“ও! তা হলে তখনই তুমি-আপনি বুঝে ফেলেছিলেন…”
“আমাকে তুমি বলুন। আমি কিছু মনে করব না।”
তারাপদ ফিরে এল। বসল নিজের জায়গায়।
কিকিরাও বসে পড়েছিলেন ততক্ষণে।
রাজীব হঠাৎ বলল, কিকিরাকেই, “আপনি কি সত্যিই আলমারিটা কেনার জন্যে টাকা আগাম দিয়েছেন? না, দেননি। মিথ্যে কথা। আমাকে আপনার সামনে হাজির করতে চাইছিলেন। তাই না?…এখন আমি আপনার বাড়িতে আপনার সামনে হাজির। বলুন, কী জানতে চান?”
চন্দনের গলা পাওয়া গেল ভেতরে। বগলার সঙ্গে কথা বলছে। তারপরই ঘরে এল। রাজীবকে দেখে যেন বিশ্বাস হল না প্রথমে। চোখের পলক পড়ল না কয়েক মুহূর্ত।
কিকিরা বললেন, “এসো চাঁদু! বসো। রাজীব শেষপর্যন্ত এসেছে–এসেছেন। না, এসেছে।”
চন্দন তারাপদর দিকে তাকাল। ইতস্তত করে সামান্য তফাতে গিয়ে বসল শেষে।
কিকিরা রাজীবকে বললেন, “তুমি বলছ, আমি কী জানতে চাই–তোমায় বলতে। বরং তুমিই বলো তোমার যা বলার। ধরো, নন্দবাবু যে তোমাদের বাড়ি থেকে আলমারিটা কিনেছেন সেটা তো ঠিকই। তুমি অস্বীকার করতে পারবে না।”
“হ্যাঁ, উনি ছোটদাদুর কাছ থেকে আলমারিটা কিনেছেন নগদ টাকা দিয়ে।”
“তা হলে তুমি কেন ওঁর দোকানে গিয়ে ভদ্রলোককে শাসিয়ে এসেছ?”
“আপনার বন্ধু আপনাকে পুরো সত্যি কথা বলেনি, অর্ধেক বলেছে।”
“মানে?”
“আমি ওঁর দোকানে গিয়েছিলাম। প্রথমে হইচই, রাগারাগি করিনি। বরং ওঁকে অনুরোধ করে বলেছিলাম, দাদু বিপাকে পড়ে বাড়ির ওই আলমারিটা বিক্রি করে দিয়েছেন। একে ওঁর আজকাল অর্ধেক কথা মনে থাকে না, তার ওপর চোখেও ভাল দেখেন না। আপনি দয়া করে ওটা ফেরত পাঠিয়ে দিন। আপনার টাকা আমি দিয়ে দেব। যদি বলেন, কালই টাকা ফেরত পাবেন। … তা উনি তো রাজি হলেনই না, উলটে আমার সঙ্গে চড়া গলায় তর্ক করতে লাগলেন। নন্দবাবু ব্যবসাদার মানুষ। উনি বলতেই পারেন, কেনা জিনিস উনি কেন ফেরত দেবেন! কিন্তু আমি তো অনুরোধ করেছিলাম। নন্দবাবু ওভাবে রাগারাগি শুরু করায় আমি চটে উঠেছিলাম। তখন দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ঝগড়াঝাটি হয়।”
“তারপর তুমি নন্দবাবুকে শাসাও?”
“হ্যাঁ।
“তুমি ওঁকে একদিন মোটরসাইকেল চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলে?”
“না।”
“ধাক্কা দেওয়ার মতলব ছিল?”
“কী যে বলেন!”
“নন্দবাবু তোমায় দেখেছেন।”
“ওঁর মনগড়া কথা। ভুল দেখেছেন। আমি আমার বাইক দিঘায় রেখে এসেছি। আপনারা দেখেছেন।”
“তুমি তোমার কোনও বন্ধুর বাইক চেয়ে নিয়ে যে যাওনি তার প্রমাণ কী?”
“প্রমাণ দেওয়ার দরকার নেই। আমি যা করিনি তা নিয়ে আমায় দোষ দেবেন না। বিশ্বাস করা না-করা আপনাদের ব্যাপার।”
বগলা চা এনেছিল। হাতে হাতে এগিয়ে দিল।
কিকিরা বললেন, “তুমি নন্দবাবুর বাড়িতে ফোন করে ওঁকে শাসাও?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“আলমারিটা আমাদের বাড়িতে ফেরত আসা দরকার।”
“কেন?”
“সে অনেক কথা। আপনি বুঝবেন না।”
চায়ে চুমুক দিয়ে কিকিরা সামান্য সময় চুপ করে থাকলেন। দেখলেন রাজীবকে। শেষে বললেন, “কী আছে আলমারির মধ্যে? সোনাদানা হিরে মুক্তো কত আর লুকিয়ে রাখতে পারো ওর চোরা-ফোকরে?”
রাজীব এবার কেমন করে যেন হাসল। শব্দ করে নয়; ঠোঁট কামড়াল। বলল, “একরত্তি সোনাও নেই। হিরে মুক্তোও নয়। … অন্য কিছু।”
তারাপদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “কিছু মনে করবেন না। একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে। আপনি দিঘায় গিয়ে হোটেল খুলছেন। অবশ্য আপনার পার্টনার আছে। তবু ওই বাড়িটা কেনা, সেটাকে সারিয়েসুরিয়ে অদলবদল করতে তো যথেষ্ট টাকা খরচ হয়েছে, হচ্ছে। আপনি নিশ্চয় আপনার দাদুর কাছ থেকে টাকা পাননি। এত টাকা আপনি কোথা থেকে পেলেন?”
রাজীব তারাপদর দিকে তাকাল। জবাব দিল না।
অপেক্ষা করে কিকিরা বললেন, “বাবা কোথাও কিছু রেখে গিয়েছিলেন? মায়ের গয়নাগাটি …?”
রাজীব ছোট করে বলল, “জোগাড় করতে হয়েছে।”
“ধারকর্জ!”
রাজীব এমনভাবে মাথা নাড়ল, যা থেকে বোঝা মুশকিল সে ঠিক কী বলতে চাইল।
অল্প সময় চুপচাপ থাকার পর রাজীব নিজেই কিকিরাকে বলল, “আপনি নন্দবাবুকে বলুন, আলমারিটা ফেরত দিয়ে দিতে। তাতে ওঁর কোনও ক্ষতি হবে না। একথাও বলতে পারেন, আপাতত না হয় দিয়ে এলেন ফেরত, তার বদলে উনি অন্য কোনও আসবাব নিয়ে আসতে পারেন। বাড়ি একেবারে শূন্য হয়নি।”
কিকিরা শুনলেন মন দিয়ে। ভাবলেন। চন্দন আর তারাপদকে দেখলেন একবার। রাজীবের দিকে তাকালেন, “আমি বলতে পারি। … কিন্তু ব্যাপার কী জানো? আলমারিটা এখন মিস্ত্রিদের হাতে, কাজকর্ম করছে। তারা যদি তোমার লুকনো জিনিসটা খুঁজে পায় আচমকা! কাজ করতে করতে সিক্রেট পকেটটা পেয়ে গেল! তখন–?”
রাজীব মাথা নাড়ল। “পাবে না। নন্দবাবুর ওই মামুলি মিস্ত্রিদের সে-ক্ষমতা আছে বলে আমার মনে হয় না। তা ছাড়া চোরা পকেট খোলার চাবি পাবে কোথায়? সেটা আমার কাছে। নন্দবাবু যে চাবিগুলো পেয়েছেন তার মধ্যে ওই চাবিটা নেই। ছোড়দাদু, মা- কেউই জানে না আমি কোন লুকনো খোপে ওটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। চাবির কথাও জানে না।” চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল রাজীব। অর্ধেকটা খেয়েছে মাত্র। নিজেই বলল, “তবে হ্যাঁ, কেউ যদি আলমারির সব কেটেকুটে ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয় তবে অন্য কথা। নন্দবাবু নিশ্চয় তা করবেন না।”
কিকিরা হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। ছেলেটির মধ্যে লুকোচুরি নেই। যা বলছে, স্পষ্ট। ওকে বশে আনা কঠিন।
