মানুষটি যে কী পরেছে বোঝা যাচ্ছিল না। হয়ত আলখাল্লা। রক্ত-গৈরিক রঙের। তার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত একটা ঢাকা পরানো, শুধু নাক মুখ আর চোখের জায়গাটা ভোলা। তারাপদরা প্রচুর ইংরেজি ছবি দেখেছে। তাদের মনে হল, এককালে এই রকম মুখোশ পরে রাজারাজড়ারা গোপন জায়গায়। যেত, এইরকম মুখোশ পরেই কেউ কেউ অনাচার অত্যাচার করতে বেরিয়ে পড়ত; দুশমন দমন করতেও যেত।
এই কি ভুজঙ্গভূষণ?
হঠাৎ সেই মানুষটি গম্ভীর চাপা গলায় বলল, “তারাপদ, আমি তোমার পিসেমশাই ভুজঙ্গভূষণ।”
উঠে গিয়ে প্রণাম করার কথা তারাপদ ভুলে গেল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “আমার মুখ পুড়ে গিয়েছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা। তোমাদের দেখতে ভাল লাগবে না। তাই এটা পরেছি। তুমি আমার মুখ দেখতে পাচ্ছ না বলে আমারই কষ্ট হচ্ছে। আমার শরীর ভাল নয়। তোমায় শুধু দেখতে এসেছি। তুমি এসেছ, আমি খুশি হয়েছি।”
তারাপদ সাহস করে বলল, “মৃণালবাবু আমার হাত দিয়ে কিছু কাগজপত্র আর চিঠি দিয়েছিলেন আপনাকে দেবার জন্যে। আপনি পেয়েছেন?”
“পেয়েছি। ..ওই ছেলেটি তোমার বন্ধু, ডাক্তার?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। মৃণালবাবুর মুখে শুনলাম, আপনার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে–তাই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম। কী হয়েছিল আপনার?”
“কী হয়েছিল তুমি ঠিক বুঝবে না। অগ্নিচক্রের মধ্যে মুখ ছিল, মনটা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। একাগ্রতা নষ্ট হয়ে গেলে পাপ হয় সেই পাপের ফল।”
“অগ্নিচক্র কী?”
“তোমরা বুঝবে না। না দেখলে বুঝতে পারবে না। এই যে ঘরে তোমরা বসে আছ, এই ঘরে পরলোক থেকে আত্মারা আসেন। আমি তাঁদের ডেকে আনি। তাঁরা আসেন, দেখা দিয়ে যান, কত লোক তাদের হারানো প্রিয়জনকে এখানে একটু দেখতে আসে। আত্মা অদৃশ্য। তাকে দেখা যায় না। তবে সদয় হলে তাঁরা আমাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যান। অনেক সময় স্পর্শও করে যান। চিহ্নও রেখে যান কোনো কোনো সময়ে।…ওই দেখো, একজন এসেছেন…এই মুহূর্তে এসে গেছেন।” বলতে বলতে যেন ভুজঙ্গভূষণ কেমন হয়ে গেলেন, মাটি থেকে একটা বড় পুজোর ঘণ্টা উঠিয়ে নিয়ে বাজালেন সামান্য। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ঘর ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
সেই নিকষ কালো অন্ধকারে মাথার ওপর ক্ষীণ একটু আলো জ্বলে উঠল । আর কোথা থেকে একটা লাল বল, সোনালি ডোরা দেওয়া, ঘরের মাঝখানে এসে হাজির হল।
ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “আপনি কে আমি জানি না। যদি আমার পরিচিত হন আপনার আসার প্রমাণ দিন।”
বলার পর বলটা কাঁপতে লাগল, নড়তে লাগল, তারপর ধীরে ধীরে শূন্যে উঠতে লাগল, ভাসতে ভাসতে ওপরে ছাদের দিকে উঠে গেল, ওপরের আলোয় সেই লাল আর সোনালি রঙের বলটা ঝকঝক করে উঠল। বলটা আবার সামান্য নেমে এল। নেমে এসে লাফাতে লাফাতে ঘরের ডান দিক থেকে বাঁ দিক পর্যন্ত চলে গেল। আবার বাঁ দিক থেকে ডান দিকে আসতে লাগল।
তারাপদ ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবার মতন।
চন্দন দু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
.
সাত
পরের দিন সকালেও তারাপদ নিজেকে সামলে নিতে পারল না। চোখমুখ বসে গিয়েছে, শুকনো চেহারা। পর পর দু’ রাত্রিই ঘুম হল না বেচারির; আগের দিন কেটেছে ট্রেনে; আর কাল সারা রাত বিছানায় শুয়ে ভয়ে আতঙ্কে মরেছে । চন্দন ডাক্তার-মানুষ, তার অনেক সাহস, মড়া কাটা থেকে শুরু করে সে কত কী করেছে, সহজে ঘাবড়ে যাবার ছেলে চন্দন নয়; তবু চন্দনও কেমন বোকা হয়ে গেছে। ভয়ও পেয়েছে খানিকটা। দুজনে আলোচনা করেও বুঝতে পারছে না–এরকম ঘটনা কেমন করে ঘটে? ছোট ফুটবল সাইজের, একটা বল কেমন করে হাওয়ার মধ্যে নেচে বেড়ায়? ভৌতিক ব্যাপার? না ম্যাজিক?
যদি বিশ্বাস করে নেওয়া যায় ম্যাজিক, তবে ভয়-ভাবনার কিছু থাকে না। কিন্তু ম্যাজিক বলে ঠিক বিশ্বাস করতেও মন চাইছে না।
সকাল বেলায় মুখটুক ধুয়ে কোনো রকমে চা খেয়ে দুজনে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। বাগানে।
তারাপদ বলল, “চাঁদু, কিকিরার কাছে যেতেই হবে।”
চন্দন বলল, “আমিও তাই ভাবছি। কখন যাবি।”
‘বিকেলে যাওয়া যাবে না। ভুজঙ্গ আবার আজ বিকেলের পর আমাদের সঙ্গে দেখা করবে বলেছে। যেতে হলে এখনই যাওয়া দরকার।”
চন্দন বলল, “চল, আমরা ঘুরে আসি।”
“কাউকে কিছু বলতে হবে না?”
“কী দরকার । নতুন জায়গা, কেমন সুন্দর দেখতে, আমরা একটু বেড়িয়ে বেড়াচ্ছি–এইভাবে যেতে হবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব, বেড়াচ্ছি। তারপরও যদি খোঁচায়, বলব–স্টেশনে যাচ্ছি ব্লেড কিনতে কিংবা সিগারেট কিনতে। “
তারাপদ বলল, “ঠিক আছে, চল।”
বাগানের মধ্যে সামান্য সময় দুজনে বেড়ানোর ভাব করে ঘুরে বেড়াল। বাড়ির চার পাশ না হলেও অন্তত তিনটে পাশ দেখে নিল । ভুজঙ্গভূষণের এই পুরী যতই দুর্গ হোক, কেউ যদি পালাতে চায় নিশ্চয় পালাতে পারে । সব দিক সর্বক্ষণ আটকে রাখা সম্ভব নয়। মানুষ জেলখানা থেকেও পালায়–এখান থেকে পালানো নিশ্চয়ই তার চেয়ে কঠিন নয়।
বাগানে বেড়াতে বেড়াতেই মৃত্যুঞ্জয়কে দেখা গেল।
চন্দন বলল, “তারা, তোকে এবার একটু খেলতে হবে।”
তারাপদ অবাক চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল।
চন্দন বলল,”তুই ওই মৃত্যুঞ্জয়টাকে ডাক। ডেকে বল, ছোট ফটকের তালা খুলে দিতে। বলবি, আমরা বেড়াতে যাব। শোন, মিনমিন করে কথা বলবি না ওর সঙ্গে, হুকুমের গলায় বলবি।”
“এখানকার ছোট মহারাজাকে হুকুম? তুই বলছিস কী?” তারাপদ ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
