“আচ্ছা! এখানে এসে নিজেরা রিসার্চ করতে শুরু করেন?” কিকিরা বললেন।
রাজীব মাথা নাড়ল। “মাস ছয়েক চেষ্টার পর একটা রেজাল্ট পাওয়া গেল। ইয়ালো ফিভার ঠিক নয়, তবে ওই ধরনের অসুখের পক্ষে কাজে লাগতে পারে। বাবা তার নোটবইয়ে রিসার্চের কথাগুলো লিখে রাখেন। যাকে বলে ফারমোকোলজিকাল প্রোফাইল। তার ইচ্ছে ছিল, নানা অসুবিধে ও অর্থাভাবের জন্যে নিজেদের পক্ষে এই গবেষণা নিয়ে আর যখন এগুনো সম্ভব নয়– তখন কোনও বড় ওষুধ কোম্পানিকে সেটা বেচে দেবেন। তারা আরও নিখুঁতভাবে রিসার্চ করে ওষুধটা তৈরি করতে পারবে।”
কিকিরা সন্দেহ করে বললেন, “সেই কাগজপত্র– মানে নোটস আর পাওয়া যায়নি!”
“পরে পাওয়া গিয়েছে। আমি পেয়েছি,” রাজীব বলল। যখন আমি পেয়েছি তখন আমার বয়েস কুড়ির মতন। বাবা মারা গিয়েছেন আমার দশ বছর বয়েসে।
“ওটা কি চুরি গিয়েছিল?”
“না। বাবা লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি হঠাৎ পেয়ে যাই।”
“তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর তোমরা তো দাদুর কাছে চলে আসো। তোমাদের নিজের বাড়ি ছেড়ে এ-বাড়িতে আসার পর কাগজগুলো পেলে? দশ বছর পরে। এতদিন এই কাগজগুলো কোথায় ছিল? ও-বাড়ি, না, এ-বাড়িতে?”
“ও-বাড়িতেই ছিল। মায়ের আলমারির একটা লুকনো খোপে। মা জানতেন না। মা যখন বাপের বাড়িতে চলে আসেন তখন ও-বাড়ি থেকে সামান্য কয়েকটা নিজের জিনিস নিয়ে এসেছিলেন, আলমারিটাও।”
তারাপদ বলল, “তা হলে আলমারিটা আপনার মায়ের। দাদু সেটাই বেচে দিয়েছিলেন?”
মাথা নাড়ল রাজীব। “না, না। মায়ের আলমারি থেকে সরিয়ে আমিই দাদুর একটা আলমারিতে রেখে দিয়েছিলাম। দাদু সংসারের খোঁজখবর এখন আর রাখেন না, চোখেও দেখেন কম। অন্ধ হয়ে এসেছেন প্রায়।”
কিকিরা বললেন, “আলমারির কোথায় ওটা ছিল?”
“বাঁদিকের ড্রয়ারের পেছনে। অবশ্য আপনি ড্রয়ার টেনে বার করে নিলেও কিছু দেখতে পেতেন না। ড্রয়ার টেনে বার করে নিলে পেছনে দেখতেন আলমারির কাঠ। কিন্তু বুঝতে পারতেন না পেছন দিকে একটা চোরা খোপ আছে। ধরা যায় না। সেই খোপের চাবি নীচের দিকে। ছোট্ট চাবি। ওটা আমার কাছে থাকে। কেউ জানে না।”
নন্দবাবু কিকিরার দিকে তাকালেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, দেখেছেন– আমিও সেই চাবি পাইনি। জানিই না ওরকম কোনও চোরা খোপ আছে।
কিকিরা বললেন, “কিন্তু ডান আর বাঁ দুটো ড্রয়ার পাশাপাশি রাখলে তো বোঝা যেত, মাপের হেরফের আছে; বাঁ দিকের ড্রয়ারের মাপ লম্বায় ছোট হত।”
রাজীব হাসল যেন। “না, তাও বোঝা যেত না। ডান দিকের ড্রয়ারের লম্বার মাপ একই রকম ছিল, যদিও তার পেছনে কোনও চোরা খোপ রাখা হয়নি। লোক ঠকাবার কারিকুরি তখনকার মিস্ত্রিদের ভালই জানা ছিল।”
বাইরে হাওয়া উঠেছে। জল পড়ার সেই একই রকম শব্দ। ঘরের আলো কমে আসছে মাঝে-মাঝে। দেয়ালগুলো আরও কালচে দেখাচ্ছিল।
.
রাজীব জামার পকেট থেকে একটা কী বার করল। রাখল টেবিলে। কিকিরারা অনুমান করলেন ওটা চামড়ার ব্যাগ। তবে চওড়ায় সরু। চশমার খাপের মতন অনেকটা। লম্বায় ইঞ্চি ছয়েক। বেশিও হতে পারে সামান্য।
কেউ কিছু বলল না।
রাজীব নিজেই ব্যাগ খুলে একটা পকেট নোটবই বার করে টেবিলের ওপর রাখল। তফাত থেকেও বোঝা যাচ্ছিল নোটবইটা অনেক পুরনো।
চন্দন বলল, “এটা কি আপনার বাবার সেই পুরনো নোটবই?”
“হ্যাঁ।”
“দেখতে পারি?”
“আপনি ডাক্তার মানুষ। দেখলেই নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারবেন। তবে অকারণ দেখা। আমায় বিশ্বাস করতে পারেন।” বলে একটু থেমে চন্দনকেই বলল, “আপনি বোধ হয় জানেন, কাগজেও দু-চারবার একটা খবর বেরিয়েছে– হালে একধরনের ভাইরাল অসুখ-ইস্ট এশিয়া থেকে এসে এদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। অসুখটা মারাত্মক। তার লক্ষণটাও ইয়ালো ফিভারের মতন।”
চন্দন বলল, “কানে গিয়েছে, তবে আমি নিজে বেশি জানি না।”
“আমারও জানার কথা নয়। বেশি জানি না। তবে কুমুদকাকা আমায় জানিয়েছেন। তিনি এখন গুজরাটে থাকেন। বড় একটা ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ ল্যাবরেটরির মাথায় বসে আছেন। অ্যাডভাইসার। তাঁর বয়েস হয়েছে। মানুষটিও একলা। তিনি আমায় চিঠিতে জানিয়েছিলেন, বাবার সেই কাগজপত্রগুলো যদি উদ্ধার করা যায়-তবে এ-সময় কাজে লাগতে পারে।”
“মানে, তুমি সেই কাগজপত্র ওঁদের কোম্পানিকে বেচে দিতে পারো?” কিকিরা বললেন।
রাজীব বলল, “হ্যাঁ। এতে দোষ কোথায়? আমি বাবার নোটবইটা রেখেছি স্মৃতি হিসেবে। আমি তো আর রিসার্চ করব না, আমার ল্যাবরেটরি বা ওষুধ কোম্পানিও নেই। ওটা যদি কুমুদকাকাদের কাজে লাগে, মানুষের উপকার হবে। তাই না?”
“তুমি তা হলে ওটা বেচে দিতে চাও?”
রাজীব মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, বেচে দিতে চায়।
“বোধ হয় ভালই টাকা পাবে?”
“কত পাব জানি না। কুমুদকাকাই ব্যবস্থা করবেন।”
তারাপদ হালকাভাবে বলল, “একেই বলে ভাগ্য!”
রাজীব কোনও জবাব দিল না। ব্যাগের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে আরও একটা কী বার করে টেবিলের ওপর রাখল। পাতলা কাপড়ে মোড়া, কাপড়টা খুলে নিল।
কিকিরা দেখছিলেন। কিছু বুঝলেন না। সরু একটা কাঠি যেন। লম্বা। রং বোঝা যায় না। কালচে দেখাচ্ছিল।
“কী ওটা?” তারাপদ বলল।
“হাড়ের টুকরো?”
কিকিরারা অবাক! “কার হাড়? কীসের?”
“বাবাকে একজন দিয়েছিল। বুড়ো এক জিপসি৷ সার্কাসে খেলা দেখাত। জাগলারি। আগুনের খেলাও দেখাত। মুখে আগুন নিয়ে সাইকেলের কসরত। সে হঠাৎ মারা যায়। বাবা তাকে দেখেছিল। বাঁচাতে পারেনি।”
