কিকিরা বললেন, “তোমার সঙ্গে নন্দবাবুর দেখা কিংবা কথা হয়েছে?”
“দু-চারদিনের মধ্যে হয়নি। আগে হয়েছে; ফোনে।”
“উনি আমার কথা বলেছেন তখন?”
“হ্যা!”
“তুমি কি এখন কলকাতায় থাকবে?”
“এই হপ্তাটা থাকব।”
“শোনো ব্রাদার। আমি নন্দবাবুকে তোমার কথা বলব। চেষ্টা করব, আলমারিটা যেন তোমাদের বাড়িতে ফেরত যায়। নন্দবাবুর নিজেরই আর ওটা রাখার ইচ্ছে নেই। বাড়ির লোকও আপত্তি করছে।”
রাজীব এবার উঠে দাঁড়াল। “আমি তা হলে আসি।” বলেই কী মনে হল, আবার বলল, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আপনিও বিশ্বাস করতে পারেন, আমি গুণ্ডা বদমাশ নই। নন্দবাবু যা বলেছেন তার বারো আনাই সত্যি নয়।”
কিকিরাও উঠে দাঁড়ালেন। “তুমি আমায় বিশ্বাস করো, অথচ বললে না আলমারির মধ্যে কী আছে!”
রাজীব কী ভেবে বলল, “বলব। দু-একটা দিন অপেক্ষা করুন। আলমারিটা ফেরত পাই।”
.
১০.
পরিবেশ অন্যরকম। এই ঘরের চারদিকে তাকালে কালচে ছায়া, বিবর্ণ ময়লা দেয়াল, খসেপড়া পলেস্তরাই চোখে পড়ে। একটিমাত্র বাতি– তাও অনুজ্জ্বল। এতবড় ঘরে ওই আলোটুকু অন্ধকারকেই যেন আরও ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ওপরের কড়িকাঠ চোখে পড়ে না। জানলাগুলো বড়, কিন্তু ভাঙাচোরা শার্সি, খড়খড়ি। কোনওরকমে একটি জানলা খুলে রাখা সম্ভব হয়েছে। বাইরে অন্ধকার। কোথাও থেকে জল ছুঁয়ে পড়ছে। মৃদু শব্দ। দালানের ফঁক-ফোকরে বুঝি দু-পাঁচটা পায়রা বাসা বেঁধে থাকে; আচমকা তাদের পাখা ঝাঁপটানির আওয়াজও কানে আসছিল।
কিকিরা স্বপ্নেও ভাবেননি, বিশ্বাসবাড়ির ছোট তরফের ঘরবাড়ির এমন জীর্ণ দীন চেহারা হতে পারে। অবশ্য এই ঘরটা বারবাড়ির ঠাকুরদালানের কাছাকাছি কোনও ঘর হবে।
রাজীব তাদের এখানেই এনে বসিয়েছে। বসার ব্যবস্থা যৎসামান্য। একটি গোল টেবিল, কয়েকটি সাধারণ চেয়ার।
কিকিরারা তিনজনেই এসেছেন, কিকিরা তারাপদ চন্দন। আর এসেছেন নন্দবাবু। নন্দবাবুকে আনার দায়িত্ব ছিল কিকিরার ওপর। রাজীব জানিয়েছিল, আপনারা আসার সময় নন্দবাবুকেও দয়া করে নিয়ে আসবেন।
ওঁরা চারজন পাশাপাশি বসে, গোল টেবিল ঘিরে। রাজীবও বসল একপাশে।
কিকিরা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই রাজীব বলল, “আমি কথা দিয়েছিলাম নন্দবাবুর টাকাটা আমি ফেরত দিয়ে দেব, আপনাদের সামনেই সেটা দিচ্ছি,” বলে একটা খাম বার করে নন্দবাবুর দিকে এগিয়ে দিল। “পৌঁছে দেওয়ার খরচার টাকাও ওর মধ্যে আছে। নন্দবাবুকে ধন্যবাদ, পরশু আমি আলমারিটা ফেরত পেয়েছি। তারপর কিকিরার দিকে তাকাল। “আপনাকেও ধন্যবাদ রায়বাবু।”
কিকিরা বললেন, “এবার তা হলে তুমি তোমার কথা রাখো। বলেছিলে আলমারি ফেরত পাওয়ার পর তুমি যা বলার বলবে, কোনও কথাই গোপন রাখবে না!”
রাজীব মাথা নাড়ল। বলল, “বলব বলেই আপনাদের একটু কষ্ট করে এ বাড়িতে আসতে বলেছিলাম। আপনারা এসেছেন, সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ।”
চন্দন বলল, “আমরা আসতুম। আপনি আপনার কথা বলুন।”
রাজীব সামান্য চুপ করে থেকে বলল, “দিঘায় যখন আপনাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়- তখন কথায় কথায় আমি বলেছিলাম, আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার। মনে আছে সে-কথা?”
কিকিরা বললেন, “আছে। পেশা ছিল ডাক্তারি আর নেশা ছিল জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো। শিকারের শখ ছিল।”
“শিকারের শখ ছিল একসময়। পরে আর শিকার করতেন না। সেটা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি নিষেধ ছিল। তবে কোথাও কোনও খেপা জন্তু বেরোলে লোকে এসে তাকে ধরত। যেতেনও মাঝে মাঝে। … একটা কথা আপনাদের সেদিন বলিনি। দরকার মনে করিনি। আমার বাবা ঠিক পুরোপুরি রোগী-দেখা ডাক্তার ছিলেন না। তার মাথায় অন্য একটা চিন্তাও থাকত। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবার সময় বাবা লক্ষ করতেন একেবারে জংলি দেহাতি গরিব মানুষরা অসুখবিসুখ হলে গাছগাছালি এটা-ওটা নিয়ে কীভাবে নিজেদের চিকিৎসা করে। তিনি দেখতে পান, অনেক গাছপালা যা আমরা উপেক্ষা করি, কিংবা আমরা যার কথা জানি না– সেগুলো দিয়ে নানা ধরনের ব্যাধি দূর করা যায়।”
“তোমার বাবা কি ওইসব গাছপালা, পাতা নিয়ে নিজে পরীক্ষা করতেন?” কিকিরা বললেন।
“করতেন খানিকটা। বাবার নিজের বাড়িতে ছোট একটা ল্যাবরেটরি ছিল। বাবার বন্ধু কুমুদকাকা ছিলেন ফারমোকোলজির লোক। কেমিস্ট। তাকে দিয়ে বাবা দু-চারটে খুচরো ওযুধও তৈরি করিয়েছিলেন তার মধ্যে একটা তখন ভালই চলত বাজারে। জন্তু জানোয়ার, বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে বিযিয়ে যাওয়া ঘায়ের ওযুধ। … দু’পয়সা রোজগারের জন্যে বাবা এসব করতেন না ঠিক। কৌতূহল ছিল। ঝোঁকও বলতে পারেন। … তা একবার বাবা মধ্যপ্রদেশের এক জঙ্গলে যান। সঙ্গে কুমুদকাক। কুমুদকাকাও মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গী হতেন।”
“মধ্যপ্রদেশের কোথায়?” তারাপদ বলল।
“পাঁচমারির কাছে। জায়গাটার নাম আমার মনে পড়ছে না। জাড়িয়া ফরেস্ট হবে হয়তো। সেখানে এমনি লোকবসতি নেই। আদিবাসী পাঁচ-সাতটা গ্রাম। সভ্য সমাজের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সেখানে তখন এক ধরনের অসুখ দেখা দিয়েছে। অনেকটা ইয়ালো ফিভারের মতন। মারাত্মক ব্যাধি। আমাদের দেশে সচরাচর চোখে পড়ে না। বাবা লক্ষ করে দেখলেন, ডুমুরগাছের মতন একজাতের গাছের ফল জলে ফুটিয়ে সেটা রোগীদের খাওয়ানো হচ্ছে। বেঁচেও যাচ্ছে অনেকে। ফেরার সময় বাবা আর কুমুদকাকা সেই গাছের পাতা, ছাল আর ফল নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়।”
