখে তার মুখ কেমন শুকিয়ে এল। তারাপদ চন্দনকে বলল, “চাঁদু, আমার এ-সব ভাল লাগে না। মিস্ট্রিই বল আর অলৌকিক ব্যাপারই বল–কোনোটাই আমি সহ্য করতে পারি না। “ চন্দন বলল, “উপায় নেই ভাই, ভুজঙ্গর সব রকম খেলা দেখতেই হবে। লোকটার মনে কী আছে এখনো বোঝা যায়নি।”
তারাপদ বলল, “আজ আমি স্পষ্টই বলব, ভুজঙ্গকে বলে দেব–আত্মাটাত্মা। আমি দেখতে চাই না। আপনার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে চাই। আপনার মুখ দেখতে চাই। হয় সাফসুফ কথা বলুন মশাই, না হয় ছেড়ে দিন, বাড়ি চলে যাই–আপনার সম্পত্তি আমি চাই না।”
দুই বন্ধুর কথাবার্তার মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় এসে তাদের ডাকল। “এসো।”
.
সেই একই ঘর । কালকের মতনই অন্ধকার । বাতি যেটুকু জ্বলছে তাতে পাশের মানুষকেও আবছা দেখায়। ধূপধুনো গুগগুলের সেই রকম গন্ধ । তফাতের মধ্যে আজ একটা ছোট টেবিল রয়েছে গোল ধরনের, তার তিন দিকে চেয়ার।
তারাপদরা বসল।
ওরা বসার পর আচমকা কোথা থেকে ভারী গলায় স্তোত্র পাঠের মতন গানের সুর ভেসে এল । তারপর সেটা স্পষ্ট হল, যাকে বলে। জলদগম্ভীর–সেই স্বরে কে যেন স্তোত্র পাঠ করতে লাগল। সংস্কৃত স্তোত্র । কে কোথায় গান করছে বোঝবার আগেই সেই গম্ভীর স্বর যেন কেমন অন্যমনস্ক করে ফেলল তারাপদকে ।
স্তোত্রের মধ্যেই ভুজঙ্গভূষণ এলেন। কখন এলেন বোঝা গেল না। তাঁর বসার আসনেই বসলেন। মাথার ওপর সেই লাল আলো জ্বলে উঠল। ভুজঙ্গভূষণের পরনে রক্ত-গৈরিক বসন। একটা বড় রুদ্রাক্ষ ঝুলছে গলায় । মুখের ওপর সেই আবরণ।
স্তোত্র পাঠ বন্ধ হয়ে গেল।
ভুজঙ্গভূষণই কথা বললেন প্রথমে। বললেন, “তারাপদ, কাল তুমি ভয়, পেয়ে গিয়েছিলে। তোমার বন্ধুও ভয় পেয়েছিল। আজ ভয় পেয়ো না যাঁরা তোমার আত্মীয়–মা, বাবা, বোন–”
“মা, বাবা, বোন-” তারাপদ চমকে উঠে বলল, গলার স্বর যেন বুজে আসছে।
“হ্যাঁ, তোমারই নিজের লোক। এঁদের আত্মা যখন আসেন তখন তোমার ভয় কী? এঁরা কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবেন না। অনেক দূর থেকে তারা আসেন, আসতে তাঁদের কষ্টও হয়। এই মর্ত্যলোকে তাঁরা আসতে চান না, তবুও আমরা যখন ডাকি, না এসে পারেন না। আজ আমি তোমার মাকে প্রথমে তাকব।”
“মা?”
“তোমার মা আমার আত্মীয়া। আমরা তাকে ছেলেবেলায় বেণু বলে ডাকতাম। বলতে গেলে আমার বোনেরই মতো। আমি বেণুকে ডাকব।”
তারাপদর গায়ে কাঁটা দিল। মা! মা আসবে? কোন্ ছেলেবেলায় বাবাকে সে হারিয়েছে, স্কুলে পড়ার সময়, তারপর মা-ই ছিল তার সব । কত কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছে, সেই মা আজ আসবে? তার কাছে? মা তা হলে আজও আছে, এ-জগতে নয়, অন্য জগতে, হয়ত স্বর্গে। মা কি তাকে দেখতে পায়?
তারাপদর বুকের মধ্যে কত দুঃখ যেন টনটন করে উঠল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তোমার মা আসবে। এই ঘরেই আসবে। কিন্তু তুমি তাকে দেখতে পাবে না। আত্মা অদৃশ্য। ছায়ারূপে তাঁরা আসেন, চলে যান। মানুষের চোখ তাঁদের দেখতে পায় না। কোনো কোনো চিহ্ন তাঁরা রেখে যান, স্পর্শও দিয়ে যান–কিন্তু সব সময় নয়, কখনো কখনো, এসব কাজ করতে তাঁদের কষ্ট হয়।”
কথা শেষ করে ভুজঙ্গভূষণ পায়ের কাছে পড়ে থাকা ঘণ্টা তুলে নিয়ে বাজালেন।
ঘণ্টা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ভুজঙ্গভূষণের পিঠের দিক থেকে ভেলভেটের পরদা সরিয়ে একটি মেয়ে এল। ভাল করে দেখা যায় না মেয়েটিকে। তবু যেটুকু দেখা গেল তাতে মনে হল, কিশোরী মেয়ে, বছর পনেরো হয়ত হবে বয়স, রোগা দেখতে, ধবধবে ফরসা রঙ, লম্বাটে মুখ, মাথার চুল এলো করা, পুনে ঘন কালো শাড়ি জামা। মেয়েটি এল। কিন্তু কিছুই দেখল না । কোনো দিকেই তাকাচ্ছিল না। ভুজঙ্গভূষণের পায়ের দিকে রাখা ঘণ্টাটা তুলে লি। নিয়ে তারাপদদের কাছে এসে বসল। ঘণ্টাটা নিচে টেবিলের তলায় নামিয়ে রাখল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তারাপদ, এই মেয়েটির মধ্যে দিয়ে তোমার মা হনবেন। ও হল আধার, ওর মধ্যে দিয়ে তোমার মাকে আসতে হবে। তোমরা দুজনে ওর হাতে হাত ছুঁয়ে বসো। পায়ে পা ছুঁইয়ে রাখবে। ও তোমাদের দেখিয়ে দেবে।”
তারাপদ কিছু ভাবতে পারছিল না। বিহ্বল বোধ করছিল।
চন্দনের মনে হল, এই হয়ত সেই মেয়ে–গতকাল যাকে সে এক লহমার জন্যে দোতলায় দেখেছিল।
ছোট গোল টেবিলের তিন দিকে চেয়ার। মেয়েটি একটি চেয়ারে বসল। ইশারায় তারাপদদের চেয়ার সামান্য সরিয়ে নিতে বলল। চেয়ার সাজিয়ে নেবার পর দেখা গেল, টেবিলের ওপর হাত ছড়ালে তারাপদর একটা হাত মেয়েটির হাত ছোঁয়, অন্য হাত চন্দনের হাত ছোঁয়। চন্দনেরও সেই একই অবস্থা, তার বাঁ হাত তারাপদর হাত ছুঁয়ে রয়েছে, ডান হাত মেয়েটির হাত ছুঁয়েছে। এ যেন বাচ্চা বয়েসে সেই গোল হয়ে হাতে হাত ধরে খেলার মতন।
