“আপনাকে যদি দেখতে পায়?”
“পাবে না স্যার, পাবে না। আমি মিলিটারির পজিসন নিয়েছি।”
চন্দন একটা সিগারেট ধরাল।
কিকিরা বললেন, “দিন স্যার, একটা ধোঁয়া দিন। টানি।”
কিকিরা সিগারেট নিয়ে ধরালেন।
তারাপদ খুব সংক্ষেপে গতকালের ঘটনা বলল। বলে ভুজঙ্গভূষণের সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণটা দিল। তার গলার স্বর থেকে বোঝা যাচ্ছিল, তারাপদ উত্তেজনা, ভয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বিধার মধ্যে রয়েছে।
কিকিরা মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। আজ তাঁর বেশবাস খানিকটা অন্যরকম। পরনে পাজামা, গায়ে কেমন এক আলখাল্লা ধরনের জামা। মাথায় গরম হনুমান-টুপি। টুপির তলার দিকটা গুটোনো। পায়ে খাকি কেডস্ জুতো।
চন্দন বলল, “মশাই, ভুজঙ্গ আত্মা নামায়; আপনি জানেন?”
কিকিরা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। “জানি।”
“ব্যাপারটা কী?”
“ব্যাপারটা আপনারা এমনিতে বুঝবেন না। একে বিদেশিরা পেঁয়াস। বলে।”
“সেঁয়াস? সেটা আবার কী?”
“সেটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, আত্মাটাত্মা নামানো হয়, আত্মাদের দিয়ে নানারকম ভেলকি দেখানো হয়।”
“আপনি আত্মা মানেন?”
“আমার মানামানির কথা জিজ্ঞেস করবেন না। আত্মা মানি কিনা আমি জানি না। তবে ভুজঙ্গর আত্মাটাত্মা মানি না।”
তারাপদ বলল, “তা হলে ও কেমন করে ওই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটাল?
কিকিরা চুপ করে থেকে কিছু ভাবলেন, তারপর বললেন, “কেমন করে ঘটল তা আমি বলতে পারব না। নিজের চোখে দেখলে বলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু স্যার, আমি বলছি, এ হল ভেলকি। বড় রকমের ম্যাজিক। বিশ্বাস করবেন না। ভুজঙ্গ এই ভেলকি দেখিয়েই তার প্রতিপত্তি করেছে, বহু লোকের সর্বনাশও করেছে সেই সঙ্গে। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত পাগলের মতন হয়ে গেছে, কারও কারও যথাসর্বস্ব গিয়েছে। আপনারা ওই পিশাচের ধোঁকায় ভুলবেন না।”
চন্দন বলল, “আপনি আমাদের কী করতে বলছেন তা হলে?”
“আমি বলছি, আপনারা রয়ে সয়ে থাকুন। ভয় পাবেন না। চোখ খুলে ভুজঙ্গর বাড়ির সবকিছু লক্ষ করার চেষ্টা করুন। আপনাদের ও প্রাণে মারার সাহস করবে না।…শুনুন স্যার, এই মানুষটা–কিকিরা দি গ্রেট–একেবারে অপদার্থ নয়, যশিডিতে আমার অনেক মক্কেল আছে,তার মধ্যে একজন রয়েছে পুলিসের লোক–তেওয়ারিসাহেব। আমি তাঁকে বলে এসেছি। ভুজঙ্গ যদি বেশি চালাকি করার চেষ্টা করে, এবার আমি ওকে ছাড়ব না।”
তারাপদ কিকিরার মুখ দেখতে লাগল। মানুষটির চোখ দেখলে বোঝা যায়–কিসের যেন এক জ্বালা তার চোখে ঝকঝক করে উঠেছে।
মাথার টুপিটা খুলে নিলেন কিকিরা, রোদে মাথা তেতে উঠেছে। বললেন, “ভুজঙ্গ এখনো তার আসল চাল চালেনি, স্যার। কাল সে আপনাদের ভেলকি দেখিয়ে ঘাবড়ে দেবার চেষ্টা করেছে। ধরুন আজ কিংবা আগামী কাল সে আসল চাল চালবে।”
“কী চাল?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল ।
কিকিরা বললেন, “আমার মনে হচ্ছে–চালটা আপনাকে নিয়ে। ভুজঙ্গ হয়ত আপনাকেই সব দিয়ে যেতে চায়, কিন্তু দিয়ে যাবার আগে সে আপনার সঙ্গে শর্ত করতে চাইবে। কিসের শর্ত আমি বুঝতে পারছি না! ভুজঙ্গ এত শঠ আর শয়তান যে তার চাল আগে থেকে বোঝা যায় না। তাই বলছি–আপনারা ধৈর্য ধরে থাকুন। দেখুন। ভয় পাবেন না। আমি এখানেই থাকব। আপনাদের খোঁজখবর করব। যদি কোনো বিপদে পড়েন ভুজঙ্গর আস্তাবলে রামবিলাস বলে যে কোচোয়ান আছে তাকে বলবেন। রামবিলাস আমার লোক। বুঝলেন? আমি কোথায় থাকব সে জানে?”
তারাপদরা অবাক হয়ে কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকল। চন্দন বলল, “ভুজঙ্গের বাড়িতে আপনার লোক কে কে আছে?”
কিকিরা যেন কতই লজ্জা পেয়েছেন, এমনভাবে হাসলেন। বললেন, “স্যার, আমার ধাতটাই হল ম্যাজিশিয়ানের, সব খেলাই ধীরেসুস্থে দেখাতে হয়, ঝট করে দেখাতে নেই। যথাসময়ে সবইদেখতে পাবেন।”
তারাপদ বলল, “কিকিরাবাবু, আপনি সাধুমামাকে চেনেন?
কিকিরা কেমন একটু হেসে বললেন, “চিনি।”
“কেমন চেনেন?”
“ভাল করেই চিনি। দয়া করে আমায় এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আপনারাও আর দেরি করবেন না। এবার ফিরতে শুরু করুন। ওই লোকটার ফেরার সময় হয়ে গেছে।…শুনুন, আর-একটা কথা বলে দিই। বাড়িতে এমনভাবে থাকবেন যেন ভুজঙ্গর ভেলকি দেখে আপনারা একেবারে ঘাবড়ে গিয়েছেন। কাউকে বুঝতে দেবেন না, আপনারা ব্যাপারটা সন্দেহ করেছেন।…আর হ্যাঁ, কাল আমি আপনাদের জন্যে একটা জিনিস নিয়ে আসব। আজকের রাত্রের খেলাটা আগে দেখে নিন, দেখুন ভুজঙ্গ কী করে।”
তারাপদরা উঠতে লাগল। “কাল কোথায় দেখা হবে?”
“কাল আপনারা ওই জঙ্গলের দিকে বেড়াতে যাবেন। আমি থাকব । একটা ভাঙা সাঁকো আছে, নালার মতো নদী, শুকনো; ওখানে থাকব।”
উঠে দাঁড়িয়ে চন্দন হেসে বলল, “স্যার, আজ আপনার একটা ইংলিশ শুনলাম না।”
কিকিরা হেসে বললেন, “শুনবেন, ঠিক সময়ে শুনবেন। এখন ভুজঙ্গ আমার ইংলিশ স্টিম করে দিচ্ছে। পেটে কিছু থাকছে না, স্যার। পেটে না থাকলে কি করে ইংলিশ হবে? ইংলিশ হল পেট্যারন্যাল ব্যাপার, পেট প্লাস ইন্টারন্যাল সন্ধি করুন…”
চন্দন হো হো করে হেসে উঠল।
পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে দুজনেই রাস্তায় নেমে এল। হাত নাড়ল। কিকিরাও হাত তুললেন।
ফিরতে লাগল দুজনেই।
তারাপদ বলল, “চাঁদু, আমার মনে হচ্ছে–ভুজঙ্গর বেশ কিছু শত্রু আছে। তারা একটা দল করেছে। সেই দলে সাধুমামা, কিকিরা, রামবিলাস না কি নাম বললেন কিকিরা–ওরা আছে। আর ভুজঙ্গর দলে আছে তার চেলারা।”
