মেয়েটি তার পা দু পাশে বাড়িয়ে দিল। ইশারায় তারাপদদের বলল, ওদের এক একটা পা দিয়ে তার পা ছুঁয়ে থাকতে।
সামান্য বিব্রত বোধ করলেও তারাপদরা পা বাড়াল ।
মেয়েটির পা বড় শক্ত শক্ত লাগল তারাপদর। অবশ্য বুড়ো আঙুলের কাছটায় আলগা করে ছুঁয়ে থাকল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তুমি এবার মনে মনে তোমার মাকে ডাকো, তারাপদ। চোখ বন্ধ করে। একমনে। আমিও তাকে ডাকছি।” বলে ভুজঙ্গভূষণ তাঁর গম্ভীর গলায় কিসের যেন একটা মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন।
ঘরের সমস্ত আলো নিবে গেল। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার।
তারাপদ চোখ বন্ধ করে মার কথা ভাবতে লাগল। তার ভয় হচ্ছিল; তবু সে মা-র কথা না ভেবে থাকতে পারল না। চন্দন প্রথমটায় চোখের পাতা খুলে রেখেছিল। কিন্তু চোখ খুলে রাখা না রাখা সমান; দু চোখই যেন অন্ধ । কিছু দেখা যায় না; শুধু কালো আর কালো। চন্দনও চোখের পাতা বুজে ফেলল। তারাপদর মাকে সে দেখেছে, ভালো করেই জানত তাঁকে। চন্দনও তারাপদর মার কথা ভাবতে লাগল। আর মাঝে মাঝে অনুভব করছিল, তার একটা হাতের আঙুল মেয়েটির হাতের ওপর রাখা, অন্য হাতটি তারাপদর হাতের ওপর রয়েছে।
কতক্ষণ সময় যেন চলে গেল। কোনো শব্দ নেই। শেষে ভুজঙ্গভূষণ চাপা গলায় বললেন, “বেণু, তুমি এসেছ? তুমি কি এসেছ?”
কোনো সাড়াশব্দ নেই। আবার চুপচাপ। আরও কিছু সময় গেল।
ভুজঙ্গভূষণ এবার আবার বললেন, “বেণু, তুমি এসেছ? আমরা তোমায় ডাকছি, তুমি এসেছ?”
হঠাৎ টেবিলের তলার দিকে মৃদু করে ঘণ্টা বেজে উঠল ।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “বেণু, তুমি যদি সত্যি সত্যি নিজে এসে থাকো—ঘণ্টাটা একবার বাজাও, বাজিয়ে থামিয়ে দাও, আবার বাজাও।”
ঘণ্টা সেইভাবেই বাজল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তোমার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছ? যদি পাও অন্যভাবে ঘণ্টা বাজাও। একটানা।”
এবারও সেই রকম বাজল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তোমার ছেলেকে আমি এখানে এনেছি। তুমি তাকে বলল আমার ইচ্ছা মতন সে যেন চলে। আমি তার ভাল চাই।”
ঘন্টাটা আস্তে আস্তে বাজল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “তোমার সঙ্গে আর কেউ এসেছে বেণু? কে এসেছে?”
ঘণ্টা বাজল না।
ভুজঙ্গভূষণ কেমন আকুল স্বরে বললেন, “কে এসেছে বেণু? তোমার স্বামী?”
ঘণ্টা এবার জোরে বেজে উঠল। তারাপদ সমস্ত কিছু ভুলে চিৎকার করে উঠল, বাবা!”
বলার সঙ্গে সঙ্গে সে হাত টেনে নিয়েছিল। মেয়েটি কেমন শব্দ করে উঠল । যেন ঘুমের ঘোর থেকে চমকে উঠে শব্দ করেছে।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “কী হল? কী হল?”
বাতি জ্বলে উঠল। সেই মৃদু আলো। মেয়েটি টেবিলের ওপর মুখ রেখে। পড়ে আছে। হাত ছড়ানো। থরথর করে কাঁপছে।
ভুজঙ্গভূষণ তারাপদকে বললেন, “কী করেছিলে তোমরা? বেণু চলে গেছে।”
তারাপদ ভয়ে ভয়ে বলল, “কিছু করিনি । হাত ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
কঠিন গলায় ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “মূর্খ!…সমস্ত বৃথা গেল।..যাও, তোমরা চলে যাও। ওকে ছুঁয়ো না। ধীরে ধীরে ও সুস্থ হয়ে উঠবে।”
তারাপদরা অপরাধীর মতন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
.
আট
সকালে তারাপদর চেহারা দেখে চন্দন বেশ ঘাবড়ে গেল। মুখ কেমন থমথম করছে তারাপদর, উদাস চোখ, বার বার নিশ্বাস ফেলছে শব্দ করে, কিসের এক দুঃখ যেন তার সমস্ত মুখ ম্লান করে রেখেছে। কথাবার্তা বলতেও তার তেমন ইচ্ছে করছি না। আপন মনে কত কী যে ভাবছে তারাপদ, কে জানে!
চন্দন বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলল, “তুই এত মুষড়ে পড়লে চলবে কেন? কী হয়েছে তোর?”
তারাপদ চুপচাপ, কথার জবাবই দেয় না, শেষে বলল, “কাল আমার মা এসেছিল। একবার যদি দেখতে পেতাম…।”
চন্দন বলল, “তুই সত্যিই বিশ্বাস করিস মাসিমা এসেছিলেন?”
“তুই করিস না?”
চন্দন বুঝতে পারছিল না, বিশ্বাস করা উচিত কি উচিত নয়। সে বিশ্বাস করতেও চাইছে না, আবার অবিশ্বাস করারও জোর পাচ্ছে না।
তারাপদ ধরা-ধরা গলায় বলল, “মার সঙ্গে বাবাও এসেছিল, চাঁদু। আমার বাবা। স্কুলে যখন ক্লাস এইটে পড়ি, সেই সময় বাবা মারা গেছে; এত বছর পরে বাবা এসেছিল…; ইস্ আমি যে কী করলাম!”
তারাপদর চোখ ছলছল করে উঠল; ঠোঁট কাঁপতে লাগল । চন্দন বুঝতে পারল না কী বলবে। তার খারাপ লাগছিল। মাবাবার জন্যে বন্ধুর এই দুঃখ সে বুঝতে পারে, কিন্তু কেমন করে সান্ত্বনা দেবে জানে না। মাথা চুলকে চন্দন বলল, “তারা, এমন তো হতে পারে এ সবই মিথ্যে।”
তারাপদর ভাল লাগল না কথাটা। বন্ধুর দিকে ক্ষোভের চোখে তাকাল। বলল, “মিথ্যে?”
“কিকিরা তো তাই বলেছেন।”
“কিকিরা যা বলবেন তাই সত্যি হবে? বেশ, তুই বল–এটা কেমন করে সম্ভব হল? আমি ওই মেয়েটার একটা হাত আর একটা পা ছুঁয়ে রেখেছিলাম। একবারও ছাড়িনি। তুইও ছুঁয়ে ছিলি। ঠিক কি না?”
“হ্যাঁ।”
“তা হলে ঘন্টাটা কেমন করে বাজল? কে বাজাল?”
চন্দন জবাব দিতে পারল না। সে এই ব্যাপারটা নিয়ে কাল রাত থেকেই। ভেবেছে, ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায়নি। এক যদি এমন হয় যে, ওই ঘুটঘুঁটে অন্ধকার ঘরে কেউ লুকিয়ে এসে ঘণ্টাটা বাজিয়ে দিয়ে যায়! কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব? লোকটা আসবে, বাজাবে, চলে যাবে–আর তারা দুজনে কিছুই বুঝতে পারবে না?
চন্দন বলল, “আমিও বুঝতে পারছি না। আচ্ছা তারা, ঘণ্টা যেটা বেজেছিল সেটা আমাদের টেবিলের তলায় ছিল সেটা ঠিক তো?”
“নিশ্চয়। কেন, তোর সন্দেহ হচ্ছে?”
“না, আমারও হচ্ছে না। তবু তোকে কাল যা বলছিলাম রাত্রে, কেউ যদি লুকিয়ে এসে বাজিয়ে দিয়ে যায়?”
