চন্দন বলল, “আমি ঠিকই বলছি। তুই ভুজঙ্গভূষণের সম্পত্তির মালিক হতে যাচ্ছিস। ও বেটার কোনো রাইট নেই এখানে; তোর আছে। তুই এখন থেকেই এটা দেখিয়ে যা।”
“তারপর যদি–”
“যদি-টদি বাদ দে; নো রিস্ক নো গেই।…তুই চালা না–তারপর আমি আছি।” বলে চন্দন মাতব্বরের মতন মৃত্যুঞ্জয়কে ডাকল।
মৃত্যুঞ্জয় কাছে এলে তারাপদ ছোট ফটকের তালা খুলে দিতে বলল। ঠিক হুকুমের গলায় অবশ্য বলতে পারল না।
“খুবই আশ্চর্য যে, মৃত্যুঞ্জয় সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করল, তারাপদরা কোথায় যাবে? তারপর চাকরকে ডেকে তালা খুলে দিতে বলল।
ফটকের বাইরে এসে তারাপদরা হাঁটতে লাগল। মাঠ ময়দান, গাছপালা, দূরের জঙ্গল–যেদিকে চোখ যায়–সব যেন রোদে ভেসে যাচ্ছে। শীতের রোদ, তবু কী গাঢ়, কত উষ্ণ। আকাশ নীল, রোদ যেন উপচে পড়ছে আকাশ থেকে; মাঠঘাটের ভেজা ভাব শুকিয়ে এসেছ, শিশির আর চোখে পড়ছে না। এখনো শীতের সেই শনশন হাওয়া দেয়নি, অল্পস্বল্প যা আছে তাতে ভালই লাগে।
কাল রাত্রের সেই অন্ধকার রহস্যময় ঘর, সেই আত্মার ব্যাপার-স্যাপার, বলের নাচ যেন অন্য একটা জগৎ। আর এখানকার এই রোদ, মাঠ, কুলঝোঁপ, আতাগাছের ডালে বসে পাখির ডাক–এ আর-এক জগৎ। এই জগৎ তারাপদরা বুঝতে পারে, অনুভব করতে পারে, কিন্তু কালকের ওই রহস্যময় ঘটনার কিছুই বুঝতে পারে না। মনে হয় যেন দুঃস্বপ্ন।
হেঁটে আসতে আসতে দুজনেই গল্প করছিল।
তারাপদ জিজ্ঞেস করল, “চাঁদু, তুই তো ডাক্তার । আত্মা-টাত্মা কখনো দেখেছিস?”
“না ভাই, আমি মর্গও দেখেছি, বাট নো আত্মা।”
“আমি প্ল্যানচেট দেখেছি,” তারাপদ বলল, “পরলোক-টরলোক নিয়ে একবার একটা বইও পড়েছিলাম। কিছু বুঝিনি।”
“এ-সব গাঁজাখুরি…।”
“কিন্তু কাল আমরা নিজের চোখে যা দেখলাম–?”
“তাই তো ভাবছি। পি সি সরকারের ম্যাজিক যেন!”
এমন সময় একটা দেহাতী গোছের লোককে সাইকেলে করে আসতে দেখা গেল দূরে। ভুজঙ্গভবনের দিক থেকে আসছে। চন্দনের চোখে পড়েছিল।
চন্দন বলল, “তারা, ওই লোকটা এদিকে কেন আসছে?”
তারাপদ দেখল। বলল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি দেখতে আসছে বোধ হয়।”
“তার মানে ভুজঙ্গ আমাদের ওপর চোখ রাখতে চায়? না, মৃত্যুঞ্জয়?”
“বুঝতে পারছি না।”
দুজনেই হাঁটতে লাগল, দাঁড়াল না। চন্দন হঠাৎ বেয়াড়া গলায় গান গাইতে শুরু করল, যেন খুব খুশ মেজাজে রয়েছে।
লোকটা কাছাকাছি এল। পুরোনো সাইকেল, মাঝ বয়েসী লোক; বাঙালি বলে মনে হয় না। তারাপদদের কাছাকাছি এসেও দাঁড়াল না। একবার শুধু দেখল, খাতিরের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালো, তারপর চলে গেল।
সাইকেল খানিকটা এগিয়ে যেতে চন্দন বলল, “তারা, আমার মনে হচ্ছে লোকটা নজর রাখার জন্যে এসেছে। কিন্তু কেন? ভুজঙ্গ না মৃত্যুঞ্জয়, কার হুকুমে ও নজর রাখছে? আমরা পালিয়ে যাব ভাবছে নাকি?”
তারাপদ বলল, “চাঁদু, সম্পত্তির নিকুচি করেছে, চল, আমরা এই ভূতের বাড়ি থেকে পালাই।”
মাথা নেড়ে চন্দন বলল, “এত সহজে পালাব কেন রে? আরও দু-একটা দিন দেখি । অন্তত তোর পিসেমশাইয়ের অরিজিন্যাল মুখটা একটু দেখি। পালাবার জন্যে তুই ভাবিস না। ওটা আমার হাতে ছেড়ে দে। সে ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। পালাবার জায়গা দেখে রেখেছি ভাই।
আরও একটু এগিয়ে আসতেই আচমকা পাখির ডাকের মতন শোনা গেল । ডাকটার একটা আলাদা সুর ছিল, কানে লাগে। চন্দন দাঁড়িয়ে পড়ল, তার দেখাদেখি তারাপদও দু-চার পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। চন্দন আশেপাশে তাকাল । ডানদিকে খানিকটা উঁচু জমি, মস্ত মস্ত দুই পাথর, আশেপাশে ছোট ছোট পাথর-টুকরো পড়ে আছে। রুক্ষ জায়গা, কাঁকরভরা মাটি। কোনো গাছপালা চোখে পড়ছে না। কাঁটা গাছের ছোট্ট একটু ঝোঁপ পাথরের পাশে। কোথাও কোনো পাখির চিহ্ন নেই।
চন্দন কিছু বোঝবার আগেই একটা ছোট ঢিল এসে পায়ের কাছে পড়ল । তারপরেই পাথরের আড়াল থেকে কিকিরার মুখ উঁকি মারল।
“আরে, আপনি?” চন্দন অবাক । তারাপদকে বলল, “কিকিরা।”
হাতছানি দিয়ে কিকিরা ডাকলেন।
তারাপদরা এগিয়ে গেল ।
কিকিরা বললেন, “এখানে আসুন স্যার, গুঁড়ি মেরে চলে আসুন।”
তারাপদরা পাথরের আড়ালে গেল। কিকিরা বললেন, “একটু আগেই এক চেলা গেল, দেখেছি। দেখেই শেলটার নিয়েছি।”
“আমরা আপনার কাছেই যাচ্ছিলুম।”
“আমিও আপনাদের খোঁজে আসছিলাম। মনে হচ্ছিল, দেখা হয়ে যেতেও পারে।”
“ওই লোকটাকে আপনি চেনেন?”
“না। তবে আন্দাজ করতে পারি।”
“ও কি আমাদের ওপর নজর রাখছে?”
“মনে তো হয়, স্যার। তবে ও বেটা অনেকটা চলে গেছে। দেখতে পাবে আর। যদি দেখি ফিরে আসছে, আপনাদের বলব। আপনারা সোজা ভুজঙ্গ ভয়ালের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করবেন।”
চন্দনরাও একবার দেখে নিল। লোকটা বেশ দূরে চলে গেছে। সেখান থেকে পাথরের আড়ালে তাদের দেখতে পাবে না। না গেলে কী ভাববে বলা মুশকিল। মাঠের মধ্যে দুটো লোক নিশ্চয় ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে না। কিন্তু অন্য সন্দেহই বা কী করবে? ভাববে, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কিকিরা বলল, “খবর বলুন, স্যার।”
তারাপদ বলল, “খবর অনেক। কিন্তু এখানে বলব?”
“এখানেই স্যার নিরাপদ। যদি লোকটা এখনি না ফিরে আসে,তা হলে এই হল বেস্ট জায়গা।”
“যদি আসে?”
“সামনে গিয়ে মনের সুখে নিজেরা গল্প করবেন, লাফাবেন, নাচানাচি করবেন, যেন ওর মনে হয় আপনারা কলকাতার লোক, ছেলেমানুষ, বাইরে বেড়াতে এসে বেজায় খুশি হয়েছেন। “
